টোলারবাগে মারা যাওয়া বৃদ্ধের ছেলের স্ট্যাটাসে পাঁচ হাসপাতাল ছুটে বেড়ানোর বর্ণনা

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ০৪:৩২, মার্চ ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৪:৫৩, মার্চ ২৩, ২০২০

টোলারবাগে করোনা সংক্রমণে মারা যাওয়া ব্যক্তির ছেলের স্ট্যাটাস স্ট্যাটাস

মিরপুরের টোলারবাগে গত ২১ মার্চ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যে ব্যক্তি মারা যান তার ছেলে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকাবস্থায় নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন। রবিবার (২২ মার্চ) রাতে দেওয়া এই পোস্টে গণমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তি নিরসনে তিনি স্পষ্ট করেছেন তাদের পরিবারের কেউ বিদেশ থেকে আসেননি। এছাড়াও তিনি জানিয়েছেন, ১৬ মার্চ তাদের চিকিৎসক তার বাবা করোনাভাইরাস আক্রান্ত এমন সন্দেহ করলেও আইইডিসিআর তখন তাকে পরীক্ষা করাতে রাজি হয়নি। এছাড়াও তার বাবার আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হওয়ার পরেও কোনও হাসপাতালে সে সুবিধা না পাওয়ায় তাদের কমপক্ষে পাঁচটি হাসপাতালে ছুটে বেড়াতে হয়েছে। এসব হাসপাতাল কল্যাণপুর, শ্যামলী ও মিরপুর এলাকায় অবস্থিত।

যমুনা ব্যাংকের এই কর্মকর্তার স্ট্যাটাস অনুযায়ী, নিজেদের অজান্তেই একাধিক হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী নিয়ে ছোটাছুটি করেছেন তারা। ওই পোস্ট অনুযায়ী, তার অসুস্থ বাবাকে নিয়ে অন্তত পাঁচটি হাসপাতালে গিয়েছেন তারা। তার আরেক ভাই ও পরিবার সদস্যদের প্রায় সবাই এবং একজন গাড়িচালক এই রোগীর চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন।

স্ট্যাটাসে স্পষ্ট না করলেও তার লেখা তথ্য অনুযায়ী, তার বাবা নিয়মিত মসজিদে যেতেন।

এদিকে, ২১ মার্চ তার বাবার মৃত্যুর পরদিন ২২ মার্চ সেই মসজিদ কমিটির সেক্রেটারিও হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে মারা যান। মোজাম্মেল হক নামের ওই ব্যক্তিও এই ব্যাংক কর্মকর্তার বাবার সংস্পর্শে থাকায় তাদের মধ্যে কার দ্বারা কে আক্রান্ত হয়েছেন নাকি ভিন্ন কারও দ্বারা তারা আক্রান্ত হয়েছেন তা এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। আইইডিসিআর এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশে সময় চেয়েছে। অবশ্য মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মৃত মোজাম্মেল হকেরও কোভিড-১৯ পরীক্ষা করে আইইডিসিআর। রিপোর্টে তিনিও পজিটিভ প্রমাণিত হন। এই ব্যক্তি ও ওই ব্যাংক কর্মকর্তার বাবা প্রতিবেশী। রবিবার (২২ মার্চ) আইইডিসিআর এর পক্ষ থেকে যে প্রেস ব্রিফিং করা হয় তাতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. সেব্রিনা ফ্লোরার কাছে এই ঘটনায় করোনাভাইরাসের কমিউনিটি টান্সমিশন হচ্ছে কিনা সাংবাদিকরা তা জানতে চাইলে তিনি আরেকটু সময় নেন। বলেন আরও কিছু পরীক্ষা ও নমুনা বিশ্লেষণের পর তারা এ বিষয়ে বলতে পারবেন। তবে ওই প্রেস ব্রিফিংয়ে টোলারবাগে মৃত ব্যক্তির (স্ট্যাটাস দেওয়া ব্যাংক কর্মকর্তার বাবা) নাম উল্লেখ না করলেও তার সংস্পর্শে আসা আরও দুই ব্যক্তির কথা জানান ডা. সেব্রিনা ফ্লোরা। ফলে মৃত মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মোজাম্মেল হক ছাড়াও সেখানে আরও এক ব্যক্তি সন্দেহভাজন হিসেবে আছেন যার নমুনা পরীক্ষা এরইমধ্যে পরীক্ষা করেছে আইইডিসিআর।

এদিকে, এই ব্যাংক কর্মকর্তা যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন তাতে তার ভাই ও গাড়িচালক কোভিড টেস্টে নেগেটিভ প্রমাণিত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা ভালো আছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, তার পিতাকে চিকিৎসা ৫টি হাসপাতালের অন্যতম ডেল্টা হাসপাতালের যে ৪ জন চিকিৎসক, ১৪ জন নার্স ও ৩ জন স্টাফকে হোম কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে এরইমধ্যে জরুরি বিভাগে থাকা এক চিকিৎসক কোভিড পজিটিভ প্রমাণিত হয়েছেন। তাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে, কল্যাণপুর, শ্যামলী ও মিরপুরের অন্য যে ৪টি হাসপাতালে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ওই রোগীকে নিউমোনিয়ার রোগী হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে সেসব জায়গায় কী কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা আদৌ নেওয়া হয়েছে কিনা তার তথ্য এখনও জানা সম্ভব হয়নি।  চিকিৎসকরা বলছেন, এ বিষয়ে আইইডিসিআরের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির ছেলের লেখা আবেগঘন এই স্ট্যাটাসটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, বিদেশে না গিয়েও অদৃশ্য উৎস থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুই ব্যক্তি। আইইডিসিআর সময়মতো তাদের ডাকে সাড়া না দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে সেটা সঠিক হলে অসুস্থ ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার সদস্যদের অজান্তেই বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও সাধারণ ব্যক্তি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার সমূহ প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।

নিচে ওই ব্যাংক কর্মকর্তার স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো:

 ‘পিতার মৃত্যু এবং সন্তানের ব্যর্থতা

আমি কখনো ভাবিনি যে আমার পিতার মৃত্যুর ঘটনা আমাকে এই ভাবে লিখতে হবে। কিন্তু কিছু মিডিয়ার মিথ্যা রিপোর্ট দেখে আমি বাধ্য হলাম ফেসবুকে কিছু সত্য প্রকাশ করতে।

 গত ১৬ তারিখে আব্বা অসুস্থ বোধ করলে আমাদের ড্রাইভার ওই দিন বিকেলে তাঁকে কল্যাণপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসে। ওই সময় আমরা ভাইয়েরা সবাই অফিসে। আমি অফিস থেকে বাসায় এসে শুনলাম ডাক্তার ধারণা করছে উনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং কোভিড–১৯ টেস্ট এর জন্য প্রস্তাব করেছে। অতঃপর ওই রাত্রেই আমরা টেস্ট এর জন্য IEDCR (আইইডিসিআর) এর হান্টিং নম্বরে ফোন দেওয়া শুরু করি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তাদের সঙ্গে আমরা কমিউনিকেশন করতে সমর্থ হই, তারা আমাদের জানায় যেহেতু অসুস্থ ব্যক্তি বিদেশ ফেরত না এবং বিদেশফেরত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে উনি আসেন নাই, সেহেতু এই টেস্ট ওনার জন্য প্রযোজ্য নয়, আমি তাদের বলেছিলাম উনি মসজিদে যান এবং ওখান থেকে এই ভাইরাস আসতে পারে কি না। তারা আমাদের বলেছেন যে এই ভাইরাস বাংলাদেশে কমিউনিটিতে মাস লেভেলে এখনো সংক্রমিত হয়নি সুতরাং আপনারা চিন্তা করেন না, এটা সাধারণ শ্বাস কষ্টের প্রবলেম।

ওই রাত্রেই আনুমানিক সাড়ে ১০টায় আমি তাঁকে শ্যামলীর একটি বড় হাসপাতালে নিয়ে যাই এবং আমাদের পরিচিত একজন স্পেশালিস্ট ডক্টরকে দেখাই। উনি আমাকে বলেন, রোগীর নিউমোনিয়া হয়েছে। তাঁকে নিউমোনিয়ার ট্রিটমেন্ট দিতে হবে। তবে বাংলাদেশের কোনো হসপিটাল এই রোগীর ভর্তি নেবে না, আপনারা বাসায় ট্রিটমেন্ট করেন। আমি ওই রাতে বাসায় চলে আসি এবং আব্বাকে নেবুলাইজার দেওয়া এবং মুখে খাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক দিতে থাকি। পরের দিন ১৭ তারিখে দুপুরে আমি আব্বাকে নিয়ে যাই শ্যামলীর ওই হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে। তারা রোগী দেখে বলে যে রোগীর অবস্থা ভালো না, তাঁকে আইসিইউ সাপোর্ট দিতে হবে। এবং তাদের আইসিইউ তারা দিতে পারবে না। এরপর আমি অন্য একটি হাসপাতালে কথা বলি। ওরা বলে ওদের আইসিইউ খালি আছে। আমরা দ্রুত আব্বাকে নিয়ে কেয়ার হাসপাতালে যাই এবং আইসিইউতে ভর্তি করি। ১৫ মিনিট পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের বললেন এই রোগী তারা রাখতে পারবে না।

অতঃপর আমরা রোগী নিয়ে কল্যাণপুর একটি হসপিটালে যাই। তারা আমাকে কেবিন দিয়ে সাহায্য করে কিন্তু তাদের আইসিইউ খালি নেই। রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টায় হাসপাতালের ডাক্তার আমাকে বলেন, এই রোগীর আইসিইউ লাগবে, আপনারা দ্রুত আইসিইউর ব্যবস্থা করেন। আমি বিভিন্ন হাসপাতালে কথা বলতে থাকি, কোথাও আইসিইউ খালি নেই। অতঃপর মিরপুরের ওই হাসপাতাল তাদের আইসিইউ দিতে রাজি হয়। আমি এবং আমার ছোট ভাই রাত্রে ৪টার সময় আব্বাকে নিয়ে সেখানে আসি এবং দুপুর ১২টার পর থেকে আব্বা লাইফ সাপোর্টে চলে যান। ১৮ তারিখ দুপুর থেকে আমরা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ IEDCR–এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি কিন্তু ব্যর্থ হই। অতঃপর ১৯ তারিখ বিকেলে IEDCR রাজি হয় এবং রাত্রে টেস্ট করে এবং পরের দিন ২০ তারিখ দুপুরে IEDCR আমাদের জানায় যে রিপোর্ট পজিটিভ। আমাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলে ১৫ দিন।

রিপোর্ট পজিটিভ আসার পর থেকে ওই হাসপাতাল আমাদের প্রেশার দিতে থাকে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়ার অনুমোদন দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা অনুমতি না দিয়ে তাদের বলতে থাকি ট্রিটমেন্ট দিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তারা আর রোগীর কাছেও যায়নি এবং আমাদের আইসিইউর ভেতর ঢুকতেও দেয়নি। যাহোক আমার আব্বু অবশেষে ২১ তারিখ ভোর তিনটার সময় ইন্তেকাল করেন।

আমরা সন্তানরা ব্যর্থ, পিতার সঠিক ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করতে এবং এমনকি তাঁর জানাজাতে আমরা উপস্থিত থাকতে পারিনি। সন্তান হিসেবে, একজন পুত্র হিসেবে এর চেয়ে কঠিন কষ্ট আর কিছুই হতে পারে না। আমার বুকে পাথর বেঁধে বাসায় অবস্থান করছি সরকারের আইন মেনে ১৫ দিন। কিন্তু কিছু পেজ এবং ফ্রন্ট লাইনের মিডিয়া আমাদের নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে যে আমার ভগ্নিপতি বিদেশ থেকে আমাদের বাসায় এসেছে, যেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমার দুই ভগ্নিপতি, বড় বোন এবং তার স্বামী চিটাগংয়ের দুটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। অন্য ভগ্নিপতি জাপানে থাকে। সে গত এক বছরের মধ্যে আসেনি, আমার বাবা যেদিন আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে চলে যায়, সেদিন মানে ১৯ তারিখে আমার বড় বোন এবং বড় দুলাভাই চিটাগং থেকে আমাদের বাসায় আসে এবং তারাও হোম কোয়ারেন্টিন পালন করছে। 

আমাদের এই বিপদের সময় দয়া করে আমার পরিবার সম্পর্কে মিথ্যা রিপোর্ট করবেন না। এখন পর্যন্ত আমাদের পরিবারের বাকি সদস্যরা সুস্থ আছে। কারও মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখা দেয়নি, আমার ছোট ভাই এবং আমার ড্রাইভারের কোভিড–১৯ টেস্ট করা হয়েছে, যেটা নেগেটিভ এসেছে। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন যেন আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন, বাংলাদেশের সবাইকে যেন আল্লাহ হেফাজত করেন।

আমিন। 

 

আরও পড়ুন:

আমরা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলার জন্য আরেকটু সময় নিচ্ছি: আইইডিসিআর

টোলারবাগে করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তির প্রতিবেশীর মৃত্যু

টোলারবাগের বৃদ্ধকে চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকও করোনায় আক্রান্ত

 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ