মেয়াদ শেষেও বহাল ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ম্যানেজিং কমিটি

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১০:০০, মার্চ ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩০, মার্চ ২৩, ২০২০

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়

অর্থ তছরুপের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি বহাল রয়েছে। এর মধ্যে এক বছর আগে এর মেয়াদও শেষ হয়েছে। তবু কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। এ অবস্থায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শরণাপন্ন হয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

জেলা প্রশাসন ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদন বলা হয়েছে, অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ সাদী এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কুতুব উদ্দিন ভূইয়া প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন ব্যাংক হিসাব খুলে অর্থ আত্মসাৎ ও তছরুপের ঘটনা ঘটিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির একটি ভবন নির্মাণ করছেন দুই কোটি টাকা ব্যয়ে। অথচ এই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি কোনও নিয়ম মানা হয়নি। এই অর্থও লেনদেন করা হয়েছে নতুন ব্যাংক হিসাবে। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে তদন্তে।

অথচ এবিষয়ে মাউশিতে অভিযোগ করা হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এক বছরের বেশি সময় ফাইল আটকে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অবশেষে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক এবং ম্যনেজিং কমিটির বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেছেন তারা।

ফাইল আটকে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির সহকারী পরিচালক কাওসার আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফাইল আটকে নেই, মাউশিতে কোনও ফাইল আটকে থাকে না। তবে যেসব তথ্য আমরা চেয়েছি, প্রধান শিক্ষক যদি সেই তথ্য না দেন, তাহলে আমরা এগোতে পারি না। বিষয়টি তথ্য চাওয়ার মধ্যেই রয়েছে।’

দুদকে অভিযোগ দায়েরকারীদের একজন মুক্তিযোদ্ধা মো. সাহের উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বিদ্যালয়টি নানা অনিয়ম দুর্নীতি করেছেন। জেলা প্রশাসনের তদন্তে তা প্রমাণ হওয়ার পরও মাউশি থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা দুদকে অভিযোগ করেছি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ব্যাংক হিসাব নির্ধারিত থাকলেও দুটি বাংক হিসাব পরিচালনা করছেন প্রধান শিক্ষক এবং সভাপতি। অর্থ আত্মসাতের জন্যই অতিরিক্ত ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

মুক্তিযোদ্ধা মো. সাহের উদ্দিন বলেন, ‘একটি মার্কেট ভবন নির্মাণ করেছে প্রতিষ্ঠান, এতে কোনও ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করা হয়নি। মার্কেটের দোকান বরাদ্দের জন্য ৩০ জনের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা করে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে না রেখে অন্য আরেকটির মাধ্যমে অর্থ খরচ করছেন প্রধান শিক্ষক ও কমিটির সভাপতি। এই খরচের কোনও ক্যাশবই নেই। গাছ বিক্রির টাকা ব্যাংকের কোনও হিসাবে জমা দেননি। এসব অভিযোগ ছাড়াও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।’

সূত্র জানায়, এসব অভিযোগ তদন্তে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস এবং জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেয়। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সহিদ খালিদ জামিল খান তদন্ত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা তুলে ধরে এর সুপারিশে বলা হয়, অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে বিভিন্ন অনিয়ম, সরকারি বিধি-বিধান মানার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা এবং আর্থিক বিশৃঙ্খলার জন্য বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠনসহ সব অনিয়মের দায় নিরূপণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের মাধ্যমে অডিটের সুপারিশ করা হলো।

একই অভিযোগে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সরাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে ইসরাত তদন্ত করেন। তদন্তের পর জেলা প্রশাসকের কাছে ২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতদন্তেও অভিযোগের সত্যতা মেলে।

জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খাঁন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এই তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাউশির মাহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদনসহ চিঠি দেন। গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিদ্যালয়ের নানাঅনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সত্য বলে প্রতীয়মান হয়।

জেলা প্রশাসন ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদন মাউশিতে দাখিলের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া যুগ্ম জেলা জজ আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কুতুব উদ্দিন ভূইয়া। তবে মামলার মেরিট না থাকায় আদালত শুনানি করেননি।

এদিকে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড বিদ্যালয়টির ম্যানিজিং কমিটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে কমিটি ভেঙে দেয়। ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত কমিটির মেয়াদ ছিল। এর ১০ দিন আগে ওই বছরের ১০ জানুয়ারি শিক্ষা বোর্ড ম্যানেজিং কমিটি ভেঙেদেওয়া হলেও বেশ কিছুদিন জোর করে কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা করেন সভাপতি।

ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি সময় ম্যানেজিং কমিটির ভেঙে দেওয়ার আদেশ চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালত রিট দায়ের করেন সভাপতি। এই রিট আবেদনের কোনও শুনানি না হওয়ায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড গত ১৭ জুলাই প্রধান শিক্ষককে রিট মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশ দেয়।

বোর্ডের ওই চিঠিতে বলা হয়, ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এই রিটের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তবে ওই কমিটির বাতিলাদেশের বিরুদ্ধে যেহেতু হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশ বলবৎ আছে, সেহেতু মেয়াদোত্তীর্ণের বিষয়টি আদালতকে অবহিত করে রিট পিটিশনটি নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হলো।তবেএই আদেশের আট মাস পার হয়ে গেলেও প্রধান শিক্ষক কমিটিমেয়াদোত্তীর্ণের বিষয়টি আদালতকে অবহিত করেননি।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক শেখ সাদী বলেন, ‘আমি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার আগে থেকেই দুটি হিসাব চালু আছে। বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজে এই হিসাব পরিচালিত হতো। তবে তদন্তের পর আমি হিসাবটি পরিচালনা করছি না। ওই হিসাবের টাকা মূল হিসাবে নিয়ে আসা হয়েছে।’

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণের পর শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী রিট নিষ্পত্তির চেষ্টা করেছি। কিন্তু সভাপতির অসহযোগিতার কারণে পারছি না। তকে বিদ্যালয় পরিচালনায় এখন আর কমিটিকে ভূমিকা রাখতে দিই না।’

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি কুতুব উদ্দিন ভূইয়া বলেন, ‘আমি এখন ব্যস্ত আছি, পরে নিরিবিলি সময় কথা বলেন।’

 

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ