অস্ত্র-গুলি-মাদক সবই বেচতেন এসআই জলিল!

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:৪৬, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫২, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০




মদ-গাঁজা-ইয়াবা-হেরোইন-অস্ত্র-গুলি সবকিছুরই নাকি ব্যবসা করতেন। কর্মরত ছিলেন নারায়ণঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায়। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা অবৈধ অস্ত্র ও মাদকসহ নানা জিনিস বেশিরভাগ সময় রেখে দিতেন নিজের কাছে। অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দিতেন অপরাধীকে। সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে অর্থ আদায় করাও ছিল তার কাজ। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে গোপালগঞ্জ জেলায় বদলি হয় তার। নিজের কাছে থাকা অবৈধ মাদক, অস্ত্র-গুলিসহ নানা জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছিলেন গোপালগঞ্জে। তবে বিধিবাম, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো এসব জিনিস গাড়ি পরিবর্তনের সময় বেরিয়ে আসে। খবর পেয়ে রাজধানীর দারুসসালাম থানা পুলিশ অবৈধ এসব জিনিসপত্র জব্দ করে। গ্রেফতার করা হয় পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল জলিল মাতব্বরকে (বিপি- ৭৮৯৮০৮৪৮৩৭)। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘এসআই আব্দুল জলিল মাতব্বরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় দুই ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।’

মাসুদুর রহমান আরও বলেন, ‘ব্যক্তি পুলিশের অপরাধের দায় তার নিজের ওপরই। তার কাছ থেকে যা উদ্ধার করা হয়েছে, তা সে কোথায় পেয়েছে এবং এসব দিয়ে কী করতো জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে আসবে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে কনস্টেবল হিসেবে পুলিশে যোগদান করেন আব্দুল জলিল মাতব্বর। পদোন্নতি পেয়ে পুলিশের এসআই হন। সর্বশেষ কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি তার বদলি হয় গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশে। পরে তিনি সেখানে গিয়ে যোগদান করেন। গোপালগঞ্জ সদর থানায় পোস্টিং হলে বাসা থেকে জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ ফেরেন তিনি। গত মঙ্গলবার নিজের একটি ফাইল ক্যাবিনেট সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে গোপালগঞ্জে পাঠানোর জন্য বুকিং দেন জলিল। তবে সেসব মালামাল কল্যাণপুরের সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস কার্যালয়ে এক গাড়ি থেকে আরেক গাড়িতে ওঠানোর সময় ভেতর থেকে মদের গন্ধ পাওয়া যায়। বিষয়টি কুরিয়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ দারুসসালাম থানা পুলিশকে জানায়। পরে পুলিশ গিয়ে স্টিলের ওই ফাইল ক্যাবিনেট জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়। পরে ক্যাবিনেটের মালিক আব্দুল জলিল মাতব্বরকে খবর দেওয়া হলে তিনিও থানায় উপস্থিত হন।

পরে ক্যাবিনেটের ভেতর থেকে একটি আসল ও একটি নকল পিস্তল, পিস্তলের ১১ পিস গুলি, চায়না রাইফেলের ১০টি গুলি, রাইফেলের ৮টি গুলি, রাইফেলের গুলির ১৩ পিস খোসা, শটগানের ৪০টি কার্তুজ, শটগানের ফায়ার করা ২০টি কার্তুজের খোসা, ১০টি বিয়ার ক্যান, পলিথিনে মোড়ানো দুই প্যাকেটে ও আলাদা করে রাখা ১১০ পুরিয়া মিলে মোট ১ কেজি ৩০০ গ্রাম গাঁজা, ৩২৪ পুরিয়া হেরোইন, দুটি প্যাকেটে আলাদা করে রাখা মোট পাঁচ হাজার ২৮৯ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ইয়াবার মতো দেখতে আরও ৯৮৮ পিস ট্যাবলেট, একাধিক ব্র্যান্ডের ২৭টি মোবাইল সেট, একাধিক কাঁচি, চাকু, হাতুড়ি, প্লাস, স্ক্রু-ড্রাইভার, মাদক মামলার কেস ডকেটসহ পুলিশের পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জব্দ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত থাকা অবস্থায় বেশ বেপরোয়া ছিলেন এসআই আব্দুল জলিল মাতব্বর। সন্ত্রাসী-মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে এনে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিজের কাছে রেখে, অর্থের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দিতেন। সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রেখে দেওয়া অস্ত্র-মাদক তিনি পরবর্তীতে অন্যদের কাছে বিক্রি করতেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে কার্যালয়ে ডেকে এনে সাধারণ মানুষকে নির্যাতনেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া এসআই আব্দুল জলিল মাদক ও অস্ত্র-গুলি তার বলে স্বীকার করেছেন। কিন্তু এসব সে কীভাবে সংগ্রহ করেছে এবং গোপালগঞ্জে নিয়ে নিজের কাছে রাখতো, না কারো কাছে বিক্রি করতো সে বিষয়ে কোনও তথ্য দেয়নি। এ কারণে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্যের উৎস জানার চেষ্টা করা হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, সে আসলে অপরাধীদের কাছ থেকে জব্দ করা অবৈধ মাদক এবং অস্ত্র ও গুলি জব্দ তালিকায় না দেখিয়ে নিজের কাছে রেখে দিতো। পরে এসব সে সন্ত্রাসী-মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রি করতো। তার কাছ থেকে বিভিন্ন অস্ত্রের গুলি উদ্ধারের বিষয়টি উদ্বেগজনক। এর মানে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল। কারণ সখ্যতা ছাড়া সাধারণত কেউ অস্ত্র-গুলি ক্রয়-বিক্রয় করে না।

যোগাযোগ করা হলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জিয়াদুল কবীর বলেন, ‘আমি বিষয়টি শুনেছি। পুলিশের ওই সদস্য এক সময় গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ছিল। কিন্তু তার পোস্টিং হয়েছে গোপালগঞ্জে। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিষয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা খোঁজ-খবর করছেন।’

তিন ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব
পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেফতার হওয়া আব্দুল জলিল মাতব্বরের কাছ থেকে তিনটি ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের খুলনার ডুমুরিয়া শাখা দুটি (সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর-০০২২০১৫৫) ও (সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর- ৮৭৮৩) এবং অগ্রণী ব্যাংকের টাঙ্গাইল মহেড়া শাখার (সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর- ৩৪০৬৪৪৪৯)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তার ব্যাংক হিসাবগুলোও খতিয়ে দেখা হবে। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা করে সে এসব ব্যাংক হিসাবে টাকা রাখতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা, দুই দিনের রিমান্ড
পুলিশ কর্মকর্তা এসআই আব্দুল জলিল মাতব্বরের বিরুদ্ধে দারুসসালাম থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন দারুসসালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দুলাল হোসেন। ওই মামলায় বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠিয়ে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। আদালত শুনানি শেষে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এসআই আব্দুল জলিল মাতব্বরের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জের পাঠামারা এলাকায়। তার বাবার নাম জব্বার মাতব্বর।

 

/এনএল/টিটি/

লাইভ

টপ