ভবিষ্যৎ শিক্ষা কার্যক্রমের রূপরেখা নিয়ে এসিসিএ বাংলাদেশের অনলাইন আলোচনা

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ২৩:২১, জুলাই ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৮, জুলাই ২৯, ২০২০

এসিসিএ’র অনলাইন আলোচনায় বক্তারাদ্য অ্যাসোসিয়েশন অব চার্টার্ড সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (এসিসিএ) বাংলাদেশের আয়োজনে হয়ে গেলো ‘ফিউচার অব এডুকেশন’ নিয়ে অনলাইন আলোচনা। এতে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম যে ধরনের সমস্যায় পড়েছে তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা। নতুন উদ্ভাবনী শিক্ষা পদ্ধতি, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সমন্বয়, একাডেমিক ও ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার মধ্যে পার্থক্য, উদ্যোক্তা তৈরিকরণ এবং শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালা নিয়ে কথা বলেন তারা।
গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত অনলাইন আলোচনায় হোস্ট ছিলেন এসিসিএ বাংলাদেশের সিনিয়র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার-লার্নিং শাহ ওয়ালীউল মনজুর। সঞ্চালনা করেছেন এডুকেশন ম্যানেজার প্রমা তাপসী খাঁন। এছাড়াও ছিলেন এসিসিএ বাংলাদেশের সিনিয়র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার মো. ফায়াত আলী চয়ন, মার্কেটিং ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল হাসান এবং বিজনেস সার্ভিস ও কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার জিএম রাশেদ।
‘স্কুল পর্যায়ে অ্যাকাউন্ট অ্যাসিসট্যান্ট প্রয়োজন’

মহিবুল হাসান চৌধুরী, শিক্ষা উপমন্ত্রী

আমাদের সমাজ এখন যত জটিল হচ্ছে ততবেশি অ্যাকাউন্টিং এবং অ্যাকাউন্ট্যান্টদের প্রয়োজন পড়ছে। বিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা কম্পিউটার অপারেটর রাখছি, অফিস সহকারি রাখছি, কিন্তু যেটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা সেটা নিয়ে সেখানে কোনো বিধান নেই। এজন্য আমাদের দরকার প্রত্যক স্কুলে অ্যাকাউন্ট অ্যাসিসট্যান্ট যারা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। এখন আমি অ্যাকাউন্টিংই জানি না, হিসাবই জানি না, তাহলে তো হিসাবের নয়-ছয় হবেই। আবার তাদের দক্ষতারও বিষয় আছে। যারা ইতিমধ্যে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করছে তাদের কি আমরা কোনো বিশেষ মডিউলে ট্রেনিং দিয়ে অ্যাকাউন্ট অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে তৈরি করতে পারি কি না সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। এখন তো অ্যাকাউন্টিং হয়ে গিয়েছে সফটওয়্যার নির্ভর। তাদেরকে একটা কোর্সের মাধ্যমে রিস্কিল করতে পারি আমরা।

‘প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক গুণাবলির চর্চা করতে হবে’
প্রফেসর ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন (সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন)

আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবিকতা। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক গুণাবলিরও চর্চা করতে হবে। রাশিয়া এবং চীনের মতো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে। যে দিকগুলোতে আমরা শক্তিশালী, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেই খাত-কেন্দ্রিক করতে হবে। প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে সুগঠিত শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। পাঠশালাগুলোতে প্রায়োগিক শিক্ষা প্রচলিত ছিল। কোভিড আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাবার সময় এখন আমাদের সামনে। আমরা অনেক যায়গায় পিছিয়ে আছি, কিন্তু আমাদেরও অনেক শক্তিশালী দিক রয়েছে, আমাদের মেধা রয়েছে। আমাদের এই মেধা ও শক্তিকে একত্রিত করে চিন্তাভাবনার ব্যবধান কমিয়ে একটি জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি বিফলে যায়নি, অনেক ক্ষেত্রে এটি সফল। যে বিষয়গুলোতে ঘাটতি রয়েছে সেগুলো পূরণ করতে হবে।

‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রির মাঝে যোগাযোগের বিস্তর ফারাক রয়েছে’
প্রফেসর ড. মুনাজ আহমেদ নূর (উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি)

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, পৃথিবীর বিদ্যমান জ্ঞান এবং ইন্ডাস্ট্রির গবেষণালব্ধ জ্ঞান শিক্ষার্থীকে দেয়া। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীকে জটিল ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত করা। একজন শিক্ষার্থী তার কাজের সবকিছুই মূলত ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে শিখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে তাকে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ শুরু করার প্রাথমিক জ্ঞানটুকু প্রদান করা। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রির মাঝে যোগাযোগের একটি বিস্তর ফারাক রয়েছে। কোন ইন্ডাস্ট্রি কোন ধরনের প্রাথমিক জ্ঞান চাচ্ছে তার কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা অনুযায়ী জ্ঞান শিক্ষার্থীকে দিতে পারছে না। প্রযুক্তিগত শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা কাঠামো দাঁড় করানো গেলেও সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে এটা খুব কঠিন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে তৈরি করা যেন সে অনানুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে শিখতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর তিনটি সক্ষমতা থাকতে হবে। নতুন করে শেখা, পুরনো শিক্ষা থেকে নিজেকে মুক্ত করা এবং পুনরায় শেখার সামর্থ্য। আরেকটি সক্ষমতা হচ্ছে ‘শেখার পদ্ধতিটা শেখা এবং চিন্তার পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করা’ । এই বিষয়গুলো যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীকে দিতে পারে তবে ইন্ডাস্ট্রির সাথে যে পার্থক্য তা অন্তত না ঘুচলেও একজন শিক্ষার্থীর মাঝে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশের প্রাথমিক জ্ঞানটুকু থাকবে।
কোভিড-১৯ এর কারণে আমরা এখন শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছি। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রদানে আমরা একটু পিছিয়ে আছি। আমাদের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রদানের এই জড়তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

‘চাকুরিদাতারা বলছেন শিক্ষার্থীরা ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত না’
আনীর চৌধুরী (পলিসি অ্যাডভাইজর, এটুআই –আইসিটি এবং ইউএনডিপি)

আমাদের দেশে বেকারত্বের হার ৪ শতাংশের একটু বেশি। কিন্তু গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার ৩৯ শতাংশ, যা প্রায় দশ গুণ। চাকুরিদাতারা বলছেন শিক্ষার্থীরা ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত না। তার মানে আমাদের পাঠ্যক্রমে সমস্যা সমাধান পদ্ধতি শেখানো হয় না। আমাদের প্রাথমিক এবং উচ্চশিক্ষা অনেকটা একইরকম। প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একই পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করা হয়। আমাদেরকে শিক্ষাপ্রদান ও শিক্ষাগ্রহণ নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের চিন্তা করতে হবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কীভাবে শিখে। আমাদের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ব্যাপারটি নেই, যথাযথ ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা নেই। আমরা যদি আমাদের শিক্ষায় এই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে না পারি তবে আমাদের এই বেকারত্বের হার বাড়তেই থাকবে।
শিক্ষার আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে অনুপ্রেরণা। শিশুকিশোরদের থেকে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার বিষয়টি ভিন্ন। প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষাগ্রহণের পেছনে একটি চাকুরি পাওয়ার চিন্তা কাজ করে। আর তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে দ্রুত পরিবর্তনশীল চাকুরির বাজারের সমকক্ষ হতে হবে।
আমাদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। আমরা কোন ধরনের প্রফেশনাল কী পরিমাণে চাই সেই লক্ষ্য থাকতে হবে এবং সে অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা সাজাতে হবে। যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে শিক্ষা নেয়াটা শিখতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

‘তরুণদের চাকুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন’
টি. এম. আসাদুজ্জামান (শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও টিম লিডার, দক্ষিণ এশিয়া, এডুকেশন গ্লোবাল প্র্যাকটিস, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ)

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ইন্ডাস্ট্রির মাঝে যে দূরত্ব রয়েছে তা দূর করতে আমাদের নিয়মানুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগণের প্রায় ৪০ শতাংশ বিভিন্ন কারণে শ্রমশক্তির বাইরে। এর বড় একটা কারণ কর্মক্ষেত্রে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ। তবে এখানে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে এই বেকারদের ৮০ শতাংশই তরুণ। এর কারণ হলো শিক্ষাক্ষেত্র থেকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের রাস্তাটা কঠিন এবং ঢাকার বাইরে পর্যাপ্ত কাজের অভাব। তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের একটা বড় অংশ প্রায় ২ বছরের জন্য বেকার থেকে যায়। তরুণদের চাকুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের কিছু প্রজেক্ট রয়েছে যেখানে প্রশিক্ষণের পর চাকুরি নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কোভিড পরবর্তী সময়ে নতুন যে কাজগুলো সৃষ্টি হবে সেগুলোর জন্য আমাদের এখনই পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তা বাস্তবায়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

‘কোভিড-১৯ আমাদের চারটি শিক্ষা দিয়েছে’
প্রফেসর ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার (পরিচালক, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

কোভিড-১৯ আমাদের সুনির্দিষ্ট চারটি শিক্ষা দিয়েছে। প্রথমত, আমরা সবাই বিশ্বব্যাপী একে অপরের সাথে যুক্ত। আমরা বিশ্বনাগরিক, একজন মানুষ আরেকজন মানুষ থেকে ভিন্ন নয়। প্রভাবটা কোভিডে হোক কিংবা বাণিজ্য সংক্রান্ত হোক সেটা আমাদের কাছে আসবেই। দ্বিতীয়ত, আমরা বৈশ্বিক শিক্ষার মধ্যে কোনোদিন চিন্তা করিনি ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করব, যেটাকে আমি বলি রিয়েল টাইম লার্নিং। আমরা কিন্তু একটা জায়গায় চলে গিয়েছি তা হলো রিয়েল টাইম লার্নিংয়ে। এর মানে হচ্ছে আমি যদি আজকে কোনো একটা কাজ না করি সেটা কালকে আমার জন্য খুবই দেরি হয়ে গেল। আপস্কিলিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের রিয়েল টাইমে থাকতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা নিয়ে থাকলে হবে না, নিজে থেকে সক্রিয় অবস্থায় আসতে হবে। সক্রিয় মানসিকতায় আসতে গেলে আমাকে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিস্তার দুটোই যাচাই করতে হবে। এই তিনটি থাকলে চতুর্থটি এমনিতেই চলে আসে - তা হলো আমাদের যোগাযোগ দক্ষতা। অবশ্য সামাজিক মাত্রার কিছু কিছু জিনিসও থাকতে হবে পাশাপাশি।

‘কোভিডের কারণে অনলাইনে ক্লাসের সম্প্রসারণ’
ড. মুহাম্মাদ আব্দুল মঈন (ডিন, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

কোভিড পরিস্থিতির কারণে আমাদের এখন মুখোমুখি ক্লাস হচ্ছে না। তাহলে আমাদের শিক্ষকদের দায়িত্ব কি ভিন্ন হয়ে গেল? আমার তা মনে হয় না। শিক্ষক হিসেবে আমি আগে যা ছিলাম এখনও তাই আছি। কোভিড সময়ে যে পরিবর্তনটা এসেছে সেটাতে প্রযুক্তির একটা ভূমিকা রয়েছে। কোভিডের আগে অনলাইনে আলোচনা করার কথা আমরা ভাবতেও পারতাম না। এখন বিষয়টা অনেকটা সহজ। আমরা অফিশিয়াল মিটিংগুলো অনলাইনে করি। ইন্টারনেট নতুন নয়, মিটিং প্ল্যাটফর্মও নতুন নয়, এই জাতীয় ভিডিও কনফারেন্সিংও নতুন নয়। কিন্তু এগুলোতে আমরা দ্রুত অভ্যস্থ হয়েছি কোভিড-১৯ এর কারণে।
আমরা ক্লাসরুমে যেটা করতে পারতাম তার থেকে অনেক ভালো কিছু অনলাইনে করা সম্ভব। আবার এখানে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আমাদের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়কে। এটা সম্পূর্ণভাবে সরকারের দায়দায়িত্ব নয়। বেসরকারি এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান সবাইকে হাতে হাত মিলিয়ে এটাকে এগিয়ে নিতে হবে। একা সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না।

‘আমাদের যোগাযোগ দক্ষতা থাকা প্রয়োজন’
প্রফেসর মো. শাহ আজম (মার্কেটিং বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ফলাফল নির্ভর শিক্ষাকে বাংলাদেশে প্রবর্তন করার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, অবকাঠামো গঠনসহ বিভিন্ন প্রণোদনা সরবরাহ করেছে। গতানুগতিক শিক্ষা থেকে বের হয়ে কী করতে চাই সেটা নির্ধারণ করে পাঠ্যক্রম ডিজাইন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। কোভিডের মধ্যেও আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে। এবং নানা দিক থেকে আমাদের অনেক অর্জনও রয়েছে। স্বাক্ষরতার হার বাড়ার পাশাপাশি ঝরে পরার সংখ্যা কমেছে। শিক্ষক এবং ছাত্রের অনুপাত কমেছে। সবদিক থেকে ইতিবাচক।
আমাদের শিক্ষাদান আছে, কিন্তু এখানে একজন উদ্যোক্তার প্রতিপালন করতে গেলে তাকে যে দক্ষতা, প্রণোদনা, মানসিক বিন্যাস এবং ইতিবাচক উৎসাহটা দেয়া প্রয়োজন সেটি আসলে হচ্ছে না। তার মানে বর্তমান শিক্ষাদান নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এবং পরিবর্তন আনতে হবে। এবং সেটা করতে গেলে যা যা প্রয়োজন তার মধ্যে একটি হলো যোগাযোগ দক্ষতা, আরেকটি হচ্ছে সুনির্দিষ্ট প্রফেশনাল গুণাবলি।

‘শিক্ষার্থীর ইন্টারভিউ বিষয়ক দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি ভাবা উচিৎ তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের’
জারীন মাহমুদ হোসেন (পার্টনার, স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস)

আমরা এসিসিএ বাংলাদেশের একটি স্বীকৃত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর বেশ কিছু শিক্ষার্থী আমাদের এখানে আসে এবং একসময় তারা দেশি বিদেশি বড় প্রতিষ্ঠানে যাবার সুযোগ পায়। আমরা নিয়োগের সময় লক্ষ্য করি বেশিরভাগ প্রার্থী প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক ভালো। কিন্তু এটি তাদের প্রথম ইন্টারভিউ হওয়ার কারণে তেমন কোনো প্রস্তুতি থাকে না, ফলে ফলও ভালো হয় না। একজন শিক্ষার্থীকে ইন্টারভিউয়ের ব্যাপারে প্রশিক্ষণের কাজটি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করা উচিৎ। আমাদের এখানে মেধার অগ্রাধিকার দেয়া হয়। একারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এখানে কাজ করার সুযোগ পায়।
আমরা তাদেরকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শক্তিশালী কর্মী হিসেবে গড়ে তুলি। তারা যাতে আর্থিক ব্যাপারে চিন্তা না করে শেখায় মনযোগ দিতে পারে সেই ব্যবস্থা আমরা করছি। তাদের যোগাযোগ দক্ষতা এবং অন্যান্য উন্নতির জন্য প্রতি মাসে বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং ইন্ডাস্ট্রি লিডারদের সাথে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। এসকল উদ্যোগের কারণে দুই থেকে তিন বছর পর আমরা এমন কর্মী তৈরি করতে পারি যাদের নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে।

‘কোভিড-১৯ আমাদের ডিজিটাল উন্নয়নে গতি এনে দিল’
আরিফ-আল ইসলাম (চেয়ারম্যান, মেম্বার অ্যাডভাইজরি কমিটি, এসিসিএ বাংলাদেশ; এমডি ও সিইও, সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড)

গত ১০ বছরে আমরা সারাদেশে ৪৭ হাজার কিলোমিটার ফাইবার অপটিক বসিয়েছি। এখন যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক কিলোমিটারের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগটি পেয়ে যায়। সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক লাইন রয়েছে। গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ নেই। সরকারের সামনে একটি প্রজেক্ট রয়েছে যার মাধ্যমে সকল সরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেটের আওতায় আসবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ডিজিটাল বিভক্তি দূর করা সম্ভব হবে। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে স্বল্পমূল্যে ডিজিটাল ডিভাইস সরবরাহ করা হবে। গ্লোবাল আইসিটি ইনডেক্সে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। কোভিড-১৯ এর কারণে আমাদের ডিজিটাল উন্নয়ন নতুন করে গতি পেয়েছে। এটি আমাদের অবস্থানকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে।

‘কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো খুব দ্রুত বদলাচ্ছে’
আবু দাউদ খান (এমডি এবং সিইও, এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড)

কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। একারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিখে আসা দক্ষতাগুলো আর কাজে লাগছে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগকর্তা এই তিনজনেরই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যকার যে ফারাক তা দূর করতে না পারলেও অন্তত আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করতে পারি। বিশ্বসূচকে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ পিছিয়ে আছে। এ থেকে বোঝা যায় আমাদের শিক্ষার মানের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়গুলো রয়েছে তা যদি সঠিকভাবে শেখানো হয় তবে চাকুরিপ্রাপ্তির গুনাবলীর অনেকটাই শিক্ষার্থীদের আয়ত্তে চলে আসে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো গৎবাঁধা পড়াশোনা এবং নোট ফলো করে সার্টিফিকেট অর্জনের প্রবণতা রয়েছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে তারা হিমশিম খাচ্ছে।
আমরা যদি আমাদের শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে পারি তবে বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই যোগ্য প্রার্থী বের হয়ে আসবে। শিক্ষাগ্রহণ করার শিক্ষাটা যদি আয়ত্ত করে আসতে পারে তবে সেটাই যথেষ্ট।

‘ই-লার্নিং ক্যাম্পাসের ধারণা বাস্তবায়নে সাফল্য এসেছে’
এম. এ. কালাম (সিইও এবং চেয়ারম্যান, এলসিবিএস ঢাকা লিমিটেড)

কোভিড-১৯ এর কারণে মার্চ থেকে আমরা সকল ক্লাস পিছিয়ে দিতে বাধ্য হই। সরাসরি ক্লাস থেকে ই-লার্নিংয়ে যাওয়ার জন্য আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু থেমে থাকারও কোনো পথ ছিল না। গত চার মাসে আমাদের বিদ্যমান কাঠামোকে কাজে লাগিয়েই ক্যাম্পাসকে পুরোপুরি ই-লার্নিং ক্যাম্পাসে রূপান্তরিত করতে পেরেছি।
ই-লার্নিং ক্যাম্পাসের ধারণা এখন বাস্তব। শুরুতে আমাদের বেশ কিছু সমস্যা হয়েছিল। অ্যাপস ও সরঞ্জাম পর্যাপ্ত ছিল না, ই-ক্লাসরুম ও গ্রুপস্টাডির ব্যবস্থা ছিল না। লাইভ ক্লাস পরিচালনা করতে পারলেও পুরোপুরি লার্নিং ব্যবস্থাপনা সম্ভব ছিল না। লোকাল এবং গ্লোবাল সহযোগিতায় আমরা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।

‘শিক্ষাগ্রহণের পর তা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ দরকার’
ফয়সাল বিন মালেক (পরিচালক, এডবেস প্রফেশনালস)

আমরা যখন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করতে যাই তখন তারা জ্ঞানটা স্থায়ীভাবে আহরণ না করে সাময়িকভাবে নিতে চাচ্ছে। অর্থাৎ একটা ক্ষণস্থায়ী ব্যাপারকেই ভেতরে ধারণ করছে। পরে এটা প্রয়োগ করতে হবে কিনা সেটা নিয়ে ভাবছে না। এটা হয়ত দরকার পড়ছে না আপাতত, কিন্তু পরবর্তীতে যখন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে তখন তারা ব্যর্থ হচ্ছে।
আত্মবিশ্বাস না থাকার কারণে তাদের মধ্যে ভীতিও আসছে। আমি শিক্ষার্থীদের দেখি তারা শুধু শিখেই যাচ্ছে কিন্তু কোথাও প্রয়োগ করতে পারছে না। কিন্তু এসিসিএর ক্ষেত্রে আমি নিজে একজন শিক্ষক এবং উদ্যোক্তা হিসেবে দেখেছি তারা সুন্দর কাজ করছে। এসিসিএ শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সম্পন্ন করে চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

‘এসিসিএর গাইডলাইন নিয়ে পিএসবি কাজ করে যাচ্ছে’
মহিউদ্দিন সুমন (সিইও, প্রফেশনাল স্কুল অব বিজনেস, চট্টগ্রাম)

তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের জনগণ হিসেবে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদেরকে সীমিত ব্যবহারযোগ্য সম্পদ ব্যবহার করতে হয়। তবে সেটা মেনে নিয়েই কাজ করতে হবে। মহামারি শুরুর পর থেকে এসিসিএ বাংলাদেশের গাইডলাইন নিয়ে পিএসবি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে জানিয়েছি। এসিসিএর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার সানওয়ে ইউনিভার্সিটির সাথে যোগাযোগ করে তাদের প্লাটফর্ম ব্যবহার করে কার্যক্রম অব্যহত রেখেছি। আশা করছি আমাদের কার্যক্রম বৈশ্বিক মাপকাঠিতেও সমান হবে।

‘কোভিড-পরবর্তী সময়ের জন্য শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা জরুরি’
মো. এহসানুল হক বাশার (কান্ট্রি ম্যানেজার, এসিসিএ বাংলাদেশ)

কোভিড-১৯ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে বর্তমানে মুখোমুখি পাঠদান ব্যহত হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, এর মধ্যেও সরকার টেলিভিশন মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অনলাইনে তাদের পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেছে। এটি নি:সন্দেহে আশাব্যঞ্জক এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।
তবে এটি ডিজিটাল মাধ্যমে অব্যহত থাকবে কি না কিংবা ভবিষ্যতে এরকম পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিৎ সে বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা এবং পরিকল্পনা অতিজরুরি। আর তাই শিক্ষার ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে দ্য অ্যাসোসিয়েশন অব চার্টার্ড সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (এসিসিএ) বাংলাদেশ আয়োজন করেছে ফিউচার অব এডুকেশন বিষয়ক আজকের এই অনলাইন আলোচনা সভা।

/জেএইচ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ