চিরশয্যায় শায়িত ড. আনিসুজ্জামান

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১১:৩৪, মে ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০০, মে ১৫, ২০২০


ড. আনিসুজ্জামানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার (১৫ মে)  বেলা পৌনে ১১টায় রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বাবার কবরে দাফন করা হয় তাকে, পাশেই উনার মায়ের কবর। ড. আনিসুজ্জামানের ছেলে আনন্দ জামান বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

আনন্দ জামান জানান, ‘আজ  বেলা পৌনে ১১টায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু, আমার দুলাভাই (ড. আনিসুজ্জামানের জামাতা) আজিমুল হক, চাচা আখতারুজ্জামানসহ কয়েকজন আত্মীয় উপস্থিত ছিলেন।’
এর আগে সকাল ১০টার দিকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) থেকে ড. আনিসুজ্জামানের মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার দাফনের সব আনুষ্ঠানিকতা হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আল মারকাজুল ইসলাম। জানাজার নামাজ পড়ান মারকাজুল ইসলামের মাওলানা ফরিদ উদ্দিন। 

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে গার্ড অব অনার দেন ধানমন্ডি রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রবিউল আলম। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা বাবর আলী মীর, সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের উপ-পরিদর্শক আব্দুর রহমানসহ অন্য কয়েকজন পুলিশ সদস্য।

ড. আনিসুজ্জামানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

জানাজায় উপস্থিত সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি বলেন, ‘সর্বজন শ্রদ্ধেয় জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি আনিসুজ্জামানের প্রয়াণে দেশ ও জাতির যে ক্ষতি হলো তা অপূরণীয়, শতবর্ষেও তা পূরণ হওয়ার নয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে প্রফেসর আনিসুজ্জামান ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অনাবিল সমাজহিতৈষী, গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল চেতনা, সুশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও ব্যক্তিগত মনীষা দিয়ে তিনি নিজেকে পরিণত করেছিলেন দেশের অগ্রগণ্য পুরুষে। বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রসারে তার রয়েছে অনবদ্য ভূমিকা। দেশের ক্রান্তিলগ্নে তিনি জাতিকে সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছেন বারবার। তার অবদান জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।’

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানী ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ড. আনিসুজ্জামান। মৃত্যুর আগে ও পরে তার শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়। সে কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয় এবং এই শিক্ষাবিদকে শ্রদ্ধা জানানোর অন্য সব কর্মসূচি বাতিল করা হয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ড. আনিসুজ্জামানের জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। তিনি ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন আনিসুজ্জামান। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০১২ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির সভাপতি ছিলেন।

ড. আনিসুজ্জামান

এই ভূখণ্ডে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদবিরোধী নানা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত গণআদালতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

আনিসুজ্জামান শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় অবদানের জন্য তাকে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদক প্রদান করা হয়। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।

এছাড়া তিনি ১৯৯৩ ও ২০১৭ সালে দুইবার আনন্দবাজার পত্রিকার আনন্দ পুরস্কার, ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট ডিগ্রি এবং ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক লাভ করেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ পেয়েছেন। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

আনিসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য রচনাবলির মধ্যে ‘স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন’, ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ স্মারকগ্রন্থ’, ‘নারীর কথা’, ‘মধুদা, ফতোয়া’, ‘ওগুস্তে ওসাঁর বাংলা-ফারসি শব্দসংগ্রহ’ ও আইন-শব্দকোষ অন্যতম।

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, অলক্ত পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন।

মৃত্যুকাল স্ত্রী সিদ্দিকা জামান, দুই মেয়ে রুচিবা ও শুচিতা এবং একমাত্র ছেলে আনন্দ জামানসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

আরও পড়ুন- 

ড. আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোকের ছায়া
ড. আনিসুজ্জামানকে জাতি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবে: শোকাহত রাজনীতিকরা

/এসএমএ/এফএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ