সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বন্যাকবলিত এলাকায় স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশের নিবিড় সহায়তা

Send
সাদ্দিফ অভি, সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে
প্রকাশিত : ১৪:৩৮, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৭, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ জেলা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ। এর ৯টি উপজেলার মধ্যে পাঁচটির বেশিরভাগ অংশই যমুনা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয় জেলায়। এবারের বন্যাকে স্থায়ীত্ব ও উচ্চতার দিক থেকে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে দেখছে সরকার।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, প্রথম ধাপে ২৮ জুন যমুনার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। ৬ জুলাই পর্যন্ত বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে বন্যার পানি। মোট ৯ দিন পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। দ্বিতীয় ধাপে ১৩ জুলাই আবারও বিপদসীমা অতিক্রম করে পানি। ১৭ জুলাই ১৪ দশমিক ৩৬ মিটার পর্যন্ত তা অবস্থান করে। এরপর ৬ আগস্ট পর্যন্ত বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ কারণে ২৫ দিন পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। দুই দফায় মোট ৩৪ দিন বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এ বছর বন্যার শুরুর দিকেই স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশের সহযোগিতায় সিরাজগঞ্জের এনজিও মানব মুক্তি সংস্থা প্রথম পর্যায়ে বেলকুচি উপজেলার বড়ধুল ও বেলকুচি সদর ইউনিয়ন এবং চৌহালী উপজেলার স্থল, ঘোড়জান ও সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের মোট ১ হাজার ২৭টি পরিবারের মধ্যে ন্যাশনাল ওয়াশ ক্লাস্টারের নির্ধারিত হাইজিন প্যাকেজ এবং নগদ অর্থ বিতরণ করে। এছাড়া একটি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠা ৩২ পরিবারের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, নগদ অর্থ, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা, হাইজিন কিট, গবাদি পশুর খাবার, স্থানান্তরযোগ্য চুলা এবং ঈদ উপলক্ষে উন্নত খাবার নিশ্চিত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় মানব মুক্তি সংস্থার মাধ্যমে টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার ভাররা এবং সেলিমাবাদ ইউনিয়নের ৭০০ পরিবারকে ন্যাশনাল ওয়াশ ক্লাস্টারের নির্ধারিত হাইজিন প্যাকেজ ও নগদ অর্থ সহায়তা দিয়েছে স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ। এছাড়া একই এলাকার ৪৫০টি পরিবারের মধ্যে গোখাদ্য বিতরণ, ২০০ পরিবারকে গাছের চারা ও জৈব সার প্রদান ও ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত করে দেওয়া হয়।

টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর উপজেলার গাবসারা ও অর্জুনা ইউনিয়নের মোট ৮০০ পরিবারের মধ্যে ন্যাশনাল ওয়াশ ক্লাস্টারের নির্ধারিত হাইজিন প্যাকেজ ও নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণ করেছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি) এবং স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ। একই এলাকায় ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত, ৮টি নলকূপ স্থাপন, ৬টি স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন স্থাপন এবং কোভিড-১৯ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাইকিং করা হয়।

স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কথায়, ‘দুর্যোগকবলিত মানুষের মধ্যে দ্রুততম সময়ে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা বদ্ধপরিকর। এরই ধারাবাহিকতায় স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ যেকোনও দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের সদস্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়নের চুক্তি সম্পন্ন করি। চুক্তি সম্পাদনের প্রথম দিনেই স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে তহবিল প্রদান করে এবং ফলস্বরূপ দুর্যোগকবলিত মানুষের মধ্যে দ্রুততম সময়ে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়। এছাড়া স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ সদস্য সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। যেসব দুর্যোগকবলিত এলাকায় অন্য কোনও দাতা সংস্থা সহায়তা প্রদান করেনি, এমন এলাকায় মানবিক সহায়তা প্রদান করে থাকে স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ।’

সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী ও বেলকুচি উপজেলায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আষাঢ়ের শুরুতেই নদীর পানি বাড়তে থাকে। বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় দেখা দেয় নদীভাঙন। তাতে বিলীন হয়ে যায় থাকার জায়গাটুকু। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও স্থানীয়দের স্বাস্থ্য সচেতনতা শেখাতে কাজ করছে মানব মুক্তি সংস্থা। ৩৬ বছর ধরে যমুনা নদীতীরবর্তী সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও পাবনা জেলার বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের ভাঙনকবলিত এলাকায় কাজ করছে এই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। তারা অসহায় জনগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।

বেলকুচি উপজেলার বারপাখিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করা নাজমা বলেন, ‘আমরা সহায়তার টাকা দিয়া চাইল (চাল) কিনসি, পোলাপাইনের অসুখ-বিসুখ ছিল, ওষুধ কিনসি। তারা পায়খানা (শৌচাগার) ঠিক কইরা দিসে, টিউবওয়েল ঠিক কইরা দিসে। এগুলা না দিলে তো আমরা চলতে পারতাম না। আমাদের অসহায় অবস্থায় তারা অনেক সহযোগিতা করসে।’

নাজমা বলতে থাকেন, ‘এখন আমাদের দরকার শুধু একটা উঁচু জমি, যেখানে আমরা ঘর কইরা থাকতে পারি। আমাদের যেন আর পানি আসলেই (বন্যা) অন্যখানে যাওয়ার কথা ভাবতে না হয়। এক জায়গায় থেকে গিয়া আরেক জায়গায় ঘর তোলার পেছনে আমাদের আয় সব চইলা যায়। থাকুম ক্যামনে? বাচুম ক্যামনে? এখানে আমরা এখন ভালোই আছি। এখান থেকে সরায় দিলে আমাদের দুর্দিন আবার শুরু হবে। জমিও নাই, ট্যাকা-পয়সাও নাই। এই জায়গা থেকে সরার লাইগ্যা আট দিন সময় দিসে। কিন্তু জায়গা তো পাই না থাকার কোথাও।’ 

মানব মুক্তি সংস্থার মানবিক সহায়তার কথা তুলে ধরে একই গ্রামের আকলিমা বলেন, ‘ওনারা আমাদের গরুর খাবার দিসে, টিউবওয়েল পাকা কইরা দিসে, বালতি, মগ, ১০টা সাবান, পাঁচ প্যাকেট গুঁড়া সাবান, স্যানিটারি প্যাড, তিন হাজার টাকা, ব্লিচিং পাউডার ও মাস্ক পাইসি। আমরা সবাই কিছু না কিছু সহায়তা পাইসি। এখন আল্লাহ আমাদের ভালোই রাখসে।’

তবে আকলিমা যোগ করেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের দরকার মাটি। মাটি দিয়ে আমরা টয়লেট উঁচু করতাম। তাছাড়া আরও টিউবওয়েল হইলে ভালো হইত। কামাই কইরা পেট চালামু নাকি প্রয়োজন মিটামু? এখন যে টয়লেট আছে কোনোরকম চলা যায় আর কী।’

টাঙ্গাইলের নাগরপুরের মারমা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও দুর্দশা কমেনি। বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়িটয়লেটনলকূপ মেরামত করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তবে করোনা ও বন্যার কারণে আয় না থাকায় পর্যাপ্ত অর্থ কিংবা মেরামতের সামগ্রী কেনার সামর্থ্য নেই কারও। বন্যাকবলিত এলাকার রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, এগুলোও মেরামত করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়– মানব মুক্তি সংস্থা মানবিক কাজের ধারাবাহিকতায় করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মৌলিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে হাইজিন সামগ্রীর প্যাকেজ, নগদ অর্থ, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও নারীদের জন্য আলাদা বাথরুমের (স্যানিটেশন ও ঋতুকালীন সুবিধাসহ) ব্যবস্থা করে থাকে। এছাড়া গো-খাদ্য, রান্নার চুলা, ঈদের আনন্দ সমভাগের লক্ষ্যে কোরবানির পশু এবং বন্যার সময় পানিবাহিত যেসব রোগ-বালাইয়ের আগমন ঘটে তা থেকে নিস্তার পেতে ধারাবাহিকভাবে অভিজ্ঞ মেডিক্যাল টিমের মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ দেয় সংস্থাটি।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/জেএইচ/

লাইভ

টপ