বিমানবন্দরে করোনা পজিটিভ যাত্রী আটকানো যাচ্ছে না কেন?

Send
চৌধুরী আকবর হোসেন
প্রকাশিত : ১২:০০, জুলাই ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৫, জুলাই ১০, ২০২০

বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন চেক পয়েন্টবাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীদের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ নতুন করে বাংলাদেশিদের ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সর্বশেষ ইতালির বিমানবন্দর থেকে ফিরতে হয়েছে ১৬৮ বাংলাদেশিকে। এমনকি ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটি। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে করোনা পজিটিভ যাত্রী আটকানো যাচ্ছে না কেন? জনবল সংকট ও সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের পদ্ধতি অনুসরণ করেই বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন চীন ছাড়া অন্যান্য আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বন্ধ রাখার পর স্বাস্থ্যবিধি ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নীতিমালা অনুসরণ করে গত ১৬ জুন থেকে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু করা হয়। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাজ্য ও কাতারে ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য বিমান চলাচল শুরু হয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে বিধিনিষেধ থাকায় বিভিন্ন রুটে পরিচালিত হয়েছে বিশেষ ফ্লাইট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতালি, জাপান, ফ্রান্স, মালদ্বীপ, ভারত, দুবাইসহ বেশ কিছু দেশে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
জানা গেছে, গত সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ থেকে রোমে যাওয়া একটি ফ্লাইটের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রীর শরীরে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। এরপরই বাংলাদেশের সঙ্গে সব ধরনের ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে ইতালি। এই ঘোষণার পরও বুধবার (৮ জুন) বাংলাদেশ থেকে কাতার হয়ে ইতালিতে যাওয়া দুটি ফ্লাইটের ১৬৮ জন বাংলাদেশি যাত্রীকে ফিরিয়ে দিয়েছে ইতালি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ জুন বাংলাদেশ থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইট দক্ষিণ কোরিয়ায় যায়। সেই ফ্লাইটের ১১ জন যাত্রীর শরীরে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। এ কারণে ২৩ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া স্থগিত করে দেশটি। জুন মাসেই ঢাকা থেকে গুয়াংজুতে যাওয়া চায়না সাদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ১৭ জন যাত্রীর শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এ কারণে চায়না সাদার্ন এয়ারলাইন্সকে চার সপ্তাহ বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখতে বলে চীন। এর আগে জাপানেও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীদের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় ফ্লাইটের ওপরে নিষেধাজ্ঞা দেয় দেশটি।

ইতালিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব মো. এরফানুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতালিতে বেশ কিছু বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। সেই ফ্লাইটের যাত্রীদের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ কারণে ইতালি বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ভালো বলতে পারবে, তারা আসলে কীভাবে করোনা আক্রান্ত যাত্রী নিয়ে আসলো।’

শুধু ইতালি নয়, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিচালিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটে করোনাভাইরাস আক্রান্ত যাত্রী শনাক্ত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব দেশে যেতে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই। এয়ারলাইন্সগুলোকে তা-ই বলা হয়েছে, যে দেশে তারা যাত্রী নেবে সে দেশের নির্দেশনা অনুসরণ করতে। এছাড়া, বিমানবন্দর ও ফ্লাইটে কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে, সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোকে। ফলে যাত্রীদের বিষয়গুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব এয়ারলাইন্সগুলোর। কোনও দেশ থেকে আমরা বিমানবন্দরের বিষয়ে কোনও অভিযোগ পাইনি।’

বিমানের ফ্লাইটে কীভাবে করোনা আক্রান্ত যাত্রী পরিবহন হচ্ছে, সে বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তা রিসিভ করেননি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার। তার মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়েও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। তাহেরা খন্দকারের কাছে ও বিমানের জনসংযোগ বিভাগে জানতে চেয়ে ইমেইল পাঠালেও এ বিষয়ে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।

বিমানবন্দরে কীভাবে হচ্ছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা

গত ১৬ জুন থেকে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু করার আগেই বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্সগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। করোনা সংক্রমণ রোধে বেবিচকের নীতিমালা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে বলা হয় এয়ারলাইন্সগুলোকে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে এতদিন দেশে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা করা হতো। এজন্য বিমানবন্দরে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বর্তমানে বিমানবন্দরের মাধ্যমে বিদেশগামী যাত্রীদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জনবল ও যন্ত্রপাতি সংকটের কারণে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে প্রবেশের আগেই যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভেতরে প্রবেশের পরও একাধিকবার যাত্রীর তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। কারও মধ্যে কোনও উপসর্গ আছে কিনা সেটিও জানতে চাওয়া হচ্ছে। কারও শরীরের তাপমাত্রা বেশি হলে তাকে আর বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে কোনও দেশে যেতে যদি করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট লাগে সেটি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স দেখবে।’

তৌহিদ-উল আহসান বলেন, ‘এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এখন উপসর্গহীন করোনা রোগীও শনাক্ত হচ্ছে। বিমানবন্দরে কোনও উপসর্গহীন আক্রান্ত যাত্রী এলে তাকে শনাক্ত সম্ভব নয়। তবে বিমানবন্দরে যাতে কেউ আক্রান্ত না হন, সেজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।’

এ কাজে বিমানবন্দরের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের। তাদের আমরা জানিয়েছি, বিদেশগামী যাত্রীদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। কিন্তু তাদের কার্যক্রম না থাকায় আমরা জাতীয় স্বার্থে আমাদের জনবল ও যন্ত্রপাতি দিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শাহরিয়ার সাজ্জাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এতদিন আমরা বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতাম। এখন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিদেশগামী যাত্রীদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথা বলছে। এ কারণে জনবল ও অবকাঠামো প্রদানের জন্য আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানিয়েছি। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা চাইলে এখনও আমরা সহযোগিতা করছি।’

ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘বিমানবন্দরে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ, বিমানবন্দরে তো পিসিআর ল্যাব নেই যে টেস্ট করা হবে। আবার শরীরে জীবাণু প্রবেশের ৪-৫ দিন পর্যন্ত পিসিআর টেস্ট করা হলেও নেগেটিভ রিপোর্ট আসতে পারে। আবার কেউ করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু টেস্ট করার পরও কেউ আক্রান্ত হতে পারেন।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ সংক্রমণ হয়েছিল ইতালি ফেরত যাত্রীদের মাধ্যমেই। এটা নিয়ে তো বাংলাদেশ সরকার কোনও জরিমানা দিতে বলেনি ইতালিকে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যারা যাচ্ছেন তারা এয়ারপোর্টে আক্রান্ত হতে পারেন, ট্রানজিটে আক্রান্ত হতে পারেন, প্লেনের ভেতরেও আক্রান্ত হতে পারেন। প্লেনের ভেতরে তো আর পিপিই পরে যাচ্ছেন না, সেখানে বাথরুম, সিট, খাবারের ট্রে স্পর্শ করছেন। সেখান থেকেও আক্রান্ত হতে পারেন। অপরদিকে, কোনও যাত্রী পরীক্ষার পর যদি নেগেটিভ হন, তিনি নমুনা দেওয়ার পরেও নেগেটিভ হতে পারেন, পরীক্ষা করা মানে তো তিনি কোভিড-১৯ প্রতিরোধকারী টিকা নেননি। এসব ক্ষেত্রে সব যাত্রীকে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নেওয়াটাই নিরাপদ পদ্ধতি। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের পদক্ষেপকে সমর্থন করে না। কিন্তু এটা ‘আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি ২০০৫’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’’

/সিএ/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ