করোনা আক্রান্তদের অভিজ্ঞতার ভালো-মন্দ

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২১:৫৬, আগস্ট ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩৮, আগস্ট ০৯, ২০২০

করোনা ভাইরাসগত তিন মাসে একদিনের জন্যও বের হননি নিবেদিতা। স্বামী-সন্তান নিয়ে বাসাতেই অবস্থান করেছেন। রোজ নিয়ম করে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করেছেন। এমনকি জানালার গ্রিল ব্লিচিং দিয়ে মোছার কাজটিও নিজ হাতে করেছেন। তিন মাসের সাধারণ ছুটি শেষ করে স্বামী অফিসে গেলে বাইরে থেকে এসে আইসোলেশনে থেকেছেন। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। স্বামী-স্ত্রী দুজনই আক্রান্ত হয়েছেন কোভিড-১৯-এ।

সুস্থ হয়ে আক্রান্ত সময়ের অভিজ্ঞতা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন তিনি। প্রথম থেকে জ্বর ও সামান্য গলা ব্যথা থাকলেও অন্য কোনও উপসর্গ ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শে বাসাতেই ছিলেন। ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন। এখনও কিছুটা ক্লান্তি আছে। নিবেদিতার বন্ধুরা প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করেন, এত সতর্ক থেকে তাহলে লাভ কী হলো?

গত মার্চে কোভিডের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে রায়হান বাসার বাইরে তেমন একটি যাননি। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে গেলেও যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করেছেন। বাসায় ফিরে পোশাক পাল্টানো, হাত-মুখ ধুয়ে গোসল করে নেওয়ার কাজগুলো নিয়ম মেনে করেছেন। তারপরও সপরিবার আক্রান্ত হয়েছে। যে উপসর্গগুলোর কথা শুরু থেকে শুনে আসছিলেন, তার কোনোটি না থাকার পরও তার পরিবারের সবাই করোনা পজিটিভ।

দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। পাঁচ মাস পার করার পরে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক চলাফেরা দিকে ঝুঁকেছে মানুষ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে মানুষের কাছে তথ্য ছিল না তাই ভয় পেয়েছে। এখন লম্বা একটা সময় পার করে পরিচিত আক্রান্ত মানুষজনের নানা অভিজ্ঞতা শেয়ার করার কারণে এক ধরনের স্বাভাবিকত্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। ভয় কাটতে শুরু করেছে নিজেকে বুঝিয়ে— তাকে কাজে ফিরতে হবে। আক্রান্তদের অভিজ্ঞতা শুনে মানুষের ভয় কাটছে ঠিকই, কিন্তু এখনও মহামারি পরিস্থিতিতে আছি আমরা। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে যে আক্রান্ত হবে, এটা অনেকে ভুলে যেতে বসেছে। ফলে অভিজ্ঞতা শোনার ভালো-মন্দ উভয় দিকই বিরাজমান।

জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক চিকিৎসকরা বলছেন, উপসর্গ না থাকার পরও কোভিড পজিটিভ হওয়া, সতর্ক থেকেও শেষ রক্ষা না হওয়ার মতো ঘটনাগুলো তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তাগাদা দিচ্ছে। এ সময় সতর্কতামূলক প্রচারণাগুলো আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। অনেকে আক্রান্ত হলেও ভুগছে না— এটা জেনে স্বাস্থ্যবিধি মানা ছেড়ে দিলে বিপদ বাড়বে।

রবিবার (৯ আগস্ট) দুপুর আড়াইটায় কোভিড-১৯ সম্পর্কিত নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনের সর্বশেষ তথ্য মতে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মারা গেছেন ৩৪ জন। এ নিয়ে করোনায় এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৯৯ জন মারা গেলেন। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছেন আরও দুই হাজার ৪৮৭ জন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত হলেন দুই লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ জন। ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৭৬৬ জন এবং এখন পর্যন্ত এক লাখ ৪৮ হাজার ৩৭০ জন সুস্থ হয়েছেন।

এত আক্রান্ত ও মৃত্যুর মাঝেও কীভাবে মানুষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ভেবে স্বাস্থ্যবিধিটুকুও মানতে চাচ্ছে না প্রশ্নে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যতদিন করোনা অজানা ছিল, মানুষ ততদিন ভয় পেয়েছে। এখন আশেপাশে পরিচিত আক্রান্তদের দেখে এবং অভিজ্ঞতা শুনে তার ভয় কাটতে শুরু করেছে। তাকে রোজগারের জন্য বের হতেই হবে। ফলে ঘর থেকে বের হওয়ার যুক্তিও দরকার। সব মিলিয়ে সে তার মধ্যে বাইরের পৃথিবীর স্বাভাবিক হয়ে আসছে এমন অনুভূতির জন্ম দিতে চায়। ‘আক্রান্তরা সতর্ক ছিলেন, কিন্তু লাভ হয়নি। আক্রান্তদের উপসর্গ ছিল না।’—এসব বলে সে আসলে স্বাভাবিক জীবনে অর্থাৎ মহামারির আগের জীবনে ফিরতে চায়।’

এই ফিরতে চাওয়া স্বাভাবিক এবং এ সময় কর্তৃপক্ষের কাজ আরও বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহামারি কাল দীর্ঘ হলে একটা পর্যায়ে মানুষ এমন আচরণ করতে চাইবে। কিন্তু এ সময়েই মূল চ্যালেঞ্জ। মানুষ যদি স্বাভাবিকতার অনুভূতিতে ভুলে যায় যে, এখনও মহামারি পরবর্তী সময়ে আমরা যেতে পারিনি, তাহলে বিপদ বাড়বে। এ সময় বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইছে না। এসব যেন মানুষ মেনে চলে সেটা নিশ্চিত করাটাই চ্যালেঞ্জ।’

/আইএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ