নায়ক-নায়িকাদের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে মাসে আয় লাখ টাকা!

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:৫৫, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৩, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

গ্রেফতার দুই হ্যাকার মীর মাসুদ রানা ও সৌরভ।

২০ জনের একটি হ্যাকার গ্রুপ। দলনেতা থাকেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বাকিরা সিলেটে। গ্রুপের নাম ‘টিম সিলেট’। তাদের টার্গেট ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকারা। তাদের পুরো নাম, জন্ম তারিখ, ই-মেইল সংগ্রহ করার পর ‘টিম সিলেট’-এর হ্যাকাররা নামে মিশনে। পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুয়া কপি বানিয়ে হ্যাক করতো ফেসবুক আইডি। এসব করেই তাদের কারও কারও মাসিক আয় ছিল লাখ টাকা। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি তাদের। এই গ্রুপের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব। তারা হলো−মীর মাসুদ রানা (৩৫) ও সৌরভ (১৯)। র‌্যাব-২ এর একটি দল শনিবার সকালে মহাখালী এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে।

র‌্যাব-২-এর সহকারী পরিচালক জাহিদ আহসান জানান, প্রযুক্তির সহায়তায় অনুসন্ধান করে চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের গ্রুপে আরও সদস্য রয়েছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনার জন্য চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, গ্রেফতার হওয়া দুই হ্যাকারের কাছ থেকে ফেসবুক হ্যাকিংয়ে ব্যবহৃত ৪টি মোবাইল, ১টি ল্যাপটপ, বিভিন্ন কোম্পানির ২০টি সিম কার্ড, নকল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অ্যাপস এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিল্পীর ফেসবুক আইডি হ্যাক করার আলামত জব্দ করা হয়।

র‌্যাব সূত্র জানায়, সম্প্রতি তারা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অর্থ আদায়ের একটি অভিযোগ পান। ওই অভিযোগে শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানসহ বেশ কয়েকজন নায়ক-নায়িকার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব-২ এর একটি দল অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে তারা ‘টিম সিলেট’ নামে একটি গ্রুপের সন্ধান পায়।

র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ফেসবুক হ্যাক করা এই গ্রুপটির প্রধান হলো নাসির। সে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সম্প্রতি সে সাইবার অপরাধের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের হাতে গ্রেফতারও হয়েছিল। নাসির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে হ্যাকিং করা শেখাতো। অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর সে ‘টিম সিলেট’ নামে গ্রুপটি গড়ে তোলে। দেশে তার সঙ্গে কাজ করতো গ্রেফতার হওয়া মীর মাসুদ রানা ও সৌরভ। তাদের দলের অপর সদস্যরা হলো−বাবলু রহমান, আতিক, জেইনা রাইহান, আফরাজ মিম আশা, সারাকা মজুমদার, সিনথিয়া, তানভি, সুমাইয়া ও রুবি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রানা ও সৌরভ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকেই নাসির তাদের অনলাইনে ভিডিও টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে কীভাবে ফেসবুক আইডি হ্যাক করতে হবে, কীভাবে নিজের দখলে নিতে হবে, কীভাবে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা যায় এসব শেখাতো। এছাড়া আইডি ফেরত দেওয়ার সময় সতর্কতার সঙ্গে কীভাবে অর্থ নিতে হবে সেটাও শেখাতো নাসির। মোট কথা কারও ফেসবুক আইডি হ্যাক করার পর পুরো প্রক্রিয়াটি যুক্তরাষ্ট্রে বসে সমন্বয় করতো দলের মূল হোতা নাসির।

রানা ও সৌরভ জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে চলচ্চিত্র শিল্পী মিশা সওদাগর, জায়েদ খান, রিয়াজ, শাহনুর, আঁচল, রেসি, কেয়া, মাহি, বিপাশাসহ বেশ কয়েকজন নামি শিল্পীর ফেসবুক আইডি হ্যাক করেছিল। চলচ্চিত্র তারকা ছাড়াও তারা নিয়মিত সাধারণ মানুষের ফেসবুক আইডিও হ্যাক করতো। এসব আইডি ফেরত দেওয়ার নামে ১০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিতো।

র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, হ্যাকাররা যে ফেসবুক আইডিটি দখলে নিতে চায়, সেটির বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে মিথ্যা কারণ দেখিয়ে রিপোর্ট করে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আইডিটি নিষ্ক্রিয় করার পর তারা নিজেদের ই-মেইল ব্যবহার করে সেটি পুনরুদ্ধার করে। এজন্য তারা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে পাঠায়। নিজের দখলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে দেয়। একইসঙ্গে ফেসবুক আইডিতে ব্যবহৃত ই-মেইল ও ফোন নম্বরও পরিবর্তন করে দেয়। পরে মূল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যক্তিভেদে অর্থের বিনিময়ে আইডি ফেরত দেয়।

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা বলেন, যদি কোনও ফেসবুক ব্যবহারকারী হ্যাকারদের পাত্তা না দিয়ে অর্থ না দেয় তাহলে হ্যাকাররা তাদের ফেসবুক আইডি থেকে পরিচিত লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনদের অশ্লীল ছবি পাঠিয়ে সম্মানহানি করার চেষ্টা করে। আবার কারও মেসেঞ্জারে যদি নিজেদের গোপন কোনও ছবি থাকে, তাহলে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় করে।

/এনএল/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ