‘এই হলো করোনা প্রস্তুতির নমুনা’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১১:৫৯, এপ্রিল ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫০, এপ্রিল ০৯, ২০২০

করোনা ভাইরাসসিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন গত রবিবার। বুধবার (৮ এপ্রিল) তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। কারণ, সিলেট বিভাগে ভেন্টিলেটরসহ কোনও করোনা চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। তার যেকোনও মুহূর্তে লাইফ সাপোর্ট দরকার হবে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন সিলেটের একাধিক চিকিৎসক।

তারা বলছেন, এই চিকিৎসককে ঢাকায় নেওয়ার জন্য একটা সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যায়নি। নিতে হয়েছে একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে। একটা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, একটা সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে দেওয়ার মতো সরকারি কোনও ব্যবস্থা এই শহরে ছিল না। তারা বলছেন, ‘এটাই হলো আমাদের করোনা প্রস্তুতির নমুনা’।

সিলেটের একাধিক চিকিৎসক বলছেন, করোনা রোগীর জন্য সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে দুটি আইসিইউ বেড রয়েছে, যার ভেন্টিলেটর কাজ করে, কিন্তু চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ওসমানী হাসপাতাল যেহেতু কোভিড রোগীর জন্য ডেডিকেটেড না, তাই সেখানে নানা জটিলতার কারণে নেওয়া হয়নি।

ওই চিকিৎসকের সহকর্মী এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের ইনচার্জ ডা. মঈনুল ইসলাম ডালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আক্রান্ত চিকিৎসক ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যেহেতু ওই হাসপাতালের ২০ বেডের আইসিইউ ইউনিটে ১৫ বেডে রোগী রয়েছে, একইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে অনেক রোগী, তাই তাকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। করোনা আক্রান্ত রোগী নিলে অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি দাবি করেন, শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে আইসিইউ ছিল, যদিও সেটা অরিজিনাল আইসিইউর মতো হবে না। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ওই চিকিৎসক ঢাকায় গিয়েছেন তার পরিবারের ইচ্ছাতেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক গত ৬ এপ্রিল কোভিড-১৯ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ জানান, করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য দেশে ১১২টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ( আইসিইউ) রয়েছে এবং ডায়ালাইসিস বেডের সংখ্যা ৪০টি। তিনি বলেন, আমরা আইসিইউ বেডের সংখ্যা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় করোনা আক্রান্তদের জন্য বিশেষায়িত বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ২৬টি, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটে ৮টি এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে ২২টি আইসিইউ। এছাড়া সাজিদা ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ৫টি, মিরপুর ও উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে রয়েছে ৬টি বেড। অর্থাৎ, কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ৬৭টি আইসিইউ। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে কেবল ময়মনসিংহ বিভাগে ২৬টি, খুলনার ডায়াবেটিক হাসপাতালে আছে ৫টি আইসিইউ বেড।

এদিকে, সিলেট থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের ঢাকায় আসার সংবাদে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন মাস সময় পাবার পরও “প্রস্তুত আছি” বলে আসা এই মন্তব্যের সঙ্গে মিল নেই প্রকৃত চিত্রের। নাম সংবলিত একগাদা করোনা হাসপাতাল না করে কয়েকটি সত্যিকারের করোনা হাসপাতাল করা হোক। একইসঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। গত তিন মাস ধরে কেবল শুনেই এসেছি আমরা প্রস্তুত। কিন্তু সে প্রস্তুতির কী হাল সেটা এখনই দেখা যাচ্ছে, আর ভবিষ্যতে যখন রোগীর সংখ্যা বাড়বে তখন কী অবস্থা হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।

এর আগে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, দেশের সব জায়গায় তো আইসিইউ করা সম্ভব না। যতদিন প্রয়োজন না হবে ততদিন ঢাকাতেই চিকিৎসা হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন করোনা আক্রান্ত রোগীকে আইডেন্টিফাই করা থেকে শুরু করে পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট, পুরোটাতেই ঘাটতি। একইসঙ্গে যাদের আইসিইউ লাগবে তাদের কী হবে?’

আমরা তিন মাসের মতো সময় পেয়েছি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মনোযোগ দিয়ে কাজ করা উচিত ছিল, সেটা না করে তারা কেবল প্রস্তুতির কথা জানিয়ে গেছেন।’ ঢাকার বাইরে এখনও আইসিইউ সাপোর্টসহ অন্যান্য সুবিধা হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ রোগী কী কেবল তাহলে ঢাকার ভেতর থেকে হবে, ঢাকার বাইরে করোনার আক্রমণ হবে না?’

তিনি বলেন, ‘নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করার ল্যাবরেটরির সম্প্রসারণ করা হলেও তাতে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।’ একইসঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কারণ করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী এবং সাধারণ রোগী মিশে যেন না যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে, একইসঙ্গে করোনা ভাইরাসের রোগীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক আইসিইউর ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেটা কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক হলে হবে না।’

প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল এটা এখন আর কারও অজানা নয় মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই ভ্রান্তির মধ্য দিয়ে এগিয়েছি। প্রস্তুতি নেই ধরে নিয়ে যদি খোঁজা যেত, ঘাটতি কোথায়, কোথায় কোথায় কী দরকার, তাহলে আজ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে কথা হতো না। কথায় জোর না দিয়ে যদি প্রস্তুতিতে জোর দেওয়া হতো, আজ এই অবস্থা হতো না।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘আমরা যতদূর জেনেছি সিলেটের চিকিৎসকের ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রয়োজন ছিল, সেটা সেখানে ম্যানেজ করা সম্ভব হয়নি। তিনি একজন সরকারি চিকিৎসক, তারই যদি এ অবস্থা হয় তাহলে সাধারণ মানুষের যখন আইসিইউ প্রয়োজন হবে তখন তারা কোথায় যাবে?’ আমরা প্রতিরোধ করতে তো পারিনি, এখন করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারেও আমাদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে- বলেন ডা. জাহিদুর রহমান।

/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ