মাস্তান দিয়ে শাহমখদুম মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের হলছাড়া!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২৩:৩৭, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৩, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া ৬ বছর ধরেই চলছে রাজশাহীর শাহ মখদুম মেডিক্যাল কলেজ । কলেজটি থেকে একের পর এক শিক্ষার্থী পাস করে বের হলেও তারা কোথাও ইন্টার্ন করতে পারছেন না। কোথাও চাকরি করতে পারছেন না। আর বিএমডিসির অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলায় কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনিরুল ইসলাম মাস্তান দিয়ে মারধর করে শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মনিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এসব বলে এখন সিমপ্যাথি আদায় করতে চাচ্ছে।’

একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, ২০১৩ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই মেডিক্যাল কলেজের অ্যাকাডেমিক অনুমোদন দিলেও আড়াই মাসের মাথায় সে অনুমোদন স্থগিত করা হয়। তবে ১০ মাস পর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে ২০১৪ সালে আবার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধিভুক্ত না হয়েই শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য ২৫ লাখ টাকা জরিমানাও গুনতে হয় কর্তৃপক্ষকে। 

শাহ মখদুম মেডিক্যাল কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কোনও  নিয়মের তোয়াক্কা না করে ২০১৩ সালে রাজশাহীতে শাহ মখদুম মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। জনপ্রতি গড়ে ২০ লাখ টাকা নেয় ভর্তির জন্য। অথচ প্রতিষ্ঠার ৬ বছর পরেও প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের ( বিএমডিসি) অনুমোদন পায়নি। যে কারণে এ প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা চিকিৎকরা কোথাও ইন্টার্নশিপ করতে পারছে না। কলেজের হাসপাতালে রোগী না থাকায় তারা প্র্যাকটিসও করতে পারেন না। আর এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে মেডিক্যালে ভর্তি প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা গত এক সপ্তাহ  ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলন যান। 

শিক্ষার্থীরা বলেন,‘আন্দোলন ঠেকাতে শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে ছাত্রদের শনিবার রাত ৮টা এবং ছাত্রীদের রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টার মধ্যে হোস্টেল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। শনিবার বিকেলে কলেজের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও শিক্ষার্থীরা হল না ছাড়ায় মাস্তান ডেকে রবিবার ভোরে তাদের মারধর করে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঞ্চম বর্ষের একাধিক নারী শিক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের আল্টিমেটাম দিয়েছিল রবিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত। কিন্তু সে পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করেনি। ভোর পাঁচটায় কলেজের এমডি মনিরুল ইসলাম নিজে উঠে আসেন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে। যেখানে সিনিয়ররা থাকেন সে গেটে তালা দিয়ে দেন মনিরুল ইসলাম ও তার পোষা মাস্তানরা। আমরা যেন জুনিয়রদের কাছে না যেতে পারি সে জন্যই তালা দেওয়া হয়। জুনিয়রদের ফোনও কেড়ে নেন মনিরুল।’

শিক্ষার্থীদের দাবি, ‘উনি আসলে প্ল্যান করেছিলেন, জুনিয়রদের বের করে দেবেন আর আমরা যারা সিনিয়র আছি তাদের তালা দিয়ে রাখবেন। ছেলেদের ভবনে তালা দিয়ে রাখেন যেন তারাও বের হতে না পারে। তাহলে আর আন্দোলন হবে না। কিন্তু তখন একতলা থেকে ছেলেরা লাফ নিচে নামেন এবং মেয়েদের গায়ে হাত না দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এমডির পোষা মাস্তানরা ছেলেদের মারধর করে তাদের বের করে দেয়।’

শিক্ষার্থীরা বলেন,‘এরপর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের উপাচার্যের কাছে, জেলা প্রশাসন অফিসে লিখিত অভিযোগ দেই আমরা। জেলা প্রশাসন থেকে মোবাইল কোর্ট পাঠানো হয়।তারাও হলে ঢুকে তিনি (মনিরুল) কী কী করেছেন তার প্রমাণ পেয়েছে। এর ভিত্তিতে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট হোস্টেলের তালা খুলে দিতে বলেন। সোমবার জেলা প্রশাসক আমাদের ডেকেছেন। মনিরুল ইসলাম কলেজের ২৩০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। দুই ব্যাচ পাস করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ তারা নামের আগে ডা. লিখতে পারছেন না, কোথাও চাকরি করতে পারছেন না। কারণ এই কলেজের রেজিস্ট্রেশন নেই, বিএমডিসির অনুমোদন নেই।’

শিক্ষার্থীরা জানান, ‘বিএমডিসির প্রতিনিধিরা একাধিকবার এসে সতর্ক করে গেছেন, এই কলেজের ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল না। চেয়ারটেবিল, লাইব্রেরি, জার্নাল, হাসপাতালের বেড নেই, পর্যাপ্ত রোগী নেই, স্থায়ী শিক্ষক নেই । ফাইনাল প্রুফ পরীক্ষার আগে তাদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে যেতে হয়। সেখানে ল্যাবে গিয়ে কাজ শিখেন তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা এমডিকে অসংখ্যবার এসব সরঞ্জাম কেনার অনুরোধ করেছে। কিন্তু তিনি এতে কর্ণপাত করেননি। পরে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করে। সঙ্গে উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, মেয়র বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এরপর তারা ১৪ দফা দাবি তোলেন। এরপর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি হোস্টেল খালি করার নোটিশ দেয় কর্তৃপক্ষ।’

এসব বিষয়ে এমডি মনিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বিএমডিসির অনুমোদন তো আমাদের এখতিয়ারের বিষয় নয়। কিন্তু আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ অনুমোদন না থাকলেও কেন শিক্ষার্থী ভর্তি করাচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি একটার পর একটা যুক্তির কথা বলবো, এখন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলছি।’

ছাত্রীদের হোস্টেলে কেন গিয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো একতরফা কথা, সঠিক নয়। তারা এসব বলে এখন সিমপ্যাথি পাওয়ার চেষ্টা করছে।’

এদিকে, একটি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের এভাবে মারধর করে বের করে দেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস (এফডিএসআর) এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই কলেজের শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান করা হোক। তাদেরকে অন্য মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক। ক্যাম্পাসে মাস্তান নিয়ে ঢোকার জন্য এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করার জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গ্রেফতার করা হোক।’

স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েতুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘আমি দেশের বাইরে ছিলাম, তবুও জেনেছি কিছুটা। আমরাতো ওই কলেজকে স্বীকৃতি দেইনি, মানুষকে জানিয়েছি- এটা স্ট্যার্ন্ডাড না। তাহলে কেন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছে? তবুও আমরা বিষয়টি দেখবো নিশ্চয়ই। উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে দেখবো কী করা যায়। এতগুলো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত, তাদের অন্য কোনও মেডিক্যাল কলেজে দেওয়া যায় কিনা।’

এই কলেজকে কোনও শাস্তির আওতায় আনা যায় কিনা প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ডা. এনায়েতুর রহমান বলেন,‘তারাতো আমাদের অনুমোদনই পায়নি, যাকে আমরা অনুমোদন দেইনি, সেতো আমার অধীনে না। আর আমার অধীনে না হলেতো তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে ছেলে-মেয়েদের বিষয়টা অবশ্যই দেখার চেষ্টা করবো, মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো।’

/এমআর/টিএন/

লাইভ

টপ