যেসব কারণে ঈদে বাড়ি যাচ্ছে না মানুষ

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১১:১০, জুলাই ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৬, জুলাই ৩০, ২০২০

যাত্রীর চাপ নেই বাস টার্মিনালেঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন নাঈম। প্রতিবছর কোরবানির ঈদে তিনি তার গ্রামের বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদী যান। এবার তিনি বাড়ি যাচ্ছেন না। কেন যাচ্ছেন না প্রশ্নে নাঈম জানান, হাতে টাকা নেই। অফিস থেকে এবার তাদের বোনাস দেয়নি। বেতনও পেয়েছেন অর্ধেক। এছাড়া বাড়ি গেলে চাকরি হারানোর ভয় আছে। অপরদিকে বাড়িতে যাতায়াত করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া বাড়ি যেতে আগের চেয়ে খরচও বেশি হবে। কারণ, বিগত বছরের তুলনায় এবার বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
শুধু নাঈম একাই নয়, তিনি জানান তার কলিগ সিরাজুল ইসলামও এবার বাড়ি যাচ্ছন না। বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায়, নাঈম ও সিরাজুলের মতো শত শত মানুষ এবার ঈদ করতে বাড়ি যাবেন না। যাত্রীবাহী বাসগুলোর দিকে তাকালেও সেই চিত্রই চোখে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘মানুষের হাতে টাকা নেই। যে কারণে অনেকেই কোরবানির ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তবে এবার ছুটিও কম। এছাড়া, বর্তমান পেক্ষাপটে অফিসগুলোও তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়তি ছুটি দিতে চাচ্ছে না। আর চাকরি হারানোর ভয়ে কর্মকর্তা- কর্মচারীরাও বাড়তি ছুটি নিতে চাচ্ছেন না। অর্থাৎ আর্থিক সংকট ছাড়াও চাকরি হারানোর শঙ্কা থেকে অনেকেই বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকছেন। এছাড়া, অনেকেই দীর্ঘদিন পর বাড়ি থেকে সবেমাত্র এসেছেন।’ তিনি উল্লেখ করেন, কোরবানি মুসলমানদের বড় উৎসব হলেও যাদের হাতে টাকা নেই, তারা এই মুহূর্তে গ্রামের বাড়িতে যেতে চাচ্ছেন না। কারণ, অনেকেই এবার বোনাস পাননি। অনেক প্রতিষ্ঠানই তার কর্মীদের পুরো বেতনও দিতে পারছে না। অর্থাৎ আর্থিক সংকটের কারণে অনেকেই এবার কোরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। ফলে যারা এবার কোরবানি দিচ্ছেন না, তারা হয়তো বাড়িতেও যাচ্ছেন না।

গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বন্যার কারণেও অনেকে অল্প দিনের এই ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন না। কেননা, আরিচা ও মাওয়াতে ফেরি বন্ধ। ফলে নদী পার হয়ে যেসব জেলায় যেতে হয়, তারা এবার যাচ্ছেন না। অনেকের বাড়ি পানিতে তলিয়ে আছে। সেখানে গিয়ে থাকার মতো অবস্থা নেই। ফলে বিগত যেকোনও সময়ের চেয়ে মানুষ এবারের ঈদে বাড়িমুখী হচ্ছে না।

এদিকে পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, এবারের ঈদযাত্রায় গণপরিবহনের সংখ্যা কমিয়ে মাত্র ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এরপরও যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। বাস মালিকরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখেই গণপরিবহন পরিচালনা করা হচ্ছে। আর কাউন্টারের পাশাপাশি অনলাইনেও অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করার সুযোগ আছে। ফলে অন্যান্য বছরের ঈদে যাত্রীর তুলনায় গণপরিবহনের সংকট দেখা দিলেও এই ঈদে সেই আশঙ্কা করছেন না তারা।

অর্থাৎ পরিবহন মালিকদের এমন আয়োজনের পরেও যাত্রী সংকটে ভুগছে পরিবহনগুলো। শুধু তাই নয়, কাউন্টারগুলোতে নেই কোনও ঈদের আমেজ। অগ্রিম টিকিট নিয়ে বসে থাকলেও যাত্রীদের দেখা নেই। অর্থনীতিবিদদের মতো পরিবহন মালিকরাও বলছেন, করোনা, হাতে টাকা না থাকা ও বন্যা পরিস্থিতি এই সংকটের মূল কারণ।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘আর্থিক দৈন্যতা কাটিয়ে মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। গ্রামে গিয়ে ঈদ উৎসব করার মতো টাকা হয়তো অনেকের হাতে নেই। এর সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি মাথায় নিয়ে কেউ বাড়ি যেতে চাচ্ছে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, বাড়িতে গেলেই খরচ। এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। বাড়তি খরচ মেটাতে পারছেন না অনেকেই। অনেকে সঞ্চয় ঠিক রাখার চিন্তাও করছেন। ফলে কোরবানির উৎসব অনেকেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘অনেকেরই আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। যারা বেতন পাননি, বোনাস পাননি—তারা বাড়ি যাচ্ছেন না।’

প্রসঙ্গত, এবারের কোরবানির ঈদে সাধারণ ছুটি তিন দিন। এই ছুটিকালীন তিনদিন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা যাতে ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে না যান, সরকারের পক্ষ থেকেও সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গার্মেন্টস কারখানাগুলো থেকেও এ ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত রোজার ঈদের মতো এবারের কোরবানির ঈদেও যেন শ্রমিকরা বাড়িতে না যান।

বিজিএমইএ’র এই নির্দেশনার পর গার্মেন্টস মালিকরাও তাদের কারখানায় শ্রমিকদের আবশ্যিকভাবে কর্মরত এলাকা ত্যাগ না করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

ফলে ধারণা করা যাচ্ছে, তিন দিনের জন্য অনেকেই অতিরিক্ত খরচ করে গ্রামের বাড়িতে যেতে চাইবেন না। তবে পরিবহন বন্ধ থাকায় গত রমজানের ঈদে নগরবাসীর অনেকেই গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেননি। একারণে ধারণা করা হয়েছিল, এবারের কোরবানির ঈদে গণপরিবহনে হয়তো বাড়তি চাপ পড়তে পারে। তাছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে ট্রেনের সংখ্যাও বাড়ানো হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সড়কে চাপ বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ঈদযাত্রায় যাত্রী পাচ্ছেন না বাস মালিকরা।

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ