ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক থাকবে না!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২২:৫৮, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৫, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের কার্যকারিতা হারানোর ঘটনাকে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ছবি)৪০ বছরের মারিয়াম হোসেন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। মাঝেমধ্যেই তিনি অন্যান্য জটিলতায়ও ভোগেন। এক বছর আগে ইউরিন ইনফেকশন নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে বেশ কিছু পরীক্ষা দেওয়া হয় তাকে। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর দেখা গেলো, ৯টি অ্যান্টিবায়োটিক মারিয়ামের শরীরে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অনেক মানুষই এখন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই মুহূর্তে যে কয়টি স্বাস্থ্যঝুঁকি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তার মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তথা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কাজ না করা অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতোমধ্যে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের কার্যকারিতা হারানোর ঘটনাকে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা বলছে, এখনই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আর অ্যান্টিবায়োটিকই থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে। ফার্মেসিগুলোতে প্রশিক্ষিত ওষুধ বিক্রেতা থাকতে হবে। এবং চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক দিলে তার কোর্স সম্পন্ন করতে হবে।

ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করাসহ এর বংশবৃদ্ধি রোধে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়। এর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া বা কাজ না করাকেই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। অ্যান্টিবায়োটিক যখন কার্যকারিতা হারায় তখন শরীরের ভেতরে থাকা জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। এ কারণে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না, রোগও সারে না।

বিশেষজ্ঞরা এ অবস্থাকে তুলনা করেছেন অ্যান্টিবায়োটিক যখন আবিষ্কার হয়নি সেই সময়ের সঙ্গে। তারা বলছেন, যেকোনও অসুখে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন এমন সব ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হচ্ছে, যাদের আর কোনও অ্যান্টিবায়োটিকে কাবু করা যাচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এ কারণে একসময় সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেও যে ফল পাওয়া যেতো, এখন তার চেয়ে বেশি কার্যক্ষম অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেও সেই সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে।’

সম্প্রতি বিএসএমএমইউ’র ফার্মাকোলজি বিভাগ ৮২টি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ওপর গবেষণা চালিয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, এই ৮২টি অ্যান্টিবায়োটিকই দেশে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। দেশের ১৫০টি ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধ নিয়ে এই গবেষণাটি করা হয়।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর জানিয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হবে। দেশের ৯টি মেডিক্যাল কলেজে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে গবেষণা করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ। গবেষণায় এসেছে, ইতোমধ্যে ১৭টি অ্যান্টিবায়োটিক কার্যক্ষমতা হারিয়েছে।

এক রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনে ‘অ্যান্টিব্যায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’

আইইডিসিআর-এর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. জাকির হোসাইন বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকে যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে খুব শিগগিরই চরম ভোগান্তির ভেতর দিয়ে যেতে হবে। আর এর ফলে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক এতদিন রিজার্ভ অর্থাৎ বিপদকালীন হিসেবে রাখা হয়েছিল, সেসব ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে। আর এটা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাবে না।’

বিএসএমএমইউ-এর ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণ সংক্রমণজনিত রোগব্যাধির চিকিৎসা থেকে শুরু করে যেকোনও ধরনের অপারেশন, এমনকি ক্যানসার চিকিৎসাও অনেকখানি সহজ ও সফল হয়ে উঠেছিল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল আবিষ্কারের ফলে। কিন্তু রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভবের ফলে এসব রোগের চিকিৎসা কঠিন বা অসম্ভব হয়ে উঠছে।’

আবিষ্কারের পর থেকেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল ‘ম্যাজিক বুলেটের’ মতো, কিন্তু যেহেতু এটা যুদ্ধ চলাকালীন আর যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ব্যবহার হচ্ছিল, তাই প্রথম থেকেই এর অতিরিক্ত ব্যবহার ছিল মন্তব্য করে ডা. সায়েদুর আরও বলেন, ‘কিন্তু তখন থেকেই সতর্কবাণী ছিল, অতিরিক্ত ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এর সুবিধা এত বেশি যে চিকিৎসক, ওষুধ উৎপাদকসহ অন্যরা এই সুবিধাকে প্রফিট মেকিং মেশিনারি বানানোর জন্য প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করলো, তৈরি করলো এবং এর ব্যবহার বাড়তে লাগলো।’

তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বই এখন অ্যান্টিবায়োটিকের ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা কেবল ঝুঁকিতে আছি, বিষয়টা তা নয়, আমরা কিন্তু ঝুঁকি তৈরি করছি, এটা সবচেয়ে ঝুঁকি।’ আর এই ঝুঁকি কমানোর একটাই রাস্তা এবং তা হলো এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আইইডিসিআর-এর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করা জরুরি, একই সঙ্গে ফার্মেসিগুলোতে প্রশিক্ষিত বিক্রেতা দরকার এবং সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানাতে হবে যে, প্রয়োজন ছাড়া, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়েটিক দোকান থেকে কিনে খাবেন না। এবং অ্যান্টিবায়োটিক যখন কাউকে প্রেসক্রাইব করা হবে, তিনি যেন এর ফুল ডোজ সম্পন্ন করেন।’ এ বিষয়ে সরকারের ব্যাপক প্রচারণা চালানোর পরামর্শ দেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘দেশে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনও নীতিমালা নেই। তবে ডব্লিউএইচও’র অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সার্ভিল্যান্স নিয়ে প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের রিপোর্ট দেয়। সেখানে এখন বাংলাদেশ অ্যান্টিবায়োটিক সার্ভিলেন্স ডাটা এন্ট্রি করে এবং এটা বাংলাদেশ শুরু করেছে ২০১৮ সাল থেকে।’

তিনি বলেন, ‘হিউম্যান হেলথ-এর মধ্যে কমিউনিকেশন, সোশ্যাল মবিলাইজেশন, অ্যাডভোকেসি করা হয়েছে এবং করা হচ্ছে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত। অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে যেন ল্যাবরেটরিতে ইউনিফর্ম রিপোর্টিং সহায়তার জন্য এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) তৈরি করেছি।’
২০১৭ থেকে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে, বলেন অধ্যাপক ডা. সানিয়া।

ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ-এর সহযোগী অধ্যাপক ও প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডা. ফরহাদ মঞ্জুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত, ওষুধের দোকানের বিক্রেতাদের কাছে প্রতিদিন জ্বর বা অন্যান্য অসুখ নিয়ে আসেন, তারাও বিজ্ঞের মতো অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দেন, কিন্তু তারা তো সঠিক ডোজ দিতে পারেন না। এতে সাময়িকভাবে রোগী সুস্থ হলেও শরীরে থাকা জীবাণু ধীরে ধীরে ওই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘আবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিলেও রোগী হয়তো সুস্থবোধ করায় পুরো ডোজ সম্পন্ন করছেন না, এতেও তার শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যায়। তৃতীয়ত, ভেজাল ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্টের আরেকটি প্রধান কারণ।’

ডা. ফরহাদ মঞ্জুর আরও বলেন, ‘যে ওষুধের কাঁচামাল থাকার কথা ৫০০ মিলি গ্রাম, সেখানে থাকে ৩০০ মিলিগ্রাম। এতে ধীরে ধীরে জীবাণু ওই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স গড়ে তোলে।’ একই সঙ্গে দেশে এ ধরনের চিকিৎসক আছেন, কিছু হলেই যারা রোগীকে হাইডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছেন। অযথা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কারণেও রোগীর শরীরে ধীরে ধীরে রেজিস্ট্যান্স ক্যাপাসিটি গড়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

/এইচআই/এমওএফ/

লাইভ

টপ