ছিনতাই-হত্যা বাড়ছে অটোরিকশায়, আতঙ্কে যাত্রীরা

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ২২:১৫, জানুয়ারি ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৬, জানুয়ারি ২২, ২০২০

সিএনজিরাজধানীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালুর সময় চালক ও যাত্রীর দুই পাশে কোনও দরোজা ছিল না। পরবর্তী চালক-যাত্রী—উভয়ের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য অটোরিকশায় লোহার দরোজা যুক্ত করা হয়। তবে, এতে চালকের নিরাপত্তা বাড়লেও যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। কারণ, দুই দিকে দরোজা থাকলেও ওপরের দিকের রেক্সিনের ছাউনি কেটে চলে ছিনতাই। অভিযোগ রয়েছে, চালক ও দুর্বৃত্তের যোগসাজসে ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। শুধু মালামাল ছিনতাই নয়, ছিনিয়ে নেওয়ার পর যাত্রীকে হত্যার ঘটনাও ঘটছে।
গত ৬ জানুয়ারি হাতিরঝিলে মিজানুর রহমান মিজান নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মোবাইল, মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাকে হত্যা করে ফেলে যায় চালক ও দুর্বৃত্তরা। অভিযোগ রয়েছে—যাত্রীদের ছিনতাইয়ের পাশাপাশি চালকের সঙ্গে যোগসাজসে টানা পার্টির সদস্যরা ঘুরে ঘুরে ছিনতাই করছে। গত ২৬ ডিসেম্বর মগবাজার সড়কের হলি ফ্যামেলির মোড়ে অটোরিকশায় আসা টানা পার্টির সদস্যদের কবলে পড়েছিলেন মধুবাগের বাসিন্দা আবু তাহের মো. সাত্তার। তার সঙ্গে থাকা স্ত্রীর হ্যান্ডব্যাগ ছিনিয়ে নেয় টানা পার্টির সদস্যরা। ব্যাগে থাকা স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইলফোন, নগদ টাকাসহ অন্যান্য জিনিস ছিল।
ভুক্তভোগী, যাত্রী, অটোরিকশা চালক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে অটোরিকশাকেন্দ্রিক চার পদ্ধতিতে ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো ঘটছে। সেগুলো হলো—কিছু খাইয়ে যাত্রী বা চালককে অজ্ঞান করে ছিনতাই, বড় সিগন্যালগুলোতে অটোরিকশার ছাউনি কেটে যাত্রীর ব্যাগ-মোবাইল ছিনতাই, নির্জন স্থানে অটোরিকশা থামিয়ে চালকের অন্য সহযোগীদের মাধ্যমে ছিনতাই এবং অটোরিকশায় চড়ে টানা পার্টির ছিনতাই।

রাজধানীর মগবাজার সড়ক, হাতিরঝিল, মৎস্যভবন এলাকা, মানিক মিয়া এভিনিউ, গাবতলী, উত্তরা, বনানী সড়ক এলাকায় এসব ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। তবে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর জড়িতদের শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

এই প্রসঙ্গে রমনা থানা এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার যাত্রী মো. সাত্তার বলেন, ‘আমার স্ত্রীর ব্যাগ ছিনতাইয়ের পর রমনা থানায় অভিযোগ দিয়েছি। ঘটনাস্থলের আশপাশে বিভিন্ন ভবনে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এগুলো পরীক্ষা করলে, অটোরিকশার নম্বরও বের করা সম্ভব হতো। নম্বর বের করা গেলে চালকসহ জড়িতদের গ্রেফতার সম্ভব হতো। কারণ চালকের সহযোগিতায় টানা পার্টির সদস্যরা এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে।’

জানতে চাইলে অভিযোগটি তদন্ত করে কোনও অগ্রগতির তথ্য জানাতে পারেননি রমনা থানার উপ-পরিদর্শক নারায়ণ সরকার। তিনি বলেন, ‘একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল। অটোরিকশায় করে ছিনতাইকারীরা এসে ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তবে এখনও জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা তাদের শনাক্তে চেষ্টা করছি।’

এদিকে গত ৬ জানুয়ারি হাতিরঝিলে শিক্ষার্থী মিজানুর রহমানকে সিএনজি অটোরিকশাচালক ও দুর্বৃত্তরা মিলে ছিনতাইয়ের পর হত্যা করেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। জড়িতদের শনাক্তের পাশাপাশি গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার। তিনি বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, অটোরিকশাতেই ছিনতাইয়ের পর হত্যাকাণ্ডটি দুর্বৃত্তরা ঘটিয়েছে। তাদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

সিএমপি-২

সিএমপি সফলতা পেয়েছে, প্রয়োজন ডিএমপির উদ্যোগ

ছিনতাই, হয়রানিসহ অটোরিকশা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে সফলতা পেয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।  সিএমপিতে চলাচলকারী সব সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভেতরে চালক-মালিকের পরিচিতি কার্ড সাঁটানোর হয়েছে। এরফলে চোরাই গাড়িগুলো শহরে চলতে পারছে না। আর চালকরাও সতর্কতার সঙ্গে যাত্রীদের সঙ্গে ব্যবহার করছে।

চলতি মাসের শুরুতে এই উদ্যোগ নেওয়ার কারণে সফলতা এসেছে বলে জানিয়েছেন সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোশতাক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি। এরফলে যাত্রী অটোরিকশায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চালক ও গাড়ির মালিকের পরিচয় পেয়ে যাবেন। যে কারণে চালক অন্যায় কিছু করার ক্ষেত্রে সাবধান থাকবেন। এছাড়া অনেকে গাড়ির ভেতর ভুলে জিনিসপত্র বা ব্যাগ ফেলে যান, যেগুলো পরে পাওয়া যায় না। এখন যাত্রীর কাছে যদি চালক ও অটোরিকশার মালিকের পরিচয়, মোবাইল নম্বর থাকে, তাহলে ওই অটোরিকশাটি শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়ে যায়।’

পরিচিতি কার্ড লাগানোর পর সুফল পাওযা যাচ্ছে উল্লেখ করে মোশতাক আহমেদ বলেন, ‘অটোরিকশায় পরিচিতি কার্ড লাগানোর পর আমরা সাইকোলজিক্যাললি একটি চমৎকার ফল পাচ্ছি। যাত্রীর কাছে যখন চালক-মালিকের তথ্য থাকছে, তখন স্বাভাবিকভাবে চালক খুব সতর্কভাবে গাড়ি চালান। একইভাবে বাসের ভেতরে নম্বর দেওয়ার পর দেখা গেছে, বাসের চালকরাও সুন্দরভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন।’

সিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকাসহ সারাদেশের অটোরিকশাগুলোর ভেতরে পরিচিতি কার্ড লাগানো উচিত। এতে অটোরিকশাকেন্দ্রিক অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটোরিকশা শ্রমিক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ বলেন, ‘কিছু অসাধু চালকের সঙ্গে টানা পার্টির সদস্যদের যোগসাজসে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলো করছে। তবে, সংগঠনের পক্ষ থেকে অটোরিকশাচালকদের এ ব্যাপারে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অটোরিকশার ভেতরে ছবিসহ চালক-মালিকের পরিচয় ঝুলিয়ে রাখার কথা সিএনজিচালিত অটোরিকশা সার্ভিস রুলে রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে অটোরিকশাকেন্দ্রিক অপরাধ প্রায় ৮০ ভাগ কমে আসবে।’

 মো. হানিফ আরও বলেন, ‘সিএনজি সার্ভিস রুল-২০০৭-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যাত্রী যেন দেখতে পায় এমন স্থানে ছবিসহ চালক ও মালিকের নাম ঠিকানা থাকবে। চট্টগ্রাম পুলিশ উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা এর সাধুবাদ জানাই। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেরও এটা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’ এই উদ্যোগ নিলে অটোরিকশাকেন্দ্রিক অপরাধ ৮০ ভাগ কমে আসবে বলেও তিনি মনে করেন।

জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সিএনজি অটোরিকশায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চালকদের সচেতন করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। তবে, অটোরিকশার ভেতরে চালক ও মালিকের পরিচিতি দৃশ্যমান স্থানে রাখার যে উদ্যোগ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ নিয়েছে, তা নিসন্দেহে ভালো উদ্যোগ।’ ভবিষ্যতে  ডিএমপিতেও বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন বলেও তিনি জানান।’ 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ