যেভাবে প্রোবক্স হয়ে যায় এলিয়ন, কাগজপত্রও ঠিকঠাক!

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১১:০০, অক্টোবর ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৩, অক্টোবর ২৭, ২০২০

চোরচক্রের মডিফাই করা গাড়ি

পুড়ে যাওয়া কিংবা অযত্নে পড়ে থাকা পুরনো গাড়ি কিনে নেয় তারা। এরপর গাড়িটা চলে যায় নির্ধারিত গ্যারেজে। খুলে নিয়ে ঠিকঠাক করা হয় চেসিস। ঝালাই করে অস্পষ্ট করে দেওয়া হয় সিরিয়াল নম্বর। তারপর অপেক্ষায় থাকে, কখন মিলবে একটা চোরাই গাড়ি! পাওয়া গেলেই হাতা গুটিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের কাজ। পুরনো ভাঙাচোরা গাড়ির কাগজপত্র অনুযায়ী নতুন গাড়ির ভোল বদলানো হয়। প্রয়োজনে কেটেকুটে আবার জোড়াতালিও দেওয়া হয়। বদলানো হয় রঙ। বসানো হয় পুরনো গাড়ির চেসিস। খালি চোখে ধরার সাধ্য থাকে না যে ওটা ছিল চোরাই গাড়ি। এখানেই শেষ নয়। এরপর ক্রেতা ঠিক হলে কাগজপত্র ও মালিকানা পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা বাকি থাকে। বিআরটিএ’র সঙ্গে সম্পর্কের’ জোরে সেটাও হয়ে যায় রাতারাতি। অর্থাৎ কয়েকদিনের ব্যবধানে পুরনো গাড়ি ও চোরাই গাড়ি মিলেমিশে হয়ে যায় ‘নতুন’ গাড়ি। চক্রের মূলহোতা কামাল হোসেনকে (৪৫) গ্রেফতারের পর এমনটাই জানতে পারলো সিআইডি। কামাল হোসেন বিআরটিএ চত্বরে পরিচালিত একটি ক্যান্টিনের পরিচালক।

সিআইডির ঢাকা মেট্রোর (দক্ষিণ) বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চক্রটি পুরনো মডেলের গাড়ি নিলামে কিনে বা চুরি করে তা মডিফাই করে চট্টগ্রামের একটি গ্যারেজে। এরপর কাগজপত্র বানিয়ে সেটা বিক্রি করে। আমরা ২২ অক্টোবর রাজধানীর শাহ আলী থেকে একটি চক্রকে গ্রেফতার করি। এসময় একটি Toyota Allion ব্র্যান্ডের গাড়ি জব্দ করা হয়। ওটার ভেতর ছিল মূলত Toyota Probox-এর চেসিস। আগের গাড়ির চেসিসের ওপর Allion ব্র্যান্ডের বডি বসানো হয়েছে। গাড়িটির মাঝ বরাবর কাটা আছে। যা খালিচোখে ধরা পড়বে না। তদন্তে বের হয়েছে। Allion গাড়িটি Probox-এর চেসিস নম্বর ও কাগজপত্র দিয়ে চলছিল। বিআরটিএ থেকে চক্রটি গাড়ির কাগজপত্র তৈরি করেছে। মালিকানাও বদলেছে একাধিকবার। চক্রটির মূলহোতা কামাল হোসেন বিআরটিএ চত্বরে পরিচালিত একটি ক্যান্টিনের পরিচালক।’

সিআইডি আরও জানায়, মতিঝিলের এ কে খান এন্ড কোম্পানি নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি পুড়ে গেলে সেটা নিলামে বিক্রি করা হয়। গাড়িটি কিনেন কামাল হোসেন। তারপর একটি চোরাই গাড়িতে প্রতিস্থাপন করা হয় ওই গাড়ির চেসিস। 

এ কে খান এন্ড কোম্পানির সহকারী ব্যবস্থাপক (এইচআর অ‌্যাডমিন) মাহফুজুর রহমান জানান, ‘২০১৩ সালে কোম্পানির একটি Toyota Probox ব্র্যান্ডের সাদা রঙের পুড়ে যাওয়া গাড়ি তারা বিক্রি করেন। যার চেসিস নম্বর-এনসিপি৫১-০৭১৩০ ও ইঞ্জিন নম্বর-আইএনজেড-সি৯০৯৭৪৫।’

সিআইডি জানায়, ‘ওই গাড়ির চেসিস ও অপর একটি চোরাই গাড়ির বডি ব্যবহার করে কামাল হোসেন Toyota Allion ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরি করেছেন।’

 

গাড়ি চোর চক্রের মূলহোতা কামাল হোসেন ও আবু কামাল

কামালের সিন্ডিকেট

কামাল হোসেন বিআরটিএ’র ক্যান্টিন লিজ নিয়ে পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠানের সকলের সঙ্গে তার ‘সুসম্পর্ক’। সম্পর্কের কারণেই গড়ে তুলেছেন চোরাই গাড়ি মডিফাই করার রমরমা ব্যবসা। তার বিরুদ্ধে আগেও গাড়ির কাগজপত্র জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। থানায় দুটি মামলাও রয়েছে। কিছুদিন আগে মোবাইল কোর্ট তাকে দুই মাসের সাজাও দিয়েছিল।

সিআইডির পরিদর্শক খসরুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জালিয়াতি করে কামাল হোসেন অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের খোঁজখবর নিচ্ছি। তার আরও যত গাড়ি আছে সেগুলোর কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে।’

যেভাবে ধরা পড়ে চক্রটি

রমনা থানার একটি গাড়ি চুরির মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এক মলম পার্টির সদস্যকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তার দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে শাহ আলী থানার নবাবের বাগে একটি চোরাই গাড়ির সন্ধান পায় সিআইডি। ২১ সেপ্টেম্বর গাড়িটি জব্দ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করালে গাড়িটি চোরাই বলে নিশ্চিত হয় সিআইডি। চোরাই গাড়ি জেনেও গাড়িটি কেনেন আবু কালাম নামের এক ব্যক্তি। তাকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তার সূত্র ধরেই গ্রেফতার হন কামাল হোসেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে যাবতীয় তথ্য।

বিআরটিএ’তে নথি নেই!

জব্দকৃত গাড়িটির কাগজপত্রের সন্ধানে বিআরটিএ অফিসে যায় তদন্ত কর্মকর্তা। বিআরটিএ থেকে তদন্ত কর্মকর্তাকে জানানো হয়, এই গাড়ির ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সিআইডি আদালতে এই গাড়ির নথির জন্য আবেদন করেছে। আদালত বিআরটিএ’কে গাড়ির নথি সরবরাহ করার নির্দেশ দেবে বলে আশা করছেন সিআইডি কর্মকর্তারা।

এসএস কামরুজ্জামান বলেন, ‘এসব গাড়ি কীভাবে কাগজপত্র পায়, তা জানার চেষ্টা করছি। বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত। তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তদন্তে যার নাম আসবে তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে।’

বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিআইডি মামলার তদন্ত করবে। তাদের তদন্তে যা হয়, আমরা তাদের সহযোগিতা করবো। তবে এই ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।’

 

ঢাকা থেকে চুরি হওয়া গাড়ি সীতাকুণ্ড থেকে উদ্ধার

গাড়ি চুরি থামছে না

বিভিন্ন গ্যারেজে অবৈধ মডিফিকেশন ও সহজে কাগজপত্র জালিয়াতি করার সুবাদে গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটছেই। শনিবার (২৫ অক্টোবর) ভোররাতে ঢাকা থেকে চুরি হওয়া একটি মিনিট্রাক চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে এবং টাঙ্গাইল থেকে ছিনতাই হওয়া একটি প্রাইভেটকার নাটোর থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। দুটি গাড়িতেই জিপিএস নিরাপত্তা সিস্টেম চালু ছিল।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দফতর সূত্র বলছে, ২০১৭ সালে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় গাড়ি চুরির ঘটনায় ৫৮২টি,  ২০১৮ সালে ৩৫৫টি, ২০১৯ সালে ৩৫০টি এবং ২০২০ সালের প্রথম আট মাসে ১৯৭টি মামলা হয়েছে।

ডিএমপির জনসংযোগ ও গণমাধ্যম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ওয়ালিদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাড়ি চুরির ঘটনা কিছুটা কমে এসেছে। চুরি হওয়া প্রচুর গাড়ি উদ্ধার করছে ডিএমপির ডিবি। এজন্য আলাদা টিম কাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গাড়ি ব্যবহারকারীদের কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকি। যেমন—গাড়িতে জিপিএস চালু রাখা, চালকের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিস্তারিত তথ্য রাখা, নিয়মিত লক পরিবর্তন করা, স্টিয়ারিং লক ব্যবহার করা, নির্দিষ্ট জায়গায় পার্কিং করা ও গাড়িতে সেন্সর ব্যবহার করা।’

/এআরআর/এফএ/আপ-এনএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ