পিপিই স্ট্যান্ডার্ড না হলেই বিপদ

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৫:৫৮, মার্চ ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৩, মার্চ ২৮, ২০২০

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ এর রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের পরিধান করতে হবে বিশেষ পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট। তবে এটি হতে হবে রাসায়নিক দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধযোগ্য (কেমিক্যাল হ্যাজার্ড প্রিভেন্টেবল)। এছাড়া এই পোশাক হতে হবে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের উপযোগী। এই পোশাক হবে কম্বো পিপিই-কাভারঅল, হেডমাস্ক, গগলস, বুট এবং সুকাভারসহ। এগুলো হবে ডিসপোজেবল, একবার পরার পর ফেলে দিতে হবে। যদিও চিকিৎসক, রোগীর কক্ষে থাকা স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ প্রতিটি স্তরের পেশাজীবীদের জন্য পৃথক পৃথক পিপিই-র কথা বলা হয়েছে।  

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, বিশ্বখ্যাত এক প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক পিপিই রিজেক্ট করা হয়েছে কেবলমাত্র স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন না হওয়ার কারণে।

অথচ দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে একাধিক ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন পিপিই তৈরি করছে। কেউ করছে বাণিজ্যিক কারণে, কেউবা আবার স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করার জন্য। কিন্তু, ‍বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড, আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড এবং সাম্প্রতিক সময়ে চীনেও একটি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, এ তিন স্ট্যান্ডার্ডের ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ হলেই কেবলমাত্র একটি পারফেক্ট পিপিই তৈরি করা সম্ভব। এটাতো ভাইরাস, এ কারণে এ মুহূর্তে এর পিপিই কেন সবকিছুর চেয়ে আলাদা সেটা বুঝতে হবে। এই পিপিই ওয়াটার প্রুফ হতে হবে, ভাইরাস প্রটেক্ট করবে একইসঙ্গে নিঃশ্বাস নিতে পারার সুযোগ থাকতে হবে।

তারা বলছেন, দেশে পিপিই নিয়ে ব্যবসা শুরু হওয়া জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পিপিই পরা মানে কোভিড-১৯ কে ছড়িয়ে দেওয়া।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতোমধ্যে এ বিষয়ে যে লজিস্টিক সাপোর্ট বিষয়ক কমিটি করেছে, তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে স্ট্যান্ডার্ড পিপিইর জন্য নির্দেশনা চেয়েছে এবং সে নির্দেশনা না মানতে পারলে অধিদফতর সে বিষয়ে কাউকে অনুমোদন দেবে না বলেও জানিয়েছে কমিটি।

কমিটির একাধিক সদস্য বলছেন, বিভিন্ন জন পিপিই-র অনুমোদন চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরে যোগাযোগ করছে, কিন্তু যথাযথ স্ট্যান্ডার্ড না মানা হলে আমরা অনুমোদন দিতে পারি না। কমিটির একাধিক সদস্য ক্ষুব্ধ হয়ে বলছেন, এখন বাংলাদেশে অনেকেই শার্টের কাপড়, ছাতার কাপড় দিয়ে পিপিই বানিয়ে বিতরণ করছে, অথচ এটা যে পিপিই না থাকার চেয়েও কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সে বিষয়ে কেউ নজর দিচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত পোশাক নীতিমালাতে বলা হয়েছে, পিপিই হচ্ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য বিশেষ পোশাক। এর ভেতরে রয়েছে মেডিক্যাল মাস্ক, গাউন, গগলস, ফেস শিল্ড, হেভি ডিউটি গ্লাভস ও বুট।

পিপিই ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে পিপিই সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পেশাজীবীর কাছে। সে গ্রুপেরই একজন সদস্য কাজী মনির হোসেন। মনির হোসেন জানান, তারা কেবলমাত্র ওপরের স্যুটটা দিচ্ছেন, যেটি তৈরি হচ্ছে তার নিজের কারখানাতে।

তাদের পিপিই স্ট্যান্ডার্ডমানের কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের তৈরি করা পিপিই যথেষ্ট স্ট্যান্ডার্ড, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রসিডিউর মেইনটেইন করেছি, যদিও আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে অনুমোদন আনতে যাইনি।

কেন অনুমোদন নিতে যাননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারণ আমাদের খুব কম সংখ্যক বানানোর পরিকল্পনা ছিল।

তবে ‘আইইডিসিআর এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিজেদেরও এটা নিয়ে কোনও ধারণা নেই’, দাবি করেন মনির হোসেন। প্রশ্নের মুখে পরে তিনি বলেন, তারা যোগাযোগ করেছেন।  তবে কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন জানতে চাইলে তিনি কারও নাম বলেননি।

চিকিৎসকদের জন্য নয়, তাদের পিপিই সরবরাহ করা হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সচালক এবং হাসপাতালের স্টাফদের জন্য, এমন কথাও বলেন তিনি।

কিন্তু একজন চিকিৎসকের যেমন সঠিক পিপিই দরকার, ঠিক তেমনি একজন অ্যাম্বুলেন্সচালক বা হাসপাতালের স্টাফদেরও সঠিক পিপিই প্রয়োজন। কারণ, একজন আক্রান্ত রোগীর মাধ্যমে তারাও আক্রান্ত হতে পারেন। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো সবকিছু দিতে পারবো না, এটা কাইন্ড অব সান্ত্বনা’।

এমন গুরুতর ক্ষেত্রে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো পোশাক বিতরণ ঠিক হচ্ছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি পিপিইর সঙ্গে প্রিন্টআউট করে দিয়ে দিচ্ছি যে, পিপিই কী করে ব্যবহার করা যাবে।

কিন্তু, গ্রামের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন অ্যাম্বুলেন্সচালক অথবা কোনও হাসপাতালের ক্লিনার এতটা সচেতন কিনা এবং তাকে এ ধরনের পিপিই দেওয়া ঠিক হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘কেন দেবো না? আমরা ধরেই নিয়েছি আমাদের পিপিই যারা পরবেন তারা সচেতন।’

সবাই সচেতন নয় এবং আপনাদের সরবরাহ করা পিপিই পরলে সুরক্ষার বদলে বিপদ বাড়াতে পারে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিপদ বাড়াবে নাকি বাড়াবে না—এটা আসলে কনফিউজিং।’  

স্বাস্থ্য অধিদফতরের লজিস্টিক সাপোর্ট বিষয়ক কমিটি ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে স্ট্যান্ডার্ড পিপিইর জন্য নির্দেশনা চেয়েছে এবং সে নির্দেশনা না মানতে পারলে অধিদফতর সে বিষয়ে কাউকে অনুমোদন দেবে না বলেও জানিয়েছে কমিটি।

কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন এটা একটি ব্যবসা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমাদের অনুমোদন নিতে হবে সবটুকু স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে।

এই কমিটির আরেক সদস্য ডা. শামীম রিজওয়ান বাংলা ট্রিবিউকে বলেন, এই পিপিইর স্পেসিফিকেশনের তোয়াক্কা না করে, গুণগত মান নিশ্চিত না করে পিপিই বানানোর হিড়িক পড়েছে দেশে। অথচ এখন রেইনকোটকেও পিপিই বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জেনেরিকভাবে কোনও পোশাককে পিপিই বলে ছেড়ে দেওয়া যাবে না মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, আর যখন এর নাম হবে পিপিই, তখন সবাই কনফিডেন্ট হয়ে যাবে, মানুষ সে পিপিই পরে যখন কোনও কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর কাছে যাবে, তখন সে নিজে আক্রান্ত হবে এবং অন্যকে আক্রান্ত করবে, এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আমাদের জন্য আর কিছু হতে পারে না, বলেন ডা. শামীম রিজওয়ান।

কোভিড-১৯ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রায় ১৫টি বিভাগের সমন্বয়ে গঠন করেছে সমন্বিত কন্ট্রোল রুম। গত  ২৬ মার্চ মহাখালীতে অবস্থিত স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন ভবনের নিচতলায় কন্ট্রোল রুমে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পিপিই-র স্তূপ হয়ে জমে আছে। অথচ সেগুলো কোনোটাই মানসম্পন্ন এবং নির্ধারিত গুণগত মানের নয়।

জানতে চাইলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের বিত্তবান থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জাতীয় দুর্যোগকে ইস্যু করে পিপিই বানিয়ে ব্যবসা করছে। কিন্তু, কোনও জাতীয় দুর্যোগকে ব্যবহার করে এই দুর্বৃত্তায়ন জাতি হিসেবে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

পিপিইর মতো একটি সেনসিটিভ বিষয়ের মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট বানানো কি এতই সহজ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাহলে পৃথিবীজুড়ে কেন এই পিপিই-র সংকট? সাহায্য করা মানে তো কেবল পিপিই দেওয়া নয়, আর তারা আসলে সাহায্যও করছে না। তারা ফটোসেশন, ব্যবসা, সর্বোচ্চ মহলের নজর কাড়া আর ফিউচারের ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে এসব কাজ করছে।

তার মন্তব্য, এতে করে উল্টো সমস্যা হচ্ছে। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্তদের পিপিই নিয়ে সংকট নেই এমন কথায় আমাদের গ্লোবাল যেসব পার্টনার রয়েছে তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে। তারা মনে করছে, আমাদের পিপিই প্রচুর রয়েছে, যেটা একেবারেই বিভ্রান্তিমূলক। তাই ব্যবসা এবং সহযোগিতার নামে এমন ফটোসেশন বন্ধ করতে অবিলম্বে নজর দিতে হবে বলেন ডা. ইকবাল আর্সলান।

/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ