‘মা ডাক শোনার আনন্দ বোঝেন, নয়তো আপনি বুঝবেন না...’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০১:১৯, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৪৪, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০




বাড়ি ফিরছেন কোয়ারেন্টাইনে থাকা উহান ফেরতরা১৯ বছর আগে ছেলের জন্ম, সেদিন হাসপাতালে ওর মুখটা দেখে যে আনন্দ হয়েছিল, আজ আমার ঠিক সেরকম আনন্দ হচ্ছে… বলে ফোনের অপরপ্রান্তে হুহু করে কাঁদতে থাকেন জহুরুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। আমি আপনাকে পরে ফোন করছি বলে কল কেটে দেন তিনি। কিছুটা ধাতস্ত হয়ে ১০ মিনিট পর নিজেই আবার কল করেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর কথা হয় জহুরুল ইসলামের স্ত্রী রোকেয়া বেগমের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি বোঝাতে তিনি বলেন, ‘মা ডাক শোনার আনন্দ বোঝেন, নয়তো আপনি বুঝবেন না…।’

এই দু’জন চীনের উহান ফেরত এক শিক্ষার্থীরা বাবা-মা। তারা দু’জনেই পেশায় শিক্ষক। জানালেন, দুই সন্তানের মধ্যে বড় সন্তানকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন চীনে। উহান সিটিতে হুবেই ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে লেখাপড়া করতো, ছেলে ছিল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী।

তারা জানান, ছেলে গত ২৫ নভেম্বর চীনে যায়, ২৫ জানুয়ারি একটা পরীক্ষা ছিল। এরপর কিছুদিন ছুটি ছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়মিত ক্লাস শুরুর কথা ছিল, তবে তার আর হয়নি। ১৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকেই ওরা আর রুম থেকে বের হতে পারেনি। ইউনির্ভাসিটি কর্তৃপক্ষ ডর্মেটরি লক করে দেয়। আর ওদের খাবার কেনা ছিল ২০ থেকে ২৫ দিনের মতো। কিন্তু তার আগেই ওরা চলে এসেছে, খাবারের অভাবটা ওরা বোঝেনি।

বিদায়ী ভোজে কোয়ারেন্টাইনে থাকা শিশুদের জন্য ছিল উপহারমা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘যেখানে মরণ রোগ বাসা বেঁধেছে, সেখানেই আছে আমার ছেলেটা-এই অনুভূতি, এই যন্ত্রণা…’ কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি আবার বলেন, ‘মা ডাক শোনার আনন্দ বোঝেন, নয়তো আপনি বুঝবেন না…।’

বাবা জহুরুল ইসলাম বলেন, হজক্যাম্পে শুরুর দিকে কিছুটা অব্যবস্থাপনার কথা শুনেছিলাম। কিন্তু ছেলে তেমনটা পরে আর বলেনি। ফোনে নিয়মিত কথা হচ্ছিল, ব্যবস্থাপনা-খাবারদাবার সবই ভালো ছিল। আমার ছেলে সন্তুষ্ট।

‘জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাড়ি থেকে খাবার পাঠাতে হবে কিনা। কিন্তু হজক্যাম্পে ওদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা ছিল। দুইবেলা ভাতের পাশাপাশি নাশতা দেওয়া হতো। সময় কাটানোর জন্য টেলিভিশন, ওয়াইফাই, খেলার জন্য নানা কিছু দেওয়া হয়েছিল। অনেক কৃতজ্ঞ আমরা, সন্তুষ্ট।’

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি উদ্যোগ না নিতেন, তাহলে উহান সিটি থেকে আসা একেবারেই অসম্ভব ছিল। উহানেও ওরা ১২ দিন কোয়ারেন্টাইনে ছিল, ১২ দিন একেবারে ডর্মে ছিল, বের হতে পারেনি। শুধুমাত্র আসার দিন মেডিক্যাল টেস্ট করে ওদের এয়ারপোর্টে নিয়ে আসা হয়েছিল। ‘ওখানে সবকিছু বন্ধ, বিমানবন্দর-দোকানঘাট। উহানসিটিতো একেবারে কলাপ্স ছিল’, বলেন জহুরুল ইসলাম।

এদিকে, উহান ফেরত সবাই সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, ‘উহান ফেরত সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সবাই সুস্থ আছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে তাদের বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে, তবে তাদের আরও কিছুদিন সীমিত চলাচল করতে হবে।’

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আজ একসঙ্গে সম্প্রীতির নৈশভোজ করেছি, মাস্ক ছাড়া কথা বললাম, কারণ মানুষ ওদের সঙ্গে মিশতে ইতস্তত করতে পারে-এই ট্যাবুটা যাতে ভেঙ্গে যায়।’

তিনি জানান, ৩১২ জনের সবাই বাড়ি ফেরেনি, কালও যাবে অনেকে। ‘হজক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে থাকা শিশুদের খেলনা উপহার দেওয়া হয়েছে’, যোগ করেন মুশতাক হোসেন।

হজক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে থাকা উহান ফেরতদের বিদায় উপলক্ষে নৈশভোজের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষছেলেকে ছাড়া এক মাসের মতো সময় কাটানোর যন্ত্রণা বোঝাতে উহান ফেরত শিক্ষার্থীর বাবা জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘একটা মাস কী করে যে কাটিয়েছি, ওদিকে ছেলে আর এদিকে তার মা। তারা দু’জনইতো কাঁদে। আমি ওপরে ওপরে ভীষণ কঠিন। কিন্তু আমার ভেতরে যে ঝড় ছিল-সেটা কাউকে দেখাতে পারিনি।’

তিনি বলেন, সেই থেকে দিন গুনছি। তারপর ছেলে দেশে এলো, কিন্তু ছেলেটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারছিলাম না। ওর মা প্রতিটা দিন ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখতো, একটা রাত পার হলেই প্রতিদিন সকালে বলতো, আরেকটা দিন গেল …।

ছেলেকে আজ ফেরত পাবেন, তাই কাল রাতে ঢাকায় এসেছেন জানিয়ে জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকায় এসে থেকেছি আত্মীয়ের বাসায়। জানি ওদের ছাড়তে রাত হবে, তারপরও দুপুর থেকে অপেক্ষা করছি।’

রাত ১০টা এক মিনিটে যখন আবার জহুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হচ্ছিল মোবাইলফোনে, তখনই পাশ থেকে কেউ চিৎকার করে বললেন, ‘ছেলে বাইর হইছে’। এরপর আর কথা বলতে পারেননি এই দম্পতি, ফোনের কল কাটার বাটনটাও চাপতে ভুলে গিয়েছিলেন, তখন ওপাশে কেবলই কান্নার শব্দ। তবে হারানোর নয়, প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার কান্না।

/টিটি/

লাইভ

টপ
X