এক হাজার শিশুর আনন্দময় একটি দিন

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:৫৯, নভেম্বর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৯, নভেম্বর ২৩, ২০১৯

নননহলুদ শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ। হাতের লাল কাচের চুড়ির সঙ্গে মিলিয়ে কানে লাল দুল। ঠোঁটেও লাল লিপস্টিক। পরেছে টিকলিসহ নথ। এভাবেই নিজেকে সাজিয়েছে সুবর্ণা আক্তার মিম। থাকে ঝাউচুর বাজারে। বাবা শুক্কুর ব্যাপারী চায়ের দোকানি। মা কমলা বেগম। তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে মিম সবার ছোট।মিম কোনও নামি স্কুলের শিক্ষার্থী নয়। হাজারীবাগের ঝাউচর এলাকার হাজী আব্দুল আউয়াল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস থ্রিতে পড়ে সে। ওই স্কুলটি কেবল পথশিশুদের জন্য।

মিম ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে এসেছে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ করতে। শুধু মিম নয়, প্রায় এক হাজার শিশু আজ  রবীন্দ্র সরোবরে নাচ, গান, চিত্রাঙ্কনে মেতেছে শুক্রবার (২২ নভেম্বর) সকাল থেকে। এই অনুষ্ঠান চলে রাত ৮টা পর্যন্ত। রবীন্দ্র সরোবরে গিয়ে দেখা যায়, পুরো অনুষ্ঠানস্থল সাজানো হয়েছে সাদা আর নীল বেলুন দিয়ে। চলছিল চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এভাবেই একের পর এক নানা আয়োজন চলে সারাদিন জুড়ে। রয়েছে পাপেট ও ম্যাজিক শো।

মিমের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে হাতে থাকা আইসক্রিম সরিয়ে জানায়, ‘এখানে নাচ গ্রহণ (নাচে অংশগ্রহণ) করতে এসেছি।’ কোন গানের সঙ্গে নাচবে? জানতে চাইতেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, “কে বাঁশি বাজায় রে” গানের সঙ্গে কাজ করবো। কে নাচ শিখিয়েছে জানতে চাইলে মিম বলে, ‘স্কুলের স্যাররা শিখিয়েছেন।’

আরেক শিশুর চেক প্রিন্টের হলুদ শাড়ির সঙ্গে কোমরে ভারি বিছা। পরিপাটি নাচের পোশাক পরে যে আনন্দ নিয়ে সে আইসক্রিম খাচ্ছিল তা দেখে যে-কারও মুখ দিয়ে বের হবে, ‘বাহ, কী সুন্দর দৃশ্য!’ কথা বলে জানা গেল, তার নাম ফাহিমা। বাবা অ্যাম্ব্রয়ডারির কাজ করেন। এর আগে একবার স্কুলে ভর্তি হলেও মা তাকে স্কুল থেকে নিয়ে এসেছিল। সেও এখানে নাচবে মিমের সঙ্গে।

BT New Tempজানা গেল, এ অনুষ্ঠানে শুধু সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা নয়, সচ্ছল পরিবারের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিশুরাও অংশ নিয়েছে। এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই, সবাই একসঙ্গে। আর শিশুদের নিয়ে সারাদিন এই অনুষ্ঠানে আয়োজন করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মাস্তুল ফাউন্ডেশন। এর প্রতিষ্ঠাতা কাজী রিয়াজ রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাস্তুল কাজ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে। কেবল সুবিধাবঞ্চিত শিশু নয়; তাদের পরিবার, কমিউনিটি নিয়েও কাজ করছে মাস্তুল।’

এ আয়োজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে, এতে তাদের মধ্যে একটি বন্ধন তৈরি হচ্ছে।’

মাস্তুলের পথচলা শুরুর কথা জানতে চাইলে রিয়াজ বলেন, ‘২০১৩ সালে কাজটা শুরু করে রক্তদান কর্মসূচি নিয়ে। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখলাম সমাজে ভালো কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। আর স্কুলের শুরুটা হয় ২০১৬ সালে। তখন ধানমন্ডি লেকের আশেপাশে যে পথশিশুরা আসতো তাদের নিয়ে হাজারীবাগ ঝাউচরে একটি স্কুল শুরু করে মাস্তুল। সেখানে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচশোর বেশি পথশিশু পড়াশোনা করছে। মাস্তুল এসব শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশেও সহায়তা করছে।’

স্কুল কেন? জানতে চাইলে রিয়াজ বলেন, ‘শুরুর দিকে ধানমন্ডিতে একটি স্কুল দিই পথশিশুদের জন্য। কাজ করতে গিয়ে মাস্তুল দেখতে পায়, পড়ালেখা করতে স্কুলে আসা সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা দারিদ্র্যের কারণে ঝরে পড়ে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, স্কুলের খরচ জোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খায়  বাবা-মা। তখন বাধ্য হয়েই তারা স্কুলে থেকে সন্তানকে নিয়ে যায়। তারপরই সিদ্ধান্ত হয়, পথশিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো হবে এবং তাদের পুরো খরচ মাস্তুল দেবে। পারিবারিক অবস্থা খুবই খারাপ থাকার কারণে পড়াশোনার সুযোগ পেতো না, এমন বাচ্চাদের নিয়ে এই স্কুল চলছে।’

এসব শিশুর বই-খাতা-কলম-পেনসিল-ব্যাগ-জুতা-মোজা-টিউশন ফি সবকিছু দিচ্ছে মাস্তুল। যাতে পরিবার খরচের কারণে তাদেরকে স্কুল থেকে ফেরত না নিয়ে যায়। তাদের এক প্রজেক্টের মাধ্যমে এই সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে বলে জানান রিয়াজ। সেখানে যে কেউ এক হাজার টাকা দিয়ে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। 

ধানমণ্ডি কচিকণ্ঠ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিফা মোস্তাফিজ মুন বলেন, ‘বিভিন্ন নামি স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও এখানে এসেছে।’

‘প্রতিবছর ২০ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে ইউনিভার্সাল চিলড্রেন ডে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিল, বিশ্বের সব শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু ২০ নভেম্বর ছিল বুধবার, সেজন্য একটি বন্ধের দিনকে আমরা বেছে নিই, যেন সব শিশু একসঙ্গে এখানে এসে সারাটা দিন কাটাতে পারে। তাদের জন্য যেমন রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, তেমনি রয়েছে নাগরদোলা, বায়োস্কোপসহ নানা বিনোদনের ব্যবস্থা। এখানে সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা যেমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবে তেমনি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিক্ষার্থীরাও সমানভাবে অংশ নেবে, আমরা চাই সব শিশু একসঙ্গে বড় হোক। তাদের মধ্যে যেন কোনও ভেদাভেদ, কোনও বৈষম্য না থাকে। সব শিশুর জন্য একটি পৃথিবী চাই আমরা।’ বলেন, কাজী রিয়াজ রহমান।

 

/জেএ/এমএএ/

লাইভ

টপ