যেভাবে খাবার পানি আসে উপকূলবাসীর

Send
সাদ্দিফ অভি, খুলনা থেকে ফিরে
প্রকাশিত : ০২:২৩, মার্চ ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৫:৫৫, মার্চ ২৯, ২০২০




উপকূলবাসীর জন্য রয়েছে সুপেয় পানির এটিএম বুথখুলনার উপকূলীয় এলাকা দাকোপের চালনা পৌরসভার বাসিন্দা স্বপ্না বিশ্বাস। ১২ বছর ধরে তার পৌর এলাকায় বসবাস। খাবার পানির জন্য বৃষ্টি ছিল তার একমাত্র ভরসা। বৃষ্টির পানি বাড়িতে জমিয়ে সেটা দিয়ে পুরো পরিবার চলতো। উপকূলীয় এই এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপ কিংবা টিউবওয়েল দিয়ে পানির দেখা মিলে না। তাই স্বপ্না বিশ্বাসের পরিবারের মতো প্রায় ৫০০ এর বেশি পরিবারের ভরসা এখন পানির এটিএম বুথ।

খুলনা জেলা সদর হতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে দাকোপ উপজেলা। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই এলাকার আয়তন প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় জলবায়ুর পরিবর্তনের একটি বিরাট প্রভাব পড়েছে এই অঞ্চলের মানুষের ওপর। ‘সিডর’ ও ‘আইলা’র পর ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ বড় রকমের আঘাত হানে এই এলাকায়। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্থানীয়দের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয় খাবার পানির অভাবে।

২০১৭ সালে দাকোপ উপজেলার চালনা পৌরসভায় বসানো হয় পানি বিশুদ্ধ করার পাতন প্রক্রিয়া বা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট। বহুজাতিক ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি’র অর্থায়নে এবং ওয়াটার এইডের কারিগরি সহায়তায় এই প্ল্যান্ট স্থাপন করে বেসরকারি সংস্থা রূপান্তর। চালনা পৌরসভার ৫০০’র বেশি পরিবার এখন এটিএম কার্ডের মাধ্যমে এই প্ল্যান্টের পানি ব্যবহার করতে পারে। এর জন্য খরচ হয় লিটার প্রতি ৫০ পয়সা।
এই প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরো দাকোপ উপজেলায় রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট আছে ৯টি। এর মধ্যে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বিনামূল্যে পানি পাচ্ছে মানুষ। আরও একটি প্ল্যান্ট দাকোপের বানীশান্তা ইউনিয়নের যৌনপল্লির জন্য করা হয়েছে। সেখানে ৩০ পয়সা লিটারে পানি পাচ্ছে স্থানীয়রা। বানীশান্তার এই প্ল্যান্ট সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ নির্ভর। অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদে আছে তিনটি। বাকিগুলো নারীদের জন্য বিশেষভাবে করা হয়েছে।

পুরো দাকোপে এটিএম মেশিনে পানির ব্যবস্থা আছে শুধু চালনা পৌরসভায়। রূপান্তর এটি তৈরি করে পৌরসভাকে হস্তান্তর করেছে। বাকি প্ল্যান্টগুলো একই প্রক্রিয়ায় তৈরি, তবে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে খাবার পানি সংগ্রহ করে এলাকার মানুষ। এই এলাকার বাসিন্দা স্বপ্না বিশ্বাস বলেন, বাড়িতে বড় একটি ট্যাংকিতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে তা সরাসরি পান করতো পুরো পরিবার। তিন বছর ধরে এই পানি খাচ্ছি। বৃষ্টির পানি সরাসরি খেলেও শারীরিক সমস্যা যেমন সর্দি কাশির মধ্যে পড়তে হতো। এই পানি খাওয়ার পর থেকে আমাদের আর তেমন কোনও সমস্যা হচ্ছে না। প্রতিদিন ১০ লিটার খাবার পানি লাগে পরিবারের। এতে মাসে খরচ হয় ১০০ টাকা। আগে পানি আনতে অনেক সময় লাগতো, এখন বাসা থেকে ৫ মিনিটের দূরত্বে এই পানির মেশিন।

স্বপ্না আরও জানান, এর আগে অন্য এলাকা থেকে পানি এনে বিক্রি করতো। কারণ এই এলাকার নলকূপ দিয়ে এখন আর পানি উঠে না। এখানে এটিএম মেশিন বসানোর পর ওই পানি আর বিক্রি হয় না। গভীর নলকূপ কয়েকটা থাকলেও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেখানে আর পানি উঠে না। যেগুলো দিয়ে উঠে সেগুলোতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন।

এই এলাকার অপর বাসিন্দা সেনলতা বাগচি বলেন, ‘যখন থেকে এটা চালু করা হইসে তখন থেইক্কা এইটাই খাই। এর আগে পানি বাইরে থেকে ট্রলারে কইরে আসতো। আমরা কিনে খাইতাম। ওই পানির ৩০ লিটারের ড্রাম খরচ পড়তো ৩০ টাকা। এখন আমরা এইটাই খাই। মাসে খরচ হয় ২০০ টাকা। অন্যকাজের পানি ব্যবহার করি পুকুরের পানি।’

উপকূলবাসীর জন্য সুপেয় পানি সরবরাহএই এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি পুকুর আছে এখানে। এক একটি পুকুরের পানি এক এক কাজে ব্যবহৃত হয়। যে পুকুরে গোসল করা হয় ওই পুকুর থেকে কেউ রান্নার পানি নেয় না। তার জন্য আছে আরেকটি পুকুর। এলাকার মাটিতে লবণ প্রবণতা বেশি হলেও স্থানীয়রা জানান, পুকুরের পানি মিষ্টি।

প্রকল্পের ম্যানেজার আশিক রুবাইয়াৎ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানকার যে মানুষগুলো আছে তারা সরাসরি পুকুরের পানি খায়। পুকুরের পানি অনেক কাজে ব্যবহার করতো তারা। তাদের নিরাপদ খাবার পানির কোনও উৎস ছিল না। রিভার্স অসমোসিস এই প্ল্যান্টে পানি আসে ভূগর্ভ এবং ভু-উপরিভাগ থেকে। ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় আমরা এখন দুই ভাগের পানিই ব্যবহার করছি। এতে আমরা ভূগর্ভের পানির ওপর খুব একটা চাপ দিচ্ছি না। দুই ভাগের পানি ব্যবহার করলে ভূগর্ভের পানি ক্ষতিগ্রস্ত কম হয়।

তিনি বলেন, ৯টি প্রকল্পের প্রযুক্তি একই, তবে খরচ ভিন্ন। এখানে এটিএম ব্যবস্থা হলেও অন্যখানে বোতলের মাপে পানির দাম নির্ধারণ করা হয়। পৌরসভা থেকে কার্ড রিচার্জের ব্যবস্থা আছে। মোবাইলে যেভাবে টাকা রিচার্জ করা হয়, একইভাবে এই কার্ড রিচার্জ করা যায়। কার্ড নম্বর বলে দিলেই কর্মকর্তারা টাকা পাঠিয়ে দেয়।

খুলনাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা রূপান্তরের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ বলেন, এই এলাকায় সুপেয় পানি নেই। খাবার পানি মানুষ বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করছে। পানির যখন অভাব হয় তখন বিভিন্নভাবে মানুষ পুকুরসহ অন্যান্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করে। এছাড়া বৃষ্টির পানি ধরে সরাসরি পান করার চেষ্টা করছে। আবার দেখা যাচ্ছে যেখানে পানি আছে সেখানে মানুষকে একঘণ্টা পথ হেঁটে যেতে হচ্ছে। যারা বিক্রি করছে অনেক দামে বিক্রি করছে। এই যে সময়, টাকা, সুপেয় পানি না পাওয়া সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়েছে যে এটার একটি নিশ্চয়তা করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, অল্প খরচে ফিল্টার করে পুকুরের পানি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করা যায়। তবে এক্ষেত্রে পুকুর সুরক্ষিত করতে হবে। সেখানে অন্য কোনও কাজ করা যাবে না কিংবা গবাদি পশু প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। নাগরিকদের পানির সেবা নিশ্চিতের অঙ্গীকার পৌরসভার আছে বলেই তারা আমাদের এই পানির বুথ করার জায়গা দিয়েছে। তার জন্যই আমরা তাদের সহায়তা করেছি। কিন্তু পরিচালনা তারাই করবে। মাঝে মধ্যে আমরা সুপারভাইজ করি, কোনও সমস্যা হলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, আমরা সহায়তা দেই।

কম খরচে পন্ড স্যান্ড ফিল্টারে (পিএসএফ) খাবার পানি
পুকুরের পানিকে একটি বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে শোধন করে খাবার পানির ব্যবস্থা করার নাম পন্ড স্যান্ড ফিল্টার। এই প্রক্রিয়ায় বড় একটি ট্যাংকের সঙ্গে টিউবওয়েলের সংযোগ করা হয়। টিউবওয়েল চাপ দিলে পুকুর থেকে একটি পাইপের মাধ্যমে পানি ট্যাংকে জমা হয়। ট্যাংকের ভেতরে পাঁচটি চেম্বার আছে। পানি চাপকলের মাধ্যমে এসে প্রথমে দুই চেম্বারে সুড়কি এবং এক চেম্বারে বালির মাধ্যমে স্টোরেজে আসছে। পানি চাপকলের মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেটা কল দিয়ে আসে না। প্রথমে ভেতরে চেম্বারে জমা হয়ে ফিল্টার হতে থাকে। চেম্বারে এভাবে জমা হওয়া পানি কল দিয়ে নিতে পারে এলাকার মানুষ।

উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সরবরাহএখানে পানি নিতে কোনও টাকা দিতে হয় না। তবে মাসে ১০ টাকা করে সমিতিতে চাঁদা দেয় গ্রামবাসী। এই টাকা দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয়। এটি তৈরিতেও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ওয়াটার এইড। এটি স্থাপনে মোট খরচ হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার টাকা। বাজুয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে আছে একটি। এখানে ৩৮৬ পরিবারের বসবাস। প্রায় ২৫০ পরিবার এখান থেকে পানি নিচ্ছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ২ বছর পর থেকে এই এলাকায় বাস করেন কমলা বিশ্বাস। এতদিন পানি আনতে তার যেতে হতো বাড়ি থেকে প্রায় কয়েক কিলোমিটার দূরে। এমনকি দাকোপ পর্যন্ত যাওয়া লাগতো। তিনি বলেন, আমরা আগে পানি নিতে ভোর বেলা রওনা হতাম। পানি আনতাম। দিনে দুইবার এভাবে যাওয়া লাগতো। দুই বছর ধরে পিএসএফের পানি পান করছি। এখন আর আগের মতো রোগ বালাই হয় না।

প্রকল্পের ম্যানেজার আশিক রুবাইয়াৎ বলেন, আমরা এই পানির মাইক্রোবায়োলজিক্যাল টেস্ট করেছি। এই পানি সম্পূর্ণ নিরাপদ। এই ফিল্টারের ক্যাপাসিটি ৭০ পরিবারের, কিন্তু এখানে খাবার পানির এতই সংকট যে ২৫০ পরিবার এখান থেকে পানি সংগ্রহ করে। এই এলাকায় খাবার পানি অনেক বড় একটা দুঃস্বপ্ন ছিল বলা চলে।

তিনি আরও বলেন, এখানে পুকুরটা উঁচু করা হয়েছে। দাকোপের সবচেয়ে জলবায়ু ইফেক্টেড এলাকা কিন্তু এটা। পুকুরের চারপাশ নেট দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে, যাতে গবাদিপশু এর ভেতর প্রবেশ করতে না পারে। এটা করার পর নিজেদের অন্যান্য কাজের জন্য এই পুকুরের পানি আর ব্যবহার করেনি।

 

/এসও/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ