কেরানীগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডসবাইকে কারখানা থেকে বের করতে গিয়ে নিজে বের হতে পারেননি মাহবুব

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০২:২৮, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:১৯, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯

দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মাহবুবুর রহমান ছিলেন বড়, বয়স ২৪ বছর। ছোট থেকেই অভাবের সংসার দেখে অভ্যস্ত মাহবুব একসময় সিদ্ধান্ত নেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার আদম কুটিপাড়া গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় আসবেন, টাকা রোজগার করবেন, সংসারে স্বচ্ছ্বলতা ফেরাবেন। আর সে চিন্তা থেকেই পাঁচ বছর আগে মাহবুব ঢাকায় আসেন, কিছুদিন এদিক সেদিক করে তারপর চাকরি নেন কেরানীগঞ্জের হিজলতলার ওয়ান প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্ল্যাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ নামের কারখানায়। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি এই কারখানাতেই কাজ করছিলেন।

বুধবার বিকালের দিকে যখন টেলিভিশনে এই কারখানায় আগুনের ঘটনা জানতে পারেন মাহবুবেরর চাচা লাভলু মিয়া, তখন থেকেই তিনি অনবরত মাহবুবের মোবাইল ফোনে কল করে যাচ্ছিলেন। রিং বেজে যায়, কিন্তু মাহবুব আর ফোন ধরেননি। তারপর একটা সময় ফোনে রিং হওয়াটাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কারখানায় যান তারা, সেখানে মাহবুবকে পাননি, তারপর যান ঢাকা মেডিক্যল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে। ইউনিটের দেয়ালে সাঁটানো রোগীদের নামের তালিকাতেও তারা মাহবুবের নাম দেখতে পাননি।

পুরো রাত তারা কারখানা থেকে পুরান ঢাকার মিটর্ফোড হাসপাতালসহ সব হাসপাতাল, ক্লিনিকে খুঁজেছেন। কোথাও পাননি। অবশেষে বৃহস্পতিবার ( ১২ ডিসেম্বর) সকালে তারা ঢামেক হাসপাতালের মর্গে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পান পুড়ে যাওয়া ক্ষত-বিক্ষত শরীর, চোখ গলে বের হওয়া, মাথার চুল পর্যন্ত পুড়ে গেছে; কেবল বাম হাতে রয়েছে একটি ব্রেসলেট-আর সেই ব্রেসলেট দেখেই তারা চিনতে পারলেন- এটাই মাহবুব।

‘কয়লার মতো লাশটা আমাদের মাহবুবের’ একথা বলেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভেতরের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কাঁদতে থাকেন লাভলু মিয়া। তিনি বলেন, ‘‘১৭ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করতে এসে বাড়ির ছেলেটা ‘কয়লা লাশ’ হয়ে গেলো।’’

এসময় চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মাহবুবের রিকশাচালক বাবা গুলজার হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলেই সবকিছু , ইয়া আল্লাহ- তুমি কী করলা’। তিনি বলেন, ‘পরিবারটাই চালাতো মাহবুব, আমার ছেলেটাই সংসারের হাল ধরেছিল।’

গ্রামের বাড়িতে থাকা মা এখনও জানেন মাহবুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে। কিন্তু ছেলেটাকে নিয়ে বাবা বাড়ি যাবেন কীভাবে, ছেলের মুখটাও তো মাকে দেখাতে পারবেন না,  এসব বিষয়ে কথা বলতে বলতে নিশ্চুপ হয়ে যান মাহবুবের বাবা।

পাশ থেকে আরেক স্বজন বলেন, ‘যেহেতু কারখানা অবৈধ শুনতেছি, তাই মালিকের শাস্তি চাই, সে কেন অবৈধভাবে কারখানা চালাচ্ছিল সেই জবাব চাই, বিচার চাই আমরা সরকারের কাছে।’

মাহবুবের সঙ্গেই কাজ করতেন ফরহাদ। একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে দুজনের সর্ম্পকটা ছিল বন্ধুর মতো, বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের মতো। ফরহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্যাস সিলিন্ডার লিক’ হওয়ার পর মাহবুব চিৎকার করতে করতে ভেতরে ঢোকে, সবাইকে বাইরে বের হতে বলে। সবাই সামনের দিক থেকে বাইরে এলেও মাহবুব নিজে আসছিল না, সে সবাইকে সতর্ক করার জন্য ভেতরে যায়, শেষে আর সেখান থেকে বের হতে পারে নাই।’

এদিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সবার শ্বাসনালী পুড়ে গেছে জানিয়ে বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমার চাকরি জীবনে এটা সবচেয়ে ভয়াবহ ইনজুরি’।

বুধবার সন্ধ্যায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সবাইকে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় হাসপাতালে মারা গেছেন মাহবুবসহ মোট ১৩ জন।  

পুরানো বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে এখন রয়েছেন আট জন, তাদের সবাইকে এইচডিইউতে রাখা হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সার্জারি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান সরকার। তাকে প্রধান করেই অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসায় ১২ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

অধ্যাপক ডা. বিধান বলেন, ‘যারা পুরাতন বার্ন ইউনিটে রয়েছেন, তাদের সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে, সবারই শ্বাসনালী পোড়া। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এখন সবার চিকিৎসা চলছে।’ যাদের চামড়া লাগানোর প্রয়োজন, সেটাও অ্যাসেসমেন্ট করে খুব তাড়াতাড়ি করা হবে বলেও জানান তিনি।

 

 

/এএইচ/

লাইভ

টপ