‘লাইফ সাপোর্টের ভিন্ন ব্যাখ্যা হয় না’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০১:১১, মে ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:০২, মে ৩০, ২০২০

05791ada2ae0c1f2629e81da3b3122ca-5ecfb8341b78fইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা যাওয়া পাঁচ রোগী লাইফ সাপোর্টে ছিলেন বলে জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। তাদের এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে মারা যাওয়া তিনজনের পরিবার। এদিকে পরে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা লাইফ সাপোর্ট বলতে ইনটিউবেশন (নাক দিয়ে অক্সিজেন টিউব লাগানো) বোঝাননি, তাই পরিবারের সম্মতি নেওয়া হয়নি। তবে বাংলা ট্রিবিউনকে একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, লাইফ সাপোর্ট মানে লাইফ সাপোর্ট। লাইফ সাপোর্টের ভিন্ন কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান পাঁচ রোগী। ঘটনার ১৮ ঘণ্টার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বিকাল ৪টায় সংবাদ সম্মেলেনের আয়োজন করে। ইউনাইটেড হাসপাতালের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের কাছে শুরুতে রোগীদের বিষয়ে বলা হয়, ‘পাঁচ জনই অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তারা সবাই আইসিইউতে ( নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ছিলেন।’ তবে এ প্রতিবেদকের প্রশ্নে তারা পরে আবার বলেন, ‘রোগীদের কেউ হাঁটাহাঁটি করার মতো অবস্থাতে ছিলেন না। তারা পাঁচজনই শয্যাশায়ী ছিলেন এবং লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।’

যা বলেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল

ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিটেকশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্টের প্রধান ডা. শাগুফা আনোয়ার শুক্রবার রাতে জানিয়েছেন, কোনও রোগীকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়া হয়নি, যাতে করে পরিবারের সম্মতি নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, রোগীদের সবার হাই ফ্লো অক্সিজেন দেওয়া ছিল, লাইফ সাপোর্ট বলতে সেটাকেই ‘মিন’ করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি ইনটিউবেশন মিন করিনি এবং একবারের জন্যও বলিনি। যা কিনা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য করা হয় এবং এজন্য পরিবারের সম্মতির দরকার হয়। করোনা আইসোলেশন ইউনিটে কাউকে ইনটিউবেশন করা হয়নি। সব রোগীকেই হাই ফ্লো অক্সিজেন দেওয়া হয় জীবন রক্ষার জন্য। রোগীদের শারীরিক অবস্থার সিভিয়ারিটি বিবেচনা করে। আর এর জন্য পরিবারের সম্মতির দরকার হয় না।’ 

লাইফ সাপোর্টে রাখার বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য থেকে সরে এসে তিনি আরও বলেন, ‘কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে রোগীকে রাখা হয়েছিল- একথা আমি কখনোই বলিনি। হাই ফ্লো অক্সিজেন আর লাইফ সাপোর্ট এক নয়।’ 

বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে মারা যাওয়া নিহত রিয়াজুল করিম লিটন প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে বলা হয়, ‘ক্রিটিক্যাল অবস্থা না হলে কেন তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হবে।’ অথচ পরে বাংলা ট্রিবিউনকে পাঠানো বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে রোগীকে রাখা হয়েছিল, আমি কখনোই বলিনি।’

সেদিন অগ্নিকাণ্ডের সময়ে আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসক, নার্স কেউ ছিলেন কিনা জানতে চাইলে ডা. শাগুফা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘চিকিৎসক, নার্স সবাই ছিলেন, কিন্তু তারা ছিলেন বাইরের দিকে। আর রোগীরা ছিলেন ভেতরের দিকে, তাদের বের করার আগেই তারা মৃত্যুবরণ করেন।’

অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

রাজধানীর বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে করোনা আইসোলেশন ইউনিটটি পাঁচ শয্যা নিয়েই গত একমাসের কিছু সময় আগে চালু করা হয় হাসপাতালের মূল ভবন থেকে দূরে তাঁবু টাঙিয়ে। সরেজমিন দেখা যায়, জরুরি বিভাগের পাশ দিয়ে মূল ভবনের দূরে টিন আর বোর্ড দিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডটি করা হয়েছিল। সেখানে সব পুড়ে ছাই হয়ে আছে। আগুনের তীব্রতা বোঝা যায় নিচে পড়ে থাকা কাঠ ও কাঁচের টুকরা আর প্রায় ২০ ঘণ্টা পরও সেখানে পোড়ার তীব্র গন্ধ পেয়ে। দুটো পোড়া খাট ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। তবে সেখানে ছবি তুলতে গেলে বাধা দেন হাসপাতাল কর্মীরা।

তবে নিহত রিয়াজুল করিম লিটনের বড়ভাই বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, তাদের ধারণা আইসোলেশন ইউনিটে ওই সময়ে কোনও চিকিৎসক, নার্স বা ওয়ার্ডবয় কেউই ছিল না এবং বাইরে থেকে সম্ভবত দরোজাগুলো লক করা ছিল। যার ফলে তার ভাই ভেতর থেকে বের হতে পারেননি।

এদিকে, আইসোলেশন ইউনিটে কোনও চিকিৎসক, নার্স কেউ যান না বলেও মন্তব্য করেন মারা যাওয়া একজনে ছেলে আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘ভেতরে কেউ যায় না, রোগীদের কাছে কোনও নার্সও যায় না, ডাক্তাররাও যায় না। কেবলমাত্র ক্লিনারের কাজ করে কয়েকটা ছেলে। তাদের দিয়ে ভেতরের কাজ করায়। তাদের কাছ থেকে শুনে শুনে ওখানে চিকিৎসা চলে, তারা নিজেরা কিছু করে না।’

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ইউনাইটেড হাসপাতালের মতো হাসপাতালে পাঁচ জন রোগী পুড়ে যাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে মুখে লাইফ সাপোর্ট বলে পরে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনও মানে নেই। তাহলে সে ব্যাখ্যা তখনই তার দেওয়া দরকার ছিল।

ডা. শাগুফার লাইফ সাপোর্ট বলা এবং তার পাঠানো ব্যাখ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং কোভিড-১৯ নিয়ে গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লাইফ সার্পোট যখন কেউ উচ্চারণ করবে তখন তার মানে লাইফ সার্পোট, এর কোনও অন্য ব্যাখ্যা হয় না।’ আর ইউনিটে কোনও ফায়ার এক্সিট ছিল কিনা প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘ফায়ার এক্সিট ছিল না কেন, সে প্রশ্ন আগে করা উচিত ইউনাইটেডকে।’

আর তিনি যদি লাইফ সাপোর্ট বলে থাকেন তাহলে কেন সেটা মিন করবেন না প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘ইউনাইটেড হাসপাতালের মতো হাসপাতালের কাছে আমরা আশা করি না তারা এমনভাবে একটা করোনা ইউনিট করবেন, আর আগুন লাগার পর কেউ বেরুতে পারলো না।’

‘খুব অমানবিক হলেও প্রশ্নটা তুলতে হয় সেখানে কেবল রোগীরাই মারা গেলেন, হাসপাতালের কেউ তো আহতও হলেন না। অর্থাৎ সেখানে কেউ ছিল না। রোগীগুলোকে কেবল তারা সেখানে ফেলে রেখেছিলেন। তাদের অগ্নিনির্বাবক যন্ত্র কাজ করেনি, তাদের ফায়ার এক্সিট ছিল না, তাহলে কেমন করে, কীসের ভিত্তিতে তারা এমন জায়গায় “মানুষ” রাখলো। হাসপাতালের কাছে আমি প্রশ্ন করতে চাই, তারা যদি লাইফ সাপোর্ট বলে থাকে তাহলে তাদের বলতে হবে লাইফ সাপোর্ট বলতে তারা কী বুঝিয়েছেন।’ বলেন অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।

এদিকে, জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যখন কেউ কোনও ম্যাকানিক্যাল সাপোর্ট ছাড়া চলতে পারে না, তখন যে সাপোর্টকে দেওয়া হয় তাকে লাইফ সাপোর্ট বলা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় লাইফ সাপোর্টের অন্য কোনও মানে হয় না। কেউ যদি এর অন্য ব্যখ্যা বলে তাহলে তার নিজস্ব ব্যাখ্যা, মেডিক্যাল সায়েন্সের ব্যাখ্যা না। লাইফ সাপোর্টের কোনও ভিন্ন ব্যাখ্যা হয় না, “লাইফ সাপোর্ট মিনস আন্ডার ভেন্টিলেশন”।’ বলেন তিনি।

‘বাইরে থেকে হয় এটি লক করা ছিল’ মন্তব্য করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আইসিউ বিশেষজ্ঞ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আর আগুন তো শুরুতেই এভাবে লেগে যায়নি। পাঁচজন মানুষ কেউ ভেন্টিলেটরে না, ডাক্তার-সিস্টার্সরা সবাই চলে যেতে পারলো, তাহলে রোগীরা কেন বের হতে পারলো না? দ্যাট শুড বি অ্যা ভেরি স্ট্রং কোয়েশ্চেন।’

রোগীদের কোভিড পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়েও লুকোচুরির অভিযোগ

শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন খোদেজা বেগম। গত ১৫ দিন আগে বাসা থেকে তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয় এবং তাতে ফল নেগেটিভ আসে। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।  কোভিড পরীক্ষায় সেখানেও নেগেটিভ আসে। পরে তাকে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ইউনাইটেড হাসপাতালেও কোভিড-১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ বলে ফোনে তার ছেলে আলমগীর হোসেনকে জানানো হয়। এরপর ২৭ মে  সকালে হাসপাতালে গিয়ে রিপোর্ট চাইলে তাকে জানানো হয়, রিপোর্ট আসেনি। তারা মুহূর্তের মধ্যেই কথা বদলে ফেলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা কিন্তু রিপোর্টের কথা বলেই আমাকে নিলো, কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর বলে ওইটা নাকি তাদের মিস হয়েছে। এতবড় হাসপাতালের যদি কোভিডের মতো বিষয় নিয়ে এই অবস্থা হয় তাহলে কেমন করে হয়। আর নেগেটিভ হলে তারা আইসোলেশন ইউনিট থেকে মাকে ষষ্ঠতলায় স্থানান্তর করা হবে বলেও জানান নার্সরা।’

কেবলমাত্র তাদের গাফিলতির কারণে তার মাকে পুড়ে মরতে হয়েছে জানিয়ে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সেদিন যদি রিপোর্টটা তারা দিতো তাহলে মাকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে পারতাম। মাকে হারাতে হতো না।’

নেগেটিভ হওয়ার পরেও আইসোলেশন ইউনিটে ভেরুন এন্থনি পল

অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ভেরুন এন্থনি পল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই কোভিড নেগেটিভ ছিলেন। ভেরুন এন্থনি পলের ছেলে এন্দ্রো ডোমেনিক পল বলেন, ‘কোভিড নেগেটিভ থাকার পরও তারা বলেছে, আইসোশেন ওয়ার্ডে রাখতে হবে, আমরা রাজি হয়েছি। তারা মুচলেকা নিয়েছেন, যদি এখানে পজিটিভ হন, তাহলে তাদের দোষ নেই্, সেটাও আমি সাইন করেছি। তারপর বলেছে, যদি পজিটিভ হন তাহলে ওখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, সেটাতেও আমি রাজি হয়েছি। তারপর তারা টেস্ট করেছে। তার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে, সেই রিপোর্টও তারা দেয়নি। কিন্তু আমি আমার সোর্স থেকে এটা জানতে পেরে বাবাকে এখান থেকে বের করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বারবার বলছিলাম এবং এজন্যই সেদিন আগুন লাগার সময়ে অন দ্য স্পট ছিলাম।’

ইউনাইটেড হাসপাতালের অস্থায়ী আইসোলেশন ইউনিট নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত সচিব ও কোভিড-১৯ বিষয়ক মিডিয়া সেলের প্রধান মো. হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউনাইটেড হাসপাতাল খুব ক্যাজুয়ালি নিয়েছিল আইসোলেশন ইউনিটকে। একটা স্বনামধন্য হাসপাতালের পক্ষে, যাকে আমরা করপোরেট হাসপাতাল বলি, এরকম ক্যাজুয়ালি নেওয়াও ঠিক হয়নি। আমি বলবো, এটা দুঃখজনক।’

তিনি আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে তাদের বেশির ভাগ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। এটা নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি করার কথা আমরা আলোচনা করছিলাম, কিন্তু যেহেতু ফায়ার সার্ভিস তদন্ত করছে, চাইবো তাদের তদন্তে ভালোভাবে সবকিছু উঠে আসুক।’

আরও পড়ুন: ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি  

                   ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনের ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা 

                   ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুন, ৫ রোগীর মৃত্যু  

                   ‘জরুরি ব্যবস্থায় তৈরি ইউনাইটেডের বিশেষ করোনা ইউনিট নিয়ে প্রশ্ন’

 

 

 

 

 

 

 

 

/জেএ/এমএএ/

লাইভ

টপ