ঢাকার দুই মেয়রের সাত দিন: অগ্রাধিকার দিচ্ছেন করোনা মোকাবিলায়

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৯:৫৯, মে ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৯, মে ২২, ২০২০

শেখ ফজলে নূর তাপস ও মো. আতিকুল ইসলামসম্প্রতি ঢাকার দুই সিটির দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন নির্বাচিত দুই মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও মো. আতিকুল ইসলাম। উত্তরে মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে আতিকুল ইসলাম এক সপ্তাহ পার করেছেন দু'দিন আগে। আর দক্ষিণে ব্যারিস্টার তাপসে শপথ নেওয়ার এক সপ্তাহ হচ্ছে আজ শুক্রবার (২২ মে)। দায়িত্ব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় বুঝে নেওয়ার বিষয়েই দুই মেয়র এখন বেশি মনোযোগী। তবে মূল কাজ বা পরিকল্পনার জায়গায় অন্য সবকিছুকে সরিয়ে দিয়ে হুট করে যে ‘করোনা মোকাবিলা’ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে সেটা দুই মেয়রের কথাতেই পরিষ্কার।
এ মুহূর্তে ঢাকাবাসীর চিকিৎসাসেবাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তারা। দক্ষিণের মেয়র তাপস বলেছেন, করোনা মোকাবিলায় সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকেই কাজ করবেন। আর করোনার সময়ও মাঠে থাকা উত্তরের মেয়র আতিক দুস্থদের খাদ্য বণ্টন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি করোনা রোগীদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে একটি মার্কেট হস্তান্তর করেছেন এরইমধ্যে। তবে নগরীর পরিচ্ছন্নতা কাজে উভয় মেয়র মনোযোগী। আপাতত গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্লিচিং পাউডার ছিটানোয়।
গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ের আগে মাঠ চষে বেড়ানোর সময় এই দুই মেয়র বা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনি ইশতেহারে করোনা শব্দটিই ছিল না । গত নভেম্বরে চীনের উহানে এই ভাইরাসের উৎপত্তির খবর বাংলাদেশের মানুষ সংবাদ মাধ্যমে শুনে থাকলেও এই ভাইরাস যে মাত্র তিন মাস পরেই বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীকে বিপর্যস্ত করে ফেলবে সেটা ছিল সবার ধারণার বাইরে ছিল। ফলে রাজধানীর ওই সময়ের নির্বাচনে ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক নানা বিবেচনার বাইরে শুনতে চাওয়ার প্রধান বিষয় ছিল কোন মেয়র প্রার্থী কী কী পরিকল্পনার কথা বলছেন, কোন কোন কর্মসূচি হাতে নেওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। অন্য প্রার্থীদের মতোই বিজয়ী উভয় প্রার্থীরই ছিল রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণেই অগ্রাধিকার। অথচ তাদের বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই অচেনা শত্রু করোনাভাইরাস বিশ্ব প্রেক্ষাপটকেই বদলে দেওয়ায় শপথ নেওয়ার পর তাদের কাছে এখন জলাবদ্ধতা নিরসন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে করোনা মোকাবিলা।
৫টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে গত ১৬ মে দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) দায়িত্বগ্রহণ করেন ব্যরিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। এসময় তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না শতবছরেও এরকম চাপ নিয়ে আর কোনও মেয়র দায়িত্বগ্রহণ করবে। যেই মহামারির মধ্যে আমরা পড়েছি তাতে সারা বিশ্ববাসী চাপের মধ্যে আছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি ৫টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এর মধ্যে প্রথম হচ্ছে করোনা মোকাবিলা।’
হোম ওয়ার্কে অভিজ্ঞ মেয়র ফজলে নূর তাপস তখন করোনাভাইরাস মোকাবিলায় রাষ্ট্রের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনার কথা জানান। নিজের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে মেয়র বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর, আইইডিসিআর ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সবার সমন্বয়ে আমাদের যে হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো আছে সব কিছুকে নিয়ে আমরা ঢাকাবাসীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে চাই। যাতে করে আমরা ঢাকাবাসীকে সুরক্ষা দিতে পারি।
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দিয়ে ঢাকাবাসীকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা জানিয়ে ফজলে নূর তাপস বলেন,‘অনেকগুলো দেশ, তারা কিন্তু সফলতা অর্জন করতে পারেনি। আবার অনেক ছোট দেশও কিন্তু সফলতা অর্জন করতে পেরেছে। এরমধ্যে ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও হংকং করোনা মোকাবিলায় অনেক ভালো করেছে। আমরা তাদের কার্যক্রমগুলোকে গ্রহণ করতে চাই। কন্ট্রাক ট্রেসিং, টেস্টিং, সার্ভিলেন্স ও এনটেইনমেন্ট, এই চারটি ধাপে আমরা কাজটি করতে চাই।’
করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার আশঙ্কা করে মেয়র বলেন, করোনা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়তো কোনোদিন নাও হতে পারে। সুতরাং আমাদের জীবন ও জীবিকার তাগিদেই কার্যক্রম চালাতে হবে। এই করোনাভাইরাসকে নির্মূল করার জন্য আমাদের যে কয়টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে সেসব নিয়ে ব্যাপকভাবে কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এটাকে কীভাবে আরও বেগবান করা যায় এবং ঢাকাবাসী যেন চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় আমরা সেদিকে নগর রাখছি।
তবে করোনা মোকাবিলায় মেয়র বিস্তর পরিকল্পনার কথা জানালেও এখন পর্যন্ত ডিএসসিসির পক্ষ থেকে সড়কে জীবাণুনাশক ব্লিচিং পাউডার ছিটানো ছাড়া আর কোনও কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। আশা করা যায়, অচিরেই করোনা মোকাবিলায় ঢাকা দক্ষিণ মেয়রের পরিকল্পনার বিস্তারিত বাস্তবায়ন দেখতে পাবে নগরবাসী।
এদিকে, গত মার্চে দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর সরকার সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবিধি ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। খাদ্য বিতরণসহ ছিল আরও কিছু দৃশ্যমান কর্মসূচি। নতুন মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর শপথের আগের প্রায় আড়াই মাস প্রথমে নাগরিকদের পক্ষে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের কাজ দেখার ঘোষণা দেন মেয়র আতিকুল। মশা নিধন কর্মসূচি দেখভাল শুরু করতে না করতেই দেশে হানা দেয় করোনাভাইরাস। এরপর সিটি করপোরেশনের হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপনের কাজের উদ্বোধনের পর করোনা মোকাবিলায় দুস্থদের পাশে দাঁড়াতে নিজের প্ল্যাটফর্ম ‘সবাই মিলে সবার ঢাকা’র পক্ষ থেকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে আসছেন তিনি। ইতোমধ্যে দুস্থ, হিজড়াসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষকে এ সহায়তা দিয়েছেন তিনি।
জানতে চাইলে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, করোনা চিকিৎসার জন্য আমাদের একটি মার্কেট স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে হস্তান্তর করেছি। এছাড়া ডিএনসিসি এলাকায় প্রতিদিন ১০টি ওয়াটার বাইজারের মাধ্যমে ব্যাপক হারে জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছি। করোনা টেস্টের জন্য ৭টি স্থানে বুথ স্থাপন করেছি। নাগরিকদের মধ্যে খাদ্যসহায়তাসহ হাত ধোয়ার সাবান বিতরণ করেছি। এসব কাজ অব্যাহত থাকবে। ঢাকাবাসী যেন চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত না হন সেজন্য করোনা মোকাবিলায় আরও কিছু কর্মপরিকল্পনার কথা জানান তিনি। বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এসব পরিকল্পনা দৃশ্যমান হবে।
করোনা মোকাবিলায় ডিএনসিসির উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, করোনা মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করা হয়েছে। যদিও কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই বেসিনগুলো উধাও হয়ে যায়। এছাড়া নগরজুড়ে ১০টি ওয়াটার বাউজারের মাধ্যমে ৭৬ লাখ ৩৩ হাজার লিটার জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে। ২২ মে থেকে ডিএনসিসির আওতাধীন প্রতিটি হাসপাতাল পরিচ্ছন্নতার আওতায় আনা হবে। কাউন্সিলরদের মধ্যে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের লোকদের মধ্যে বিনামূল্যে ৩ হাজার ১৫০ কেজি ব্লিচিং পাউডার, ৪০ হাজার পিস সাবান ও ২৫০ লিটার হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয়েছে। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আরও ৬০ টন ব্লিচিং পাউডার, ৪৪ হাজার পিস হাত ধোয়ার সাবান ও ৫০ লিটার হ্যান্ড স্যানিটাইজার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি।
তিনি আরও জানান, ডিএনসিসির মহাখালী মার্কেট করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। যদিও সেখানে এখনও চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ডিএনসিসির ১৬টি কাঁচাবাজার উন্মুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তে ব্র্যাকের সহযোগিতায় ডিএনসিসি এলাকায় ৭টি বুথ স্থাপন করা হয়েছে।
এদিকে করোনা মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য গত ১৯ মে মঙ্গলবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নগর ভবনে ইন্টারন্যাশনাল ডিপার্টমেন্ট অব সেন্ট্রাল কমিটি, কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না (আইডিসিপিসি), বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, হুবেই প্রদেশ ও ডিএনসিসির মধ্যে এক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে করোনা মোকাবিলায় চীনের অভিজ্ঞতা নিয়েছে ডিএনসিসি।

/টিএন/আপ-এমআর/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ