কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিনহার মা: এ ধরনের ঘটনা যেন আর না হয়

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৬:৪৫, আগস্ট ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৮, আগস্ট ১০, ২০২০

সংবাদ সম্মেলনে সিনহার মা‘আমি সিনহার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। সেনাপ্রধান, নৌবাহিনী প্রধান খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারা (ন্যায় বিচারের) আশ্বাস দিয়েছেন। এই যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডটি ঘটলো, এ ধরনের ঘটনা যেন আর না হয়। প্রত্যেক মায়ের প্রতিনিধি হয়ে বলবো, এই ধরনের ঘটনা যেন আর না হয়। সবাই যেন সচেতন থাকেন।’ সোমবার (১০ আগস্ট) উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের ৭৭ নম্বর নিজ বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খানের মা নাসিমা আক্তার।

এদিন নাসিমা আক্তারের সঙ্গে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) পক্ষ থেকে সংগঠনের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) খন্দকার নুরুল আফসার ও সেক্রেটারি জেনারেল লে. কর্নেল (অব.) এ এম মোশারফ হোসেনসহ সাবেক সেনা কর্মকর্তারা সাক্ষাৎ করেন।

পরে সংবাদ সম্মেলনে সিনহার মা বলেন, ‘আমার ছেলে পজিটিভ ছিল। সব সময় বি পজিটিভ। সাংবাদিকদের লেখা আমি পড়ছি। আমার হৃদয়টা ছিঁড়ে যাচ্ছে। দেশের সুন্দর পরিবেশ আপনারাই আনবেন। আমরাই আনবো। আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা সবার সহযোগিতা চাই।’

নাসিমা আক্তার বলেন, ‘সিনহা যে মেজর সে পরিচয় কখনও দিতে চাইতো না। তার যে ব্যবহার তা দিয়েই সবকিছু করার চেষ্টা করতো। ওর কাজগুলো আমি এপ্রিসিয়েট করি। তবে আমি বলতাম, বাবা তুমি যে মেজর তা তুমি পরিচয় দাও না কেন? সিনহা বলতো, একটা মানুষের যে মানবিক গুণ থাকে তা দিয়েই যদি মানুষ মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে, এরচেয়ে আর কী বড় হতে পারে। মানুষের হৃদয়ের মধ্যে থাকবো। কাজ করবো। মানুষের জন্য কাজ করবো। সেটা বলতে হবে কেন? সিনহা আসলে বলায় নয় কর্মে বিশ্বাসী ছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে দেশকে নিয়ে অনেক ভাবতো। ছেলে আমাকে বলতো, আমরা যদি দেশে ভালো কিছু রেখে যাই তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেটা অনুসরণ করবে। আমার ছেলের প্রত্যেকটি কাজে আমার পূর্ণ সমর্থন ছিল। ভেতরে ভেতরে আমি খুবই গর্ববোধ করতাম। ও শুধু কাজ করতেই চাইতো। আত্মীয়-স্বজন বলতো ও কী কাজ করে? ওর কি কোনও টাকা পয়সা আসে না? কিন্তু সিনহা আসলে সবসময় ক্রিয়েটিভ কাজ করতে চাইতো। সবসময় সারপ্রাইজ দিতে চাইতো কাজের মাধ্যমে। ও বলতো, আমি আমার মনের খোরাকের জন্য কাজ করি, যাতে মানুষ উপকৃত হয়। একটা ডকুমেন্টারি করছি, এখনও বলার মতো কিছু হয়নি, যখন হবে তখন বলবো। আমি শতভাগ আস্থা নিয়ে বসে আছি, আমার ছেলে কাজ করতেছে। কাজ শেষে ফিরবে। কিন্তু ওর আর ফেরা হলো না।’

ঘটনার রাতের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সিনহা খুব স্পিডে গাড়ি চালাতো। কাজ শেষে সাধারণত বাসায় ফিরতো। সেদিন বাসাতে ফিরছিল না, ফোনও ধরছিল না, ব্যাকও করছিল না। রাত ১২টা আনুমানিক। এক ভদ্রলোক ফোন করে বললেন, ‘সিনহা আপনার কী হয়, কী করে। কয় ছেলেমেয়ে?’ উত্তর দিয়ে জানতে চাইলাম, ‘এত প্রশ্ন করছেন কেন? আপনি কে?’ তখন তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি টেকনাফ থানার ওসি।’ ভাবলাম ছেলে তো স্পিডে গাড়ি চালায়, আবার কিছু হলো কিনা। বললাম, ‘আমার ছেলে তো ফোন ধরছে না, ওকে একটু দেন। ফোনটা বাজতেছে কিন্তু ধরছে না।’ ওসি বলে, ‘হ্যাঁ, একটু দূরেই আছে। দেওয়া যাবে’, বলেই রেখে দেন। কিন্তু এরপর বারবার ফোন দেই, আর কেউই ফোন ধরে না।’’

সিনহার মা বলেন, ‘‘দুই কোর্সমেটের নাম্বার দিয়েছিল সিনহা। ফোন দিলাম মেজর মোহসিনকে। জানতে চাইলাম সিনহার খবর। টেকনাফ থানার ওসির কথা জানালাম। পরে মোহসিন বললো, ‘টেনশন কইরেন না। সিনহা ঠিক আছে। আমাদের আরেক কোর্সমেট আছে, তাকে খোঁজ নিতে বলেছি।’ পরদিন ১০টা ১১টা বাজে। বাসায় পুলিশ আসে। উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ। তারা মেজর সিনহার বাসা কিনা জানতে চেয়ে খোঁজ-খবর নেয়। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিনা, দেশের বাড়ি কোথায় জানতে চায়। বলি রাজনীতিতে জড়িত নয় শতভাগ নিশ্চিত। ওরা ভালো ব্যবহার করে চলে যায়। তারাও কিছু জানায়নি।’’

সংবাদ সম্মেলনে নিহত মেজর (অব.) সিনহার বড় বোন ও হত্যা মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়া বলেন, ‘সিনহাকে আমি বলতাম তুমি মানুষের হৃদয়ের রাজপুত্র (প্রিন্স অব পিপলস হার্ট)। এটা সে প্রমাণ করেছে, তার ভালো ব্যবহার আর গুণাবলি দিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে বিচার হবে। আমাদের একটাই দাবি, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে যে দ্রুতই বিচারটি হয়। এবং এই বিচার যাতে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।’

/এনএল/এমআর/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ