মাস্ক ব্যবহার: আইন দিয়ে সচেতনতা হয় না

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৪:১০, জুন ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১৭, জুন ০৬, ২০২০

আইনের বাধ্যবাধকতা থাকায় মাস্ত পরে কাজে যাচ্ছেন লোকজন২৩ বছরের আকাশ মগবাজারের একটি অ্যাপার্টমেন্টে কেয়ারটেকারের কাজ করেন। চারদিন আগে ভবন মালিক কমিটির সভাপতি তাকে জানায়, বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। পরে এলাকার একটি ফার্মেসি থেকে ২৫ টাকা করে ১০০টি মাস্ক কেনেন। আকাশ বলেন, ‘প্রতিটি মাস্ক দু’দিন করে পরি। কিন্তু সেগুলো শেষ হয়ে গেলে আবার কিনতে হবে। কয়েকদিন আগে মাস্কের দাম কম থাকলেও এখন আবার দাম বাড়ছে। কিন্তু এটা তো আমার জন্য বাড়তি খরচ।’

পরীবাগে ছোট চায়ের দোকান চালান দীপক কুমার চক্রবর্তী। সাধারণ ছুটির সময় চায়ের দোকান বন্ধ রাখলেও কয়েকদিন ধরে আবার খুলেছেন। তবে দীপক কুমারের মুখে এক স্তরের মাস্ক কেন জানতে চাইলে জবাব দেন, ‘টিভিতে দেখাইছে সবাইকে নাকি মাক্স (মাস্ক) পরতে হবে। না হলি জরিমানা, তাই তো এইটা পরি আছি’।

দাম কতো নিয়েছে জানতে চাইলে জানালেন, ৩০ টাকা করে পরিবারের পাঁচ জনের জন্য পাঁচটা কিনেছেন। বাসায় ফিরে ধুয়ে দেন, আবার বের হওয়ার সময় পরে বের হন। আকাশ, দীপকের জন্য এভাবে মাস্ক কেনা গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া বলে জানিয়েছেন তারা। দীপক বলেন, “মানুষ নাই দোকানে, বিক্রি হয় না। চাল আর ডাল কিনার টাকা নিয়েই ঘরে যেতে পারি না। তারপর আবার এই ‘মাক্স’ কিনবো কেমন করি?”

মাস্ক ব্যবহারে আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন দিয়ে কখনও সচেতনতা হয় না। তার চেয়ে করোনার শুরু থেকে হাত ধোয়ার বিষয়টি বলে বলে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সে পন্থায় গেলে অনেক কাজের হতো। একইসঙ্গে মাস্ক সঠিকভাবে না পরার কারণে বরং সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই এজন্য কোনও ধরনের মাস্ক কীভাবে পরতে হবে সে বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরির কাজ করা দরকার ছিল আগে। এছাড়া আইন দিয়ে জনসচেতনতা হয় না।

৩০ মে রাতে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ‘ঘোষণা’ শিরোনামে গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাইরে চলাচলের সময় মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তা না হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮ অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক/যথাযথ কর্তৃপক্ষ সতর্কভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে।

৩১ মে নিয়মিত অনলাইন বুলেটিনে অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘লকডাউন উঠে গেছে। এখন সবাইকে সাবধান থাকতে হবে। সঠিকভাবে মাস্ক পরতে হবে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।’

আইনের বাধ্যবাধকতা থাকায় মাস্ত পরে কাজে যাচ্ছেন লোকজন

মাস্ক পরার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিদফতর সবাইকে মাস্ক পরতে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কোনও মাস্ক ব্যবহার করবেন। একটি মাস্ক কতদিন ব্যবহার করবেন সে বিষয়ে কিছু বলেনি। অথচ রাস্তায় বের হলেই ভ্যানে করে, সাইকেলে করে যে যেভাবে পারছে সেভাবেই বিক্রি করছে মাস্ক। আর সাধারণ মানুষও সেগুলো কিনছে ও ব্যবহার করছে। একইসঙ্গে দেশের খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে কতদিন এই ‘বাড়তি ব্যয়’ বহন করা সম্ভব হবে সে  নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। 

মগবাজারের রমনা ফার্মেসির মালিক এজাজ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিটফোর্ড আর বিএমআই ভবনে যারা সার্জিক্যাল আইটেমের ব্যবসা করেন তারা চীন থেকে মাস্ক আমদানি করছেন। তবে দেশেও প্রচুর পরিমাণে মাস্ক তৈরি হচ্ছে। এরমধ্যে যেমন ভালো মানের রয়েছে তেমনি কম দামিও রয়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে এ সংক্রান্ত কোনও নীতিমালা না থাকায় যে যেভাবে পারছে সেভাবেই মাস্ক তৈরি করে বিক্রি করছেন।’

২৬ মার্চে যখন লকডাউন দেওয়া হলো তখন হোলসেল থেকে একটা মাস্ক ৩৭-৪০ টাকা দামে কেনা হতো জানিয়ে এজাজ বলেন, তারপর মোবাইল কোর্টের তৎপরতায় দাম কিছুটা কমেছে।

তিনি বলেন, ‘তাও মার্চ আর এপ্রিলে ২০ টাকার নিচে কোথাও মাস্ক পাইনি।’

গেল ১০ দিনে মাস্কের দাম কমতে শুরু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাস্ক বিক্রি অনেক বেড়েছে। এখন সবাই মাস্ক পরার চেষ্টা করছে। তবে যেগুলোর মান ভালো বা সার্জিক্যাল মাস্ক সেগুলো ১৩-১৫ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু দেশে যেগুলো তৈরি হচ্ছে তার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেক। সেগুলো ১০-১২ টাকা করে বিক্রিও হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো একেবারেই প্রটেকটিভ না। সাইকেলে, রিকশায়, হাতে-হাতে হকাররা এসব বিক্রি করছে রাস্তায়। কিন্তু এগুলো ভাইরাস থেকে কতটুকু সুরক্ষা দেবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মনে হয় না এগুলো কোনও কাজে দেবে।’

এ বিষয়ে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘আইন দিয়ে সচেতনতা হয় না। আইন দিয়ে ভয় দেখানো যায়।’

শাস্তির বিধানকে ‘পাশ কাটানোর একটা পন্থা’ উল্লেখ করে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন,  ‘খুব উৎসাহী হয়ে এটা করা হয়েছে। এগুলোতে কিছু কাজ হবে না। আর যেগুলো বিক্রি হচ্ছে সেগুলোও আসল কী নকল সেটা পরীক্ষা করারও তো কোনও জায়গা নেই।’

মাস্ক না পরার শাস্তির চেয়ে জরুরি এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা জানিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন,  ‘এরকম ঘোষণা দেওয়া হলে তার সঙ্গে অবশ্যই দিয়ে দিতে হবে যে কী ধরনের মাস্ক পরতে হবে। বাজারে অনেক ধরনের মাস্ক রয়েছে, তার মধ্য থেকে সাধারণ মানুষ কোনও মাস্ক পরবে সেটা অবশ্যই মানুষকে জানাতে হবে। আর কাপড়ের মাস্ক সেরকম প্রটেকশন দেবে না। একইসঙ্গে এসব মাস্কের দামের বিষয়ে সরকারকে ভূমিকা নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ম করে পরতে হবে বললেই তো কেবল হবে না, দাম হাতের নাগালে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার মাস্কের দামে ভর্তুকি দিতে পারে এবং অধিদফতরের এরকম ঘোষণার সঙ্গে মাস্ককে স্পেসিফাই করে দেওয়া এবং সহজলভ্য করতে হবে।’

তবে আইন দিয়ে সচেতনতা হয় না স্বীকার করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং কোভিড বিষয়ক মিডিয়া সেলের প্রধান ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, এখানে মানুষের মোটিভেশন দরকার।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, আইনটি মানবিকভাবে প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে।  

একইসঙ্গে অনেকে ত্রাণ হিসেবে মাস্ক দিতে পারেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালো মানের তিন স্তরের মাস্ক তৈরির জন্য সরকারের অনেক সংস্থার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

/জেএ/এসটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ