ব্যবসায়িক স্বার্থ থেকেই মালিকপক্ষ গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছে: টিআইবি

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৭:৪০, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৯, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় পুরস্কারপ্রাপ্তদের সঙ্গে অতিথিরাব্যবসায়িক স্বার্থ থেকেই মালিকপক্ষ গণমাধ্যমকে ব্যবহার করছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সোমবার (৯ ডিসেম্বর) রাজধানীতে সংস্থাটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ: প্রেক্ষিত গণমাধ্যম জবরদখল’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
একই অনুষ্ঠানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার-২০১৯ প্রদান করে টিআইবি।
অনুষ্ঠানে মূল গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম।
গবেষণা প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ‘সরকারের তরফে গণমাধ্যম জবরদখলের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করা হয়। এক্ষেত্রে নতুন নতুন টেলিভিশনের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনে প্রমাণ করার চেষ্টা থাকে, সরকার স্বাধীন গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে যারা টেলিভিশনের লাইসেন্স পেয়েছেন বা ক্ষেত্র বিশেষে পুঁজির জোগান দিয়ে মালিকানা হস্তগত করেছেন, তারা সবাই একই মতাদর্শী এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায়িক স্বার্থ থেকেই মালিকপক্ষ গণমাধ্যমকে বাধ্য করে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম প্রায়ই ব্যবহৃত হচ্ছে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মালিকপক্ষের হয়ে দর-কষাকষিতে। এই দর-কষাকষি বেশ কার্যকর। কারণ, এই ব্যবসায়ীরাই আবার রাজনৈতিক দলগুলোকে মোটা অঙ্কের অনুদান দিচ্ছেন অথবা নিজেরাই রাতারাতি রাজনীতিবিদ বনে যাচ্ছেন।’
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘হাতেগোনা দুই-একটি গণমাধ্যম ছাড়া বাকি সবই বিজ্ঞাপন ও মালিকপক্ষের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। তাই সম্পাদকীয় নীতিতে মালিকপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। একটি গণমাধ্যম কোনও অবস্থাতেই মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, এমন কোনও প্রতিবেদন প্রকাশ করার স্বাধীনতা রাখে না।’
এতে আরও বলা হয়, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিটি পর্যায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের যে যূথবদ্ধ রূপ দেখা গেছে, গণমাধ্যম জবরদখলের জন্য তা আদর্শ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত। স্পষ্টতই এই পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটেছে ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’-এর এবছরের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে। গতবারের চেয়ে চার ধাপ নেমে গিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫০-এ। অথচ ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয় তখনকার অবস্থান ছিল ১২১।’
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার ক্ষমতা সংহত করতে এবং নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে যে মারমুখী অবস্থান নিয়েছে, তার অন্যতম বলি হচ্ছেন সাংবাদিকরা। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে টিআইবি জানায়, ২০১৮ সালে অন্তত ২০৭ জন সাংবাদিক ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হওয়াসহ কোনও না কোনোভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এখন বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। একটি প্রতিবেদনের অংশবিশেষ লালকালি দিয়ে কেটে দেওয়া বা সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে নির্দেশনার পাশাপাশি এখন শুরু হয়েছে গণমাধ্যম জবরদখলের যুগ। এই ব্যবস্থায় সরকার ও ধনিক শ্রেণির যোগসাজশ, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী মহলের রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত করতে ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে।’
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় পুরস্কার
অনুষ্ঠানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য ১০ জন সাংবাদিককে পুরস্কার দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রিন্ট মিডিয়ায় (স্থানীয়) ক্যাটাগরিতে যশোরের স্থানীয় পত্রিকা ‘দৈনিক গ্রামের কাগজ’ পত্রিকার আটজন প্রতিবেদক পুরস্কার পেয়েছেন। জাতীয় ক্যাটাগরিতে দৈনিক প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার ফখরুল ইসলাম হারুন পুরস্কৃত হয়েছেন।
এছাড়া ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া (প্রতিবেদন) ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়েছেন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সিনিয়র রিপোর্টার ইমরুল আহসান। আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া (প্রামাণ্য অনুষ্ঠান) ক্যাটাগরিতে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ‘অনুসন্ধান’ পুরস্কার পেয়েছে। বিজয়ী সাংবাদিকদের সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট ও চেক দেওয়া হয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ন্যায়পাল অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, লেখক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী, সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিক প্রমুখ।

/এসএস/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ