৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ: পালাতে গিয়ে গ্রেফতার পরিবার পরিকল্পনার অফিস সহকারী

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন ও তুহিনুল হক তুহিন
প্রকাশিত : ২৩:০০, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৪, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯

নজরুল-ইসলামপরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সিলেট সদর উপজেলা কার্যালয়ের ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৯ টাকা আত্মসাৎ করলেন সংস্থাটির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক নজরুল ইসলাম। অর্থ আত্মসাৎ করেই থেমে থাকেননি এই অফিস সহকারী। সরকারি কর্মচারী পরিচয় গোপন করে ব্যবসায়ী পরিচয়ে দেশ ছাড়তে গিয়ে ২৭ নভেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশি মুদ্রাসহ আর্মড পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সিলেট কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অফিসের অফিসের ক্যাশ বই, চেকবইসহ হিসাব সংক্রান্ত কাগজপত্র নজরুল ইসলামের কাছেই থাকতো। অফিসের বিশেষ প্রয়োজনে চলতি বছরের অক্টোবরের শেষদিকে তার কাছে ক্যাশবই ও চেকবই চাইলে তিনি গড়িমসি শুরু করেন। অর্থব্যয় সংক্রান্ত হিসাব চাইলে তিনি একপর্যায়ে অফিসে আসা বন্ধ করে দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘নজরুল হিসাব না দিয়ে অফিসে আসা বন্ধ করে দিলে বিষয়টি তদন্তের জন্য নভেম্বর মাসে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে নজরুল ইসলাম অফিসের চেক ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে সরকারের ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৯ টাকা আত্মসাৎ করেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থাটির সিলেট সদর উপজেলা কার্যালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘অফিসের বিভিন্ন কাজে বিল তৈরির পর সেগুলো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করতেন। আর বিলগুলো নজরুল তৈরি করতেন। অফিসের চেক নিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তোলারও দায়িত্ব ছিল তার। বিভিন্ন কাজের ব্যয় শেষে অবশিষ্ট টাকা ব্যাংক জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি ওই টাকা জমা দিতেন না। দায়িত্বশীলরা নিয়মিত হিসাব পর্যবেক্ষণ না করায় নজরুল এত টাকা আত্মসাৎ করার সুযোগ পেয়েছেন। তাকে হয়তো কেউ সহায়তাও করেছেন।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ‘তদন্ত শুরু হলেই গাঢাকা দেন নজরুল ইসলাম। একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে পালানোরও চেষ্টা করেন। সৌদি আরব যাওয়ার উদ্দেশ্যে ২৬ নভেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৬০৬ ফ্লাইটে সিলেট থেকে ঢাকায় আসেন নজরুল। পরদিন ২৭ নভেম্বর বিজি-০৩৭ ফ্লাইটে সরকারি কর্মচারী পরিচয় গোপন করে ব্যবসায়ী পরিচয়ে বিদেশি মুদ্রাসহ সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। কিন্তু তার আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় তাকে গ্রেফতার করেন বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের সদস্যরা। পরিচয় গোপন করা ও পাসপোর্টে এনডোর্স ছাড়াই বিদেশি মুদ্রাপাচারের চেষ্টা করার অপরাধে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২৭ নভেম্বর বিমানবন্দর থানায় মামলা করে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ।’
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, নজরুল ইসলামের কাছ থেকে ১ হাজার সৌদি রিয়াল, ৫৫০ দিরহাম ও ৭৯০০ ইউএস ডলার জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু তার পাসপোর্টে এক হাজার ডলার এনডোর্স করা ছিল। সরকারি কর্মচারী হলেও তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন।

এ প্রসঙ্গে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপস অ্যান্ড মিডিয়া) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সিলেটের পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকে আমাদের জানানো হয়েছিল, সংস্থাটির অফিস সহকারী নজরুল ইসলাম বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী আমাদের নজরদারিতে ধরা পড়েন তিনি। সরকারি বিধি অনুযায়ী বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার বিধান থাকলেও তিনি তা পালন করেননি। উল্টো পরিচয় গোপন করে ব্যবসায়ী পরিচয়ে বিদেশি মুদ্রা পাচারের চেষ্টা করেছেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিমানবন্দর থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় তাকে গ্রেফতারও দেখানো হয়েছে।’
এদিকে, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটি ২ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে। টাকা আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ৩ ডিসেম্বর নজরুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একটি লিখিত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সিলেট কার্যালয়ে জমা দেয় সংস্থাটি।

অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান মৌলভীবাজারে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘তদন্তে বিশেষ খাতগুলোতে বিপুল পরিমাণ টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। খরচের খাতগুলোর রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ করা হয়নি। এছাড়া, আমাদের তদন্তের সময়ে ৩-৪ বছরের হিসাব খতিয়ে দেখা হয়। ২০১৬ সাল থেকে টাকার হিসাবে গরমিল পাওয়া গেছে। আমরা যা পেয়েছি, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সিলেট কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. লুৎফুন্নাহার জেসমিন বলেন, ‘গ্রেফতারের পর টাকা আত্মসাতের বিষয়ে অফিস সহকারী নজরুলের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দুদক সিলেটের কার্যালয়ে দাখিল করেছেন সিলেট সদর উপজেলার মেডিক্যাল অফিসার ডা. নজরুল ইসলাম।’ বিষয়টি দুদক তদন্ত করছে বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ