অনুশীলন বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:১০, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১৭, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

শ্রেণিকক্ষে সিলেবাস সম্পন্ন না হওয়ায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এমন অনুশীলনমূলক বইয়ের ওপরে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য দিনে দিনে অপরিহার্য হয়ে ওঠা অনুশীলনমূলক বই বন্ধের প্রস্তাবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে ৯৫ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী অনুশীলনমূলক বই পড়ে। তাই এসব বই বন্ধ করে দেওয়া হলে তা ফল বিপর্যয়সহ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের আশঙ্কা, বিষয়টি তাদের জন্যও বিপর্যয় ডেকে আনবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে পাঠদান না হওয়া, সিলেবাস শেষ করার মতো সময় না পাওয়া ও সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে না পারার কারণে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই অনুশীলন বইয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বইগুলো শিক্ষার্থীদের নিজে থেকে পাঠগ্রহণ ও অনুশীলনে সহায়তা করায় সার্বিকভাবে শিক্ষা সহায়ক বইয়ের এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০১৯-এ নোট-গাইড বন্ধের বিধি যুক্ত করা হয়েছে। এর খসড়া গত সপ্তাহে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উঠবে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত আইনে শিক্ষকদের সবধরনের কোচিং-টিউশন নিষিদ্ধ, শর্তসাপেক্ষে  কোচিং ব্যবসায়কে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

সরকার নোট-গাইডের বিকল্প খুঁজছে বলে জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘নোট গাইড কেন চলে তা আমরা জানতে চাই। সেটা চিহ্নিত করার পরে আমরা পরবর্তী অ্যাকশনে যেতে পারি। আমরা চাই, নোট-গাইডের ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীলতা কমাতে। তবে কী করবো সেটা এখনও চূড়ান্ত নয়। আমরা বিকল্প খুঁজছি।’

অনুশীলন বই নিয়ে সম্ভাব্য অনিশ্চয়তায় উদ্বিগ্ন অনেক অভিভাবক। তারা বলছেন, সন্তানের শিক্ষার বাস্তব প্রয়োজনেই তারা এসব বই কিনছেন। রাজধানীর একটি সরকারি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো লেখাপড়া হলে নোট-গাইডের দরকার হতো না। আমার ছেলের ক্লাসে অনেক সময় রোল কল করতে এবং আগের পড়া নিতে নিতেই শিক্ষকের সময় শেষ হয়ে যায়। ফলে তিনি আর নতুন কিছু পড়ানোর সময় পান না।’

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৃজনশীল পদ্ধতির কারণেও অনুশীলনমূলক বই শিক্ষার্থীদের বড় অবলম্বন হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে পাঠ অনুশীলনের জন্য অনেক উদ্দীপকের দরকার হয়, যার জন্য সহায়ক বইয়ের সাহায্য নেওয়ার বিকল্প নেই। কেননা, এত উদ্দীপক তৈরি করার সময় সাধারণত শিক্ষকদের থাকে না। সব শিক্ষকের সে দক্ষতাও নেই।

২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি চালুর এক যুগ পরেও দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকই এখনও সঠিকভাবে এই পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারেন না।

শিক্ষককরা বলছেন, সৃজনশীল পদ্ধতির ব্যাপারে সব শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাননি। শিক্ষক ম্যানুয়াল দেখে পাঠদানের সক্ষমতা তাদের সবার নেই। এ কারণে অনেক শিক্ষকই গাইড বইয়ের সহায়তা নেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফওজিয়া রেজওয়ানও প্রায় অনুরূপ মত দেন।

তিনি বলেন, ‘নোট ও গাইড না থাকলেই ভালো। তবে রাতরাতি উঠিয়ে দিলে সমস্যা হবে। বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মান যাচাই না করেই টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নোট ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল। নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করার কারণে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। তখন শিক্ষার্থীদের নির্ভর করতে হয় নোট ও গাইডের ওপর। এটা দীর্ঘদিনের কালচার। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত, শিক্ষার মানও জড়িত। অনেকগুলো মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এটা হঠাৎ করে তুলে ফেললে, বিরূপ প্রভাব পড়বে। ধীরে ধীরে তুলে দিতে হবে।’

উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ড. উম্মে সালমা বেগম জানান, ‘বই কঠিন, শিক্ষকের সহায়তা ছাড়া শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে না। স্কুলে পুরোপুরি সহায়তা পাচ্ছে না, তাই শিক্ষার্থীরা নোট ও গাইড বইয়ের সহায়তা নিচ্ছে। এক বছরে ১৪০ দিন ক্লাস নিতে পারি। অথচ পুরো বছরের জন্য কারিকুলাম। কারিকুলাম ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা নোট ও গাইডের সহায়তা নেয়।  আর সহজে যেখানে নোট-গাইড পাওয়া যাচ্ছে সেখানে শিক্ষকরা সহজে তা গ্রহণ করছে। এছাড়া দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকরা ক্যাপাবল না।’

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বর্তমানে দেশের গ্রাম ও শহরাঞ্চলে দুই ধরনের সমস্যা বিরাজমান। শহরের অনেক নামি প্রতিষ্ঠানে এক একটি ক্লাসরুমে ৮০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী থাকে। ফলে শিক্ষকেরা পাঠদানে শিক্ষার্থীদের প্রতি আলাদা করে মনোযোগ দিতে পারেন না। আবার গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের দক্ষতা ও যোগ্যতার ঘাটতি আছে। অনেক স্থানে শিক্ষকের সংখ্যাও কম বা কখনও কখনও দীর্ঘসময় পদ শূন্য থাকে। সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশিক্ষণ বেশিরভাগ শিক্ষকই পাননি। আবার যারা পেয়েছেন তাদের কার্যত দেওয়া হয়েছে নামেমাত্র প্রশিক্ষণ। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েরই ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে অনুশীলনমূলক গ্রন্থ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এই খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘নোট-গাইড’ নিয়ে সরকারের আপত্তির একটি বড় কারণ হচ্ছে—একশ্রেণির অসাধু শিক্ষক ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থ কিনতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন। শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ একে সৃজনশীলতা চর্চার পরিপন্থী বলেও মনে করেন।

প্রকাশকরা বলছেন, বস্তুত শিক্ষার্থীদের অনুশীলনের জন্য শিখনফলভিত্তিক নমুনা প্রশ্ন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার প্রশ্ন ও তার নমুনা উত্তর, উত্তরের ব্যাখ্যা এবং নিজে নিজে উত্তর করার মতো পর্যাপ্ত  প্রশ্নব্যাংক সংবলিত বই হচ্ছে অনুশীলনমূলক বই। বর্তমানে নোট-গাইড নয়; বরং শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অনুশীলনমূলক বই প্রকাশ করছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সনাতন ধারার নোট-গাইড তৈরি করা সম্ভবও নয়।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস) সহ-সভাপতি শ্যামল পাল বলেন, ‘এসব গ্রন্থ প্রকাশ ও বিক্রির সঙ্গে অন্তত ৮টি পেশার প্রায় ২৩ লাখ ১০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। এই খাতে হয়েছে সাড়ে ২১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। এসব বইয়ের প্রকাশনা বন্ধ করা হলে সরকার একদিকে শত কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে, আরেকদিকে কর্মহীন হয়ে পড়বে লাখ লাখ মানুষ। এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনমনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

 

/এসএমএ/টিএন/

লাইভ

টপ