বিকল্প আবাসন খোঁজা কি চিকিৎসকের কাজ?

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২৩:১০, আগস্ট ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৪, আগস্ট ০৪, ২০২০

করোনা পরীক্ষাকরোনা রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শুরু থেকেই তাদের পরিবার থেকে আলাদা থাকার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের নিজেদের সুরক্ষাসহ পরিবারের সদস্যদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য। এছাড়াও তারা যেন চিকিৎসা কাজে শতভাগ মনোযোগ দিতে পারেন, সে কারণেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিনা খরচে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে সরকার। কিন্তু হঠাৎ করেই এ ব্যবস্থা বাতিল করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় যেমন ব্যাঘাত ঘটবে, তেমনি চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তারসহ অন্যরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের করোনার ঝুঁকি বেড়ে গেলো।

জানা গেছে, করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নতুন নিয়ম চালু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত ২৯ জুলাই সেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে জানানো হয়, ‘কোভিড ১৯ চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা সাধারণভাবে একাধারে ১৫ দিনের বেশি দায়িত্ব পালন করবেন না। প্রতিমাসে ১৫ দিন দায়িত্ব পালন শেষে পরবর্তী ১৫ দিন তারা সঙ্গনিরোধ ছুটিতে থাকবেন।’

কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া একাধিক চিকিৎসক নতুন নিয়ম সম্পর্কে বলছেন, গত ঈদের দিন নোটিশ দিয়ে বলা হলো— ‘বের হয়ে যাও। নিজে নিজে বাসা ঠিক করে নাও। ১৫ দিনের ভাড়া আমরা দেবো।’ একটা রাষ্ট্র কীভাবে তারই কর্মকর্তাদের ওপর এতটা নির্দয় হয়!

নতুন নিয়মের ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করে করোনা চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, ১৫ দিন ডিউটি করার পর বিকল্প আবাসন খোঁজা চিকিৎসকদের কাজ নয়। তাছাড়া কেউ যদি নিজ বাসায় থাকতে চান, তাহলে তো তার পুরো পরিবার ঝুঁকিতে পড়বে। সরকারকে নতুন এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা দরকার বলেও মন্তব্য করেছেন চিকিৎসক নেতা, সংগঠন এবং সাধারণ চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা হয়, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ১৫ দিন কাজের সময়ে পৃথক অবস্থানের জন্য বিশেষ ভাতা ও খাবারসহ আবাসনের সুবিধা পাবেন। আর ঢাকা মহানগরের বাইরে সব জেলা ও উপজেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করা হবে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা মহামারির শুরু থেকেই চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি সুরক্ষিত না থাকেন তাহলে অন্য সবার সুরক্ষা ঝুঁকিতে পড়বে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর হিসাব অনুযায়ী, সোমবার (৩ আগস্ট) পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন মোট সাত হাজার ১২৩ জন। এরমধ্যে চিকিৎসক দুই হাজার ৪৭৫ জন, নার্স এক হাজার ৮০৭ জন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দুই হাজার ৮৪১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৬৯ জন চিকিৎসক, ১১ জন নার্স এবং সাত জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।

চিকিৎসকরা বলছেন, কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকরা কাজ করে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত পেশাজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসকদের। তারপরও কী করে চিকিৎসকদের আরও ঝুঁকির ভেতরে ফেলা হলো, এটা কাদের পরামর্শে এবং কীসের স্বার্থে করা হলো— সেটা খুঁজে বের করা দরকার।

চিকিৎসক নেতা ও কোভিড-১৯ বিষয়ক অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসকরা অনেকেই একসঙ্গে থাকে মেসের মতো করে। তারপরও যাদের নিজেদের বাসা রয়েছে সেগুলোও এমন নয় যে, একেবারেই আইসোলেশনে গিয়ে তারা থাকতে পারবেন।’

চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা বাতিল করার বিষয়টি এভাবে হঠাৎ করে কেন করা হলো প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আরও চিন্তা ভাবনার দরকার ছিল। আলোচনা-পরামর্শ করার দরকার ছিল সবার সঙ্গে। সরকারের আর্থিক সাশ্রয়ের অজুহাত তুলে কারা এই পরামর্শ দিলো সেটাও বের করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘আর এই সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসকসহ অন্যদের পরিবার যে ঝুঁকিতে পড়ে গেলো— এই দায়িত্বটা কে নেবে।’

অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘যতদূর শুনেছি, হোটেলগুলোর ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের মতো দেওয়া হচ্ছিল। তাতে করে আর্থিক ব্যয় অনেক বেশি। কিন্তু এই মহামারির সময়ে কেন তাদের (হোটেল মালিক) সঙ্গে সমঝোতা করা যাবে না, সে প্রশ্নও আমি করতে চাই। আমি মনে করি, যারা সরকারকে এ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বুঝিয়েছেন তারা হয়তো মনে করেন, চিকিৎসকরা হোটেলে খুব আয়েশি জীবনযাপন করছেন, এটা একেবারেই তাদের ভুল ধারণা।’

চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে ‘জরুরি বিশেষ সভা’ হবে। সেখানেই আমরা আমাদের পদক্ষেপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবো।’’

তবে সংগঠনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, এটা অবশ্যই কোনও ভালো উদ্যোগ হয়নি। এমনিতেই পেশাজীবীদের মধ্যে চিকিৎসকদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। আর এ সিদ্ধান্তের ফলে কেবল চিকিৎসক নয়, তাদের পরিবারগুলোকেও ঝুঁকির ভেতরে ফেলা হলো।

এরকম মহামারির ভেতরে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা চিকিৎসকদের কাজ কিনা, প্রশ্ন করে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সসিবিলিটি (এফডিএসআর)-এর মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এটা খুবই অবমাননাকর, অপমানজনক এবং এটা সবচেয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিকল্প আবাসন কীভাবে করবেন চিকিৎসকরা।’

ডা. মামুন বলেন, ‘কোভিড হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তারা মানসিক উৎকণ্ঠার ভেতরে থাকেন। তার ওপর মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত তাদের আরও মানসিক এবং শারীরিক ঝুঁকিতে ফেলবে। আর এ সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসকদের প্রতি চরম অবহেলা করা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা ও পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে।’

‘দুই হাজার টাকার বিনিময়ে একজন চিকিৎসক আবাসন ব্যবস্থা খুঁজবেন না। বরং এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের করা উচিত। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে’, বলেন ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যিনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, সরকারি কর্মচারী বিধি অনুযায়ী তাদের ভাতা দেওয়া হবে।’

কিন্তু চিকিৎসকসহ অন্য কর্মীরা বাসায় থাকলে পরিবারের সদস্যরা ঝুঁকিতে পড়বেন, এ প্রশ্নে সচিব বলেন, ‘এটা না করা হলে তারা বলতেন, বাসাতেই সুবিধা। কারণ, মানুষ বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছে।’ আর চিকিৎসকদের বাসা নিশ্চয়ই এক রুমের নয় জানিয়ে আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ইচ্ছে করলেই তারা মাস্ক পরে আইসোলেটেড থাকতে পারেন। তারতো লক্ষণ নেই। আর ১৫ দিন বাসায় থাকার কথা বলা হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই এখন করোনার পরীক্ষা করিয়ে থাকতে পারবেন। এখন তো একদিনেই ফলাফল পাওয়া যায়। টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন।’

 আরও পড়ুন:

করোনা: চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ১৯ হোটেল

 

/এপিএইচ/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ