করোনাকালে পূজা আছে, উৎসব নেই

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ২১:০৯, অক্টোবর ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৮, অক্টোবর ২২, ২০২০

মহাষষ্ঠী তিথিতে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। তবে এবার শুধু পূজা আছে, কিন্তু উৎসব নেই। করোনার প্রাদুর্ভাবের কথা চিন্তা করে এবার উৎসব শুধু পূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। তাই ভক্তদের বাড়িতে বসেই প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এজন্য টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি অঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তাই এবারের পূজায় ভক্তদের আনাগোনা নেই মণ্ডপে। পূজার চিরাচরিত রূপ এবার হারিয়েছে। 

বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মর্ত্যে দেবী দুর্গার বোধনের মাধ্যমে শুরু হয় দুর্গোৎসবের আচার অনুষ্ঠান। দেবীর ঘুম ভাঙানোর বন্দনা পূজা শুরু হয় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে। পরে সমাপন হয় বিহিত পূজারও। বিহিত পূজার পর সন্ধ্যায় হয় দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রঞ্জিত চক্রবর্তী বলেন, ‘ষোড়শ উপচারে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আবাহন করেছি আমরা। সকালে ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে শুরু হয়েছে মূল আচার।’

তিনি বলেন, ‘বিল্ববৃক্ষ (বেলগাছ) মহাদেবের ভীষণ প্রিয়, পদ্মযোনী ব্রহ্মাও বিল্ববৃক্ষে দেবীকে প্রথম দর্শন করেন। তাই আমরা দেবীকে বিল্ববৃক্ষ তলেই আবাহন করছি। আজ সন্ধ্যায় বিল্ববৃক্ষ তলে দেবী আবাহনের মধ্যে সংকল্প করেছি, দশমী পর্যন্ত যথাবিধ উপায়ে আমরা মায়ের পূজা করবো।’

দেবীপক্ষের সূচনা হয় আশ্বিন শুক্লপক্ষের অমাবস্যার দিন, সেদিন মহালয়া। আর দেবীপক্ষের সমাপ্তি পঞ্চদশ দিনে কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার মধ্যে দিয়ে। এর মাঝে ষষ্ঠ দিন, অর্থাৎ ষষ্ঠীতে বোধন। আর দশম দিন, অর্থাৎ দশমীতে বিসর্জন। দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা এই পাঁচ দিনই চলে। তবে এবার আশ্বিন ‘মল’ মাস হওয়ায় মহালয়ার ৩৫ দিন পর কার্তিকে দেবী এসেছেন। 

দেবী এসেছেন ঠিকই, কিন্তু ভক্তদের দেখা নেই মন্দিরে। কারণ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে দর্শনার্থী প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে মন্দিরে। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল থেকে ভক্তদের আগমন খুবই সীমিত ছিল। প্রতিবার ষষ্ঠী পূজার দিন সকালে ভক্তদের আগমনের সময় দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও এবার তা ছিল না। মন্দির এবং প্রবেশ পথ ছিল পুরোটাই ফাঁকা। তাপমাত্রা পরীক্ষা করে প্রবেশ করানো হয়েছে সবাইকে। সামাজিক দূরত্বের জন্য রাখা হয়েছে ব্যবস্থা। মাস্ক ছাড়া কাউকে মণ্ডপ এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। শুধু ঢাকেশ্বরী মন্দিরেই নয়, অন্যান্য প্রায় সব পূজা মণ্ডপেই একই চিত্র দেখা গেছে।

রাজধানীর কলাবাগান পূজা মণ্ডপে এবার তেমন কোনও আয়োজন নেই। প্রতিবার অনেক সাজসজ্জা এবং আলোকসজ্জা থাকলেও এবার তা নেই। শুধু দেবীর প্রতিমা বসানো হয়েছে স্টেজে, কিন্তু তার সামনে দর্শনার্থী এবং ভক্তদের বসার তেমন কোনও ব্যবস্থা নেই। প্রবেশ পথ এবং মাঠের পুরোটাই ছিল ফাঁকা। নিরাপত্তাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের আনাগোনা ছিল বেশি। ধানমন্ডি পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অমর পোদ্দার জানান, দর্শনার্থীদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তাছাড়া ভক্তদেরও অধিক হারে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।    

মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহামারির কারণে আমাদের এবার অনেক কিছু মেনে চলতে হবে। সব ধর্মের মানুষেরই কিন্তু করোনার কারণে এমনটা করতে হয়েছে। আমরা রথযাত্রা করিনি, জন্মাষ্টমী খুব নিয়ন্ত্রিত উপায়ে আমরা পালন করেছি। মহালয়াতেও আমরা কাউকে নিমন্ত্রণ করিনি। টিভিতে দেখানো হয়েছে, অনেকেই ঘরে বসে দেখেছে। এবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের পূজা করতে হবে।  ভক্তরা যারা আসবেন, তাদের প্রত্যেকেরই মাস্ক পরতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। এরকম অনেক নির্দেশনা আছে। আমাদের দুর্গোৎসবে সব ধর্মের মানুষ আসে। এবার আমরা দুর্গোৎসব বলছি না, আমরা দুর্গাপূজা বলছি। কোনও প্রকারের উৎসব হবে না।’    

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জি বলেন,  ‘দুর্গাপূজা পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান, সকলের অংশগ্রহণে করোনাভাইরাসের বিস্তারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সন্ধ্যারতির পর সর্বসাধারণের জন্য মন্দির/মণ্ডপ বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছি আমরা। এছাড়া মা সর্বত্র বিরাজমান। বাড়িতে বসে ভক্তদের প্রণাম মা নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন। বঞ্চিত করবেন না তার আশীর্বাদ হতে। তাই আমরা এবার আহ্বান জানিয়েছি—সবাই যেন ঘরে বসেই প্রার্থনা করেন।’

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ