চোখের পলকে পুড়ে গেলো ২শ’ বসতঘর, ষড়যন্ত্র দেখছেন বস্তিবাসী

Send
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত : ০৫:৫২, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০২, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০

‘ভোর আনুমানিক ৫টা, আমরা সবাই ঘুমে ছিলাম। হঠাৎ চিৎকার শুনে জেগে গেলাম। কানে আওয়াজ আসলো বস্তির পশ্চিম কোনায় আগুন লেগেছে। তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বের হতে না হতেই আগুন আমাদের ঘর পর্যন্ত চলে আসলো। ছেলেমেয়েকে নিয়ে কোনোমতে ঘর থেকে বের হয়েছি। পরনের শার্ট আর লুঙ্গি ছাড়া আর কিছুই বাঁচাতে পারিনি।’

কথাগুলো বলছিলেন নগরীর মাদারবাড়ি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া এসআরবি বস্তির বাসিন্দা আবদুল হালিম। বরিশালের বরগুনা এলাকার বাসিন্দা হালিম দুই মেয়ে, এক ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই বস্তিতে বসবাস করে আসছেন। সোমবার ভোরে এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে তার ঘরের সব আসবাবপত্র পুড়ে যায়। পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই আগুন থেকে বাঁচাতে পারেনি তার পরিবার।

আব্দুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চোখের পলকে পুরো বস্তি আগুনে পুড়ে গেলো। এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে আমি আর কখনও দেখিনি। একটা জীবন্ত নারিকেল গাছ, পুরোটা পুড়তে ২ মিনিটও সময় লাগেনি। আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে।’

কী কারণ থাকতে পারে জানতে চাইলে আব্দুল হালিম বলেন, ‘কেউ গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে পারেন। না হয়, এত দ্রুত পুরো বস্তি কীভাবে পুড়ে যায়। বস্তির একটা ঘরও অবশিষ্ট নেই, আগুনে সব ঘর পুড়ে গেছে।’

দুপুরে আগুনে পুড়ে যাওয়া ওই বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, সহায়-সম্বল হারানো মানুষগুলো পুড়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিচ্ছেন। সবার চোখেমুখে বিষাদের চাপ। সহায় সম্বল হারিয়ে অনেকে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন।

বস্তির মাঝখানের একটি ঘরের ধ্বংসাবশেষে বসে বিলাপ করে কাঁদছিলেন ৬০ বছর বয়সী জাকিয়া বেগম। কর্ণফুলী ঘাটে কিংবা গোডাউনে আনার পথে মাঝিরঘাট, পশ্চিম মাদারবাড়ি, বাংলাবাজার এলাকার রাস্তায় পড়ে যাওয়া গম কুড়িয়ে বিক্রি করতেন এই নারী। আগুনে তার কষ্ট করে জমানো ৩ লাখ টাকা পুড়ে গেছে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে জাকিয়া বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা জমিয়ে ছিলাম। সমিতিতে জমানো সেই টাকা তুলে এনে ঘরে রেখেছিলাম। আগুনে সব পুড়ে গেছে। আমি শেষ হয়ে গেছি। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দিবো কীভাবে?’

জাকিয়ার প্রতিবেশী বস্তির অন্য বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মেয়ে আমেনাকে বিয়ে দিতে জাকিয়া এবং আমেনা মিলে টাকাগুলো জমিয়েছিলেন। মেয়েকে ভালো ঘর দেখে বিয়ে দিবেন। তাই আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শে ভাড়া বাসা নিয়ে থাকার কথা ছিল। আগামী মাসে তারা ভাড়া বাসায় উঠতেন। কিন্তু তার আগেই আগুনে তার সব পুড়ে গেছে। শুধু জাকিয়া নয়, তার মতো বস্তিতে বসবাসকারী প্রায় ২০০টি পরিবার আগুনে নিঃস্ব হয়ে গেছে। পরনের জামা-কাপড় ছাড়া কেউ কিছু রক্ষা করতে পারেনি। তাদের ধারণা কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের কাগজপত্রসহ প্রায় এক লাখ টাকার মালামাল ছিল ট্রাক ড্রাইভার মনির হোসেনের ঘরে। আগুনে তার সব জিনিস পুড়ে গেছে।

পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাদের পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে দাবি করে মনির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগুন ভোর রাতে লেগেছে। তখন বস্তির সবাই ঘুমে ছিল। কারও ঘরে রান্নার চুলা জ্বালানোর প্রশ্নই আসে না। তাহলে আগুন লাগলো কীভাবে? নিশ্চিত কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। না হয়, ভোর রাতে যখন বস্তির সবাই ঘুমাচ্ছে, তখন আগুন লাগলো কেন? তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলকে খতিয়ে দেখার দাবি জানান।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন ওই বস্তির বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী যুবক মোহাম্মদ রানা। ট্রাকচালকের সহকারী হিসেবে কর্মরত এই যুবক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বস্তির পশ্চিম কর্নারের মোহাম্মদ আলীর ঘর থেকে আগুন লেগেছে। ঘরে উনি আর উনার অসুস্থ ভাই ছিলেন। আগুন লাগার পর মোহাম্মদ আলীর ভাই শাহাব উদ্দিন আমাদের জানিয়েছেন আগুন লাগার পরপরই কয়েকজনকে তিনি দৌড়ে পালাতে দেখেছেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, আগুন লাগার পর যারা দ্রুত পালিয়ে গেছে তারা কারা? আর বস্তির এক কোণের একটি ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হলো কেন? আর যেদিকে বের হওয়ার পথ ওই পাশের এক কোণের ঘরেই কেন আগুন লাগলো। আমাদের ধারণা কেউ পরিকল্পিতভাবে এই আগুন লাগিয়েছে। আগুনে আমাদের সব পুড়ে গেছে। আমরা এই ঘটনা তদন্ত চাই।

এসআরবি বস্তির জায়গাটি রেলওয়ের। কিন্তু বিগত প্রায় ৫০ বছর ধরে এখানে নগরীর নিম্ন আয়ের মানুষ ঘর তৈরি করে থেকে আসছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৪০ বছর আগে জলিল টেক্সটাইলের মালিক আবদুল জলিল চৌধুরী রেলওয়ের কাছ থেকে জায়গাটি লিজ নিয়েছিলেন। জায়গাটি নিয়ে রেলওয়ের সঙ্গে জলিল চৌধুরীর দ্বন্দ্ব ছিল। এ নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আদালতে মামলা দায়ের করে। তিন বছর আগে ওই মামলায় জলিল চৌধুরীর পক্ষে আদালত রায় দেন। এরপর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আদালতে আপিল করে। গত ৮/৯ মাস আগে এই মামলার আপিল শুনানি হয়। শুনানিতে আদালত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষে রায় দেন।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই বস্তির সর্দার মোহাম্মদ ইয়াকুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জায়গাটা নিয়ে রেলওয়ের সঙ্গে জলিল চৌধুরীর দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু গত ৮/৯ মাস আগে এটি সমাধান হয়ে যায়। আদালত রেলওয়ের পক্ষে রায় দিলে জলিল চৌধুরী মালিকানা ছেড়ে দেন। তারপর ওই জায়গা নিয়ে আর কোনও ঝামেলা তৈরি হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকের সন্দেহ কেউ আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। কারণ আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে তাতে এমন সন্দেহ হওয়ারই কথা। আর আগুনের তীব্রতাও ছিল অনেক বেশি। সাধারণত আগুনের যে তাপ থাকে আজকের বস্তির আগুনে তার চেয়ে অনেক বেশি তাপ ছিল। কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কিনা আমরা এটি নিশ্চিত নই। তবে পুড়ে যাওয়া ঘরের জায়গায় নতুন ঘর তৈরি করতে গেলে যদি কেউ বাধা দেয়, তাহলে বুঝবো তারাই পরিকল্পিতভাবে বস্তি জ্বালিয়ে দিয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে ফায়ার সার্ভিসের আগ্রাবাদ স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক ফরিদ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কীভাবে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে। সেই বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। এটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কিনা এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনও তথ্য নেই। যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা অনেক কিছু দাবি করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, সেটি তদন্ত করে দেখার আগে বলা মুশকিল। হয়তো কেউ আগুন ধরিয়ে দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে। যেহেতু বস্তির সবাই তখন ঘুমে ছিল, তাই স্বভাবত আগুন ধরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি মাথায় আসতে পারে। তবে সেটি নিশ্চিত না হয়ে বলা যাবে না। এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখতে হবে।’

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বস্তির অধিকাংশ ঘর বাঁশ, পলিথিন আর টিন দিয়ে তৈরি ছিল। এগুলো সহজ দাহ্য হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আর ঘরগুলো একটার সঙ্গে একটা লাগানো থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই একটি ঘরও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।’

/এইচকে/এমএমজে/

লাইভ

টপ