সংবাদ বিশ্লেষণকরোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শেখ হাসিনার ভাষণ

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ২০:২৮, মার্চ ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪০, মার্চ ২৫, ২০২০

ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছবি: ফোকাস বাংলা

সরকার প্রধান হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে সব সময়ই ভাষণ দেন। কিন্তু এবার তাঁর ভাষণের প্রতি মানুষের আকর্ষণ ছিল অনেক বেশি। কারণ, তিনি যখন এ ভাষণ দিচ্ছেন, তখন সারাদেশ মূলত লকডাউন। স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের থেকে সবার দৃষ্টি ছিল এবার করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াইয়ে সরকারের উদ্যোগ ও সে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী কী বলেন সেদিকে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণের বেশি অংশ জুড়ে সে কথাই বলেছেন। দেশের সরকার প্রধান ও একজন সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে বা গার্জিয়ান হিসেবে তিনি প্রথমেই বলেছেন— এ সময়ে পরিবারের প্রত্যেকের দায়িত্ব কী? করোনা বেশি ভয়াবহ বয়স্ক মানুষের জন্যে। আর সেটা উল্লেখ করে তিনি তাঁর ভাষণে বলেছেন, “সেজন্য আপনার পরিবারের সবচেয়ে সংবেদনশীল মানুষটির প্রতি বেশি নজর দিন। তাঁকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করুন। তাঁকে ভাইরাসমুক্ত রাখার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করুন।” পাশাপাশি এ সময়ে সব থেকে দরকার মনোবল রাখা। আতঙ্কিত হয়ে যাতে দেশের মানুষ মনোবল হারিয়ে না ফেলে সেজন্য তিনি তাঁর ভাষণে জোর দিয়ে বলেছেন, “আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্ক মানুষের যৌক্তিক চিন্তাভাবনার বিলোপ ঘটায়। সব সময় খেয়াল রাখুন— আপনি, আপনার পরিবারের সদস্যরা এবং আপনার প্রতিবেশিরা যেন সংক্রমিত না হন।” বাস্তবে আতঙ্ক মানুষকে খেয়ে ফেলে। এটা অনেকটা মরার আগে মরার মতো। এই মৃত্যু যেন জাতির না আসে। বরং এ সময়ে প্রয়োজন, মন স্থির রেখে সচেতন হওয়া, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে সেটাই বলেছেন— “আপনার সচেতনতা আপনাকে, আপনার পরিবারকে এবং সর্বোপরি দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখবে।” দেশবাসী আশা করি, তাঁর কথা শুনবেন এবং আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হবেন। আর  একথা শুধু তিনি নন, আজ  সব দেশের সরকার প্রধান মূলত এধরনের কথাই বলছেন। শেখ হাসিনা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের উপযোগী করেই অনেক সহজ ভাষায় সেটা বলেছেন। মোকাবিলায় সাহস হারাননি সরকার প্রধান, বরং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সাহস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,   “যুগে যুগে জাতীয় জীবনে নানা সংকটময় মুহূর্ত আসে। জনগণের সম্মিলিত শক্তির বলেই সেসব দুর্যোগ থেকে মানুষ পরিত্রাণ পেয়েছে। ইতোপূর্বে প্লেগ, গুটি বসন্ত, কলেরার মতো মহামারী মানুষ প্রতিরোধ করেছে। তবে ওইসব মহামারীর সময় বিশ্ব এখনকার মতো ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিল না। এত বিপুল সংখ্যক মানুষ তখন একদেশ থেকে অন্য দেশে বা একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করতো না। এ কারণে করোনাভাইরাস দ্রুততম সময়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিরও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই বিশ্ববাসী এ দুর্যোগ থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পাবে।” বাস্তবে প্লেগ, গুটি বসন্ত বা কলেরার থেকে করোনা অনেক বেশি ছোঁয়াচে ও ভয়াবহ। তার পরেও প্রধানমন্ত্রীর এই আশার বাণীও ভুল নয়, প্লেগ, গুটি বসন্ত বা কলেরার সময়ের থেকে এখন পৃথিবী বিজ্ঞানে অনেক বেশি উন্নত। এবং এটাও ঠিক আগের ওই মহামারীগুলোর প্রতিষেধক ও চিকিৎসা আবিষ্কারে যত দেরী হয়েছিল, তার থেকে অনেক আগেই করোনার চিকিৎসা ও প্রতিষেধক আবিষ্কার হবে। এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, প্রধানমন্ত্রী শতভাগ আস্থা করেছেন বিজ্ঞানের প্রতি। জাতি হিসেবে এই করোনার ভেতর দিয়ে আমাদের সামনে এই বাস্তবতা এসেছে, আর যাই হোক, আমাদের শতভাগ বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে।

অন্যদিকে শুধু আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের নয়, সব দেশের কিছু ব্যবসায়ীকে দেখা যায়, জাতীয় দুর্যোগে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বেশি মুনাফা করার চেষ্টা করে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে সেটা না করার জন্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তিনি বলেছেন, “এ সংকটময় সময়ে আমাদের সহনশীল এবং সংবেদনশীল হতে হবে। কেউ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। বাজারে কোনও পণ্যের ঘাটতি নেই।” প্রধানমন্ত্রী যেমন এটি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তেমনি এ সময়ে প্রয়োজন রয়েছে— এ বিষয়ে প্রশাসনের তীক্ষ্ম নজর রাখার। দেশবাসী আশা করে, প্রধানমন্ত্রীর এ ভাষণের পর প্রশাসন সত্যি অর্থে এ দিকে খেয়াল রাখবে। পাশাপাশি নাগরিকরাও  বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন না। যে কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমাদের এখন কৃচ্ছ্রতা সাধানের সময়। যতটুকু না হলে নয়, তার অতিরিক্ত কোনও ভোগ্যপণ্য কিনবেন না। মজুত করবেন না। সীমিত আয়ের মানুষকে কেনার সুযোগ দিন।” এছাড়া, এ সময়ে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে দেশের নিম্ন আয়ের ও নিম্ন রোজগারের মানুষদের কথা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্যে সরকারের পদক্ষেপ জানিয়েছেন, “করোনাভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদেরকে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিম্ন আয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’ কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” বাস্তবে সোশ্যাল ফোরাম বা সবকিছু লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে— মানুষ বেশি উদ্বিগ্ন এই লকডাউনের ফলে যারা কাজ হারিয়েছেন তাদের নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ থেকে জানা গেলো, তাদের ছয় মাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এটা গ্রামের জন্যে। শহরের বস্তিতেও হাজার হাজার মানুষ আছে। তাদের বিষয়টিও ভাবতে হবে।

অন্যদিকে এমন দুর্যোগে সমাজের বিত্তবানদের দায়িত্ব থাকে, সমাজের নিম্ন বিত্তদের সহায়তা করার। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সোশ্যাল ফোরামে দেখা যাচ্ছে, দেশের তরুণসমাজ নানান শিল্পপতির নাম উল্লেখ করে বলছেন, দেশের এই দুর্যোগে তারা কোথায়? তরুণদের মনের এই দাবি উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে, তিনি বলেছেন, “আমি নিম্ন-আয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।” এরপরে এখন শুধু বলা যায়, বিত্তবানদের সব বিত্ত কিন্তু গড়ে ওঠে দরিদ্রের পরিশ্রমে। তাই তাদের এখন সময় দেশের দরিদ্র জনগণের প্রতি দায় পালনের।

আমাদের রফতানিমুখী শিল্পগুলো বিশেষ করে তাদের শ্রমিকরা এ সময়ে যাতে কাজ না হারান, সেজন্য প্রধানমন্ত্রী এই রফতানিমুখী শিল্পগুলোর জন্যে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁর ভাষণে, “রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছি। এ তহবিলের অর্থ দ্বারা কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে।” প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান হিসেবে শ্রমিকদের প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে মালিক পক্ষ যেন এখানেই তাদের দায়িত্ব শেষ না করেন। কারণ, আমরা জানি না করোনা পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতির চিত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তবে এটা বলা যায়, যে ক্ষত হবে সেটা শুকাতে অনেক দেরি হবে। এই সময়ে যেন মালিকরাও শ্রমিকদের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন। তারাও যেন, আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেন শ্রমিকদের জন্যে। কারণ, তাদের পুঁজি,তাদের মেধা অনেক বড় বিষয়। কিন্তু এটাও সত্য শ্রমিকের ঘামও আজ  তাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে।

সর্বোপরি, এই মুহূর্তে সবার দরকার যার যার ঘরে থাকা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণ শেষ করেছেন, “আবারও বলছি: স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সকলে যাঁর যাঁর ঘরে থাকুন।” বাস্তবে এখন সময় ঘরে থাকার। আমরা যেন কেউ এ ভুল না করি।’

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ