জঙ্গিবাদে জড়ানো নারীর সংখ্যা বাড়ছে

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০০:৫১, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:২১, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯

 

উগ্রবাদবিরোধী জাতীয় সম্মেলনজঙ্গিবাদে জড়ানো নারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। নানা কৌশলেই বেড়ে যাচ্ছে তাদের অংশগ্রহণ। কেউ আসছে স্বেচ্ছায়, কাউকে আনা হচ্ছে জোর করে বা ধর্মের দোহাই দিয়ে মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে পরিবার কিংবা স্বামীর প্ররোচনাও ভীষণ ভূমিকা রাখছে। জঙ্গিবাদে জড়িত স্বামীর সঙ্গে বাধ্য হয়ে কিংবা এ ধরনের মনোভাব পোষণকারী পুরো পরিবারের সঙ্গে নারীরাও জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদে। আবার অনেক নারী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু বা সহপাঠীর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে। কেউ কেউ ধর্মীয় শিক্ষার নামে গড়া কথিত পাঠচক্রের মাধ্যমেও উগ্রবাদে জড়াচ্ছে। ২০১৬ সালের পর থেকে গত তিন বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৮৫ জন নারী জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন হামলা ও অভিযানে ১১ জন নারী আত্মঘাতী বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গণমাধ্যমে তাদের তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করা হলেও মূলত অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণেই দূর হচ্ছে না নারীজঙ্গিদের আত্মপ্রকাশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরজিম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর উদ্যোগে দুইদিন ব্যাপী উগ্রবাদবিরোধী জাতীয় সম্মেলনের একটি সেমিনারে এসব তথ্য জানান এই সংস্থার উপ পুলিশ-কমিশনার আব্দুল মান্নান। ‘উইমেন ইন টেরোরিজম অ্যান্ড প্রিভেন্টিং এক্সট্রিমিজম’ শীর্ষক এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন তিনি। সোমবার (৯ ডিসেম্বর) সকাল ১১ টায় রাজধানীর কুড়িলে ইন্টারন্যাশনাল কনভনেশন সিটি, বসুন্ধরায় দুই দিনব্যাপী উগ্রবাদবিরোধী জাতীয় এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। ডিএমপির সিটিটিসি, ইউএস-এইড ও ইউএন এর যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন শেষ হবে ১০ ডিসেম্বর।

২০১৬ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় মানারাত ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চার নারী জঙ্গিকে (ফাইল ছবি)গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে উপ-কমিশনার আব্দুল মান্নান সেমিনারে বলেন, ‘দিন দিন নারীদের র‌্যাডিক্যাল হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে স্বামীর প্রতি বাধ্য থাকা, দারিদ্র্য, নারীদের নিজেদের প্রান্তিক হিসেবে বিবেচনা করা, শিক্ষার অভাব, বৈষম্য ও অনলাইন বা অফলাইনে ধর্মীয় শিক্ষার নামে নারীরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ন বা আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকার কারণে তারা স্বামীর ওপর নির্ভরশীল থাকেন। একারণে কোনও পরিবারের কর্তা বা পুরুষ লোকটি যদি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন তাহলে ওই পুরুষ ব্যক্তি নিজের গোপনীয়তা বা ধর্মীয় মতাদর্শের কারণে নিজের স্ত্রীকেও দলে ভেড়ান। এক্ষেত্রে স্ত্রী বা ওই নারী স্বামীর অবাধ্য হতে পারেন না। এছাড়া সমাজে বা পরিবারে অনেক শিক্ষিত নারীও ‘রোল প্লে’ করতে না পেরে নিজেদের মার্জিলাইজেশন হিসেবে গণ্য করেন। কেউ কেউ সহপাঠী বা বন্ধুদের মাধ্যমে কিংবা ধর্মীয় শিক্ষার পাঠচক্রের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন।’

আশকোনায় আত্মঘাতী হামলায় নিহত নারী জঙ্গি২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর আশকোনায় জঙ্গিবিরোধী এক অভিযানে সাকিরা নামে এক নারী জঙ্গি বিস্ফোরক ভেস্ট পড়ে প্রথম আত্মঘাতী হয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মূল প্রবন্ধে তিনি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া নারীদের শিক্ষার আনুপাতিক হার, শহর এবং গ্রামের নারীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার হার এবং অর্থনৈতিক অবস্থার হারও তুলে ধরেন। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সেমিনারে অংশ নেওয়াদের সঙ্গে খোলা আলোচনাও হয়।

সেমিনারের মডারেটর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. তানিয়া হক বলেন, ‘নারীরা সবসময়ের জন্যই পিসফুল অ্যাক্টর হিসেবে থাকেন। তাদের ভেতরে যে মমত্ববোধ, এই মমত্ববোধকে আগে দুর্বলতা হিসেবে ভাবা হতো, এটা এখন সহিংস উগ্রবাদ ঠেকাতে কাজে লাগাতে হবে।’ তিনি বলেন, আমাদের দেশে তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা বিরাজমান। এগুলো সমাজে বিভাজন তৈরি করে। এগুলো নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। গ্রাম এবং শহরের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। অভিন্ন একটি পৃথিবী তৈরি করতে নারীর ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যাবে না।’

সেমিনারে অংশ নেওয়া মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘সহিংস উগ্রবাদের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। উগ্রবাদ ঠেকাতে সমাজের প্রত্যেকটি স্টেকহোল্ডার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারিবারিক বন্ধন বা পরিবারের ভিত্তি শক্ত করা।’ নারীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগেও নারীরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল। নারীদের মাধ্যমে দাওয়াতি কাজ করানো হতো বেশি। এসব ঠেকাতে পরিবারে নৈতিক ভিত্তি আরও বেশি মজবুত করতে হবে।’

২০১৭ সালের ৩০ জুন কুষ্টিয়ায় অপারেশন টেডিপ পাঞ্চে গ্রেফতার হয় তিন নারী জঙ্গি (ফাইল ছবি)আলোচনায় অংশ নেওয়া দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষেরা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, অশিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে নিরাপত্তাহীনতাই জঙ্গিবাদে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদকর্মী শেখ সাবিহা বলেন, ‘জঙ্গিবাদ ঠেকাতে সর্বপ্রথম শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কারণে শিশুরা চিত্তবিনোদন বা মানসিক উৎকর্ষমূলক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে পারছে না। এছাড়া স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষার বইয়েও এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা শিশুমনকে শূন্য সহনশীলতা তৈরি না করে বিপরীতে কাজ করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পুলিশ পাহারায় বোরকা পরিহিত দুই নারী জঙ্গি (ফাইল ছবি)সম্মেলনের অপর একটি সেশনে কাউন্টারিং ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম ফ্রম বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়। এই সেশনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার কারণ, লক্ষণ, সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধে সিটিটিসি গৃহীত সব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। আরেকটি সেশনে সহিংস উগ্রবাদবিরোধীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা অভিজ্ঞতা সম্মেলনে আগতদের সামনে তুলে ধরেন বক্তারা।

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে উগ্রবাদবিরোধী জাতীয় সম্মেলনে দিনভর বেশ কয়েকটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সেমিনারে বক্তারা উগ্রবাদবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করতে এসব বার্তা দেশের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। সম্মেলনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ধর্মীয় প্রতিনিধি, সাংবাদিক, বিদেশী কূটনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।

/এনআই/টিএন/

লাইভ

টপ