৮ বছরেও যৌন নিপীড়নের শাস্তি পাননি ঢাবি শিক্ষক

Send
সিরাজুল ইসলাম রুবেল, ঢাবি
প্রকাশিত : ০৯:০০, অক্টোবর ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:১০, অক্টোবর ৩১, ২০২০

মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান ২০১২ সালে নিজ বিভাগের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে৷ ভুক্তভোগী ছাত্রীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তখন এ ঘটনায় বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল৷ তদন্তে ওই ঘটনার প্রমাণও মিলেছে৷ এরপর বিভাগ ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করে৷ কিন্তু ৮ বছরেও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তি নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ৷

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রভাবশালী শিক্ষকদের আনুগত্যের কারণেই ৮ বছরেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি৷ ইদানীং  তিনি বিভাগে প্রবেশ করতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও জানা গেছে৷ অথচ উপাচার্য বলছেন, ‘তদন্ত শাখায় খবর নিয়ে দেখেছি এই ধরনের কোনও সুপারিশ সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি৷'

অভিযুক্ত ওই শিক্ষক ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বাহালুল৷ যৌন হয়রানির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এ শিক্ষক মাস্টারদা সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন৷ বিনা পরিশ্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন।

তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকজন ছাত্রী এ ধরনের অভিযোগ করেন বলে বিভাগ সূত্রে জানা গেছে৷ যে ছাত্রীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগ তদন্ত কমিটি করে, সেই ছাত্রী কোনও অভিযোগ করেননি বলে এখন বলছেন। জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক বাহালুল প্রভাবশালী লোকদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় ভয় দেখানোর কারণেই অভিযোগ অস্বীকার করছে ভুক্তভোগী ছাত্রী৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট স্ট্যাটিউটের ৪৫(৩)(৪) উপধারায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ৭৩’র আদেশের ৫৬(৩) উপধারায় স্পষ্ট নির্দেশনায় বলা আছে, ‘নৈতিক স্খলন, অদক্ষতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও চাকরিবিধি পরিপন্থী’ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে কোনও শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে টার্মিনেট করা যেতে পারে।'

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের অক্টোবরে মাহমুদুর রহমান বাহালুলের বিরুদ্ধে বিভাগের একাধিক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ৮ অক্টোবর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে যথাক্রমে তিন মাস এবং ২০১৩ সালের ১ জুন হতে এক বছরের জন্য বিভাগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইবরাহিমকে (যিনি বর্তমানে অবসর উত্তর ছুটিতে রয়েছেন) আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়৷

তদন্ত কমিটির বক্তব্য হচ্ছে, ওই ছাত্রীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগ পাঁচ শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে৷ কমিটি যৌন নিপীড়নের প্রমাণ পেয়েছে বলে বিভাগে প্রতিবেদন জমা দেয়৷ সে প্রতিবেদনের আলোকে বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করে৷

ভুক্তভোগী ছাত্রীর অভিযোগ অস্বীকারের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্যরা জানান, ওই ছাত্রীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করে৷ ওই ছাত্রীকে অভিযুক্ত বাহালুল বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করার কারণে হয়তো সে প্রাথমিক অবস্থান থেকে সরে আসছে৷

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইবরাহিম (যিনি বর্তমানে অবসর উত্তর ছুটিতে রয়েছেন) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ওই ছাত্রীর লিখিত অভিযোগসহ আরও কয়েক ছাত্রীর অভিযোগ আমাদের কাছে ছিল। ওই ছাত্রীর সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছিল কমিটি৷ প্রত্যেকটি কাগজে ওই ছাত্রীর স্বাক্ষর রয়েছে।’

তিনি আরও জানান, তদন্ত কমিটি নিরপেক্ষ জায়গা থেকে তদন্ত করেছে৷ সেটি বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছিল৷ বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের সুপারিশ করে৷ কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন অদৃশ্য কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা আমার জানা নেই৷'

ঘটনাটি যখন ঘটে সে সময় উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এবং উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ছিলেন অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ৷ তারা এখন অবসরে রয়েছেন৷

জানতে চাইলে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, 'অনেক আগের ঘটনা৷ সেটি এখন আমার মনে পড়ছে না৷ বিভাগ শাস্তির সুপারিশ করলে কাগজপত্র এখনও থাকার কথা৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছরের কাগজপত্রও সংরক্ষিত থাকে৷'

এ বিষয়ে বর্তমান উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমি নতুন উপ-উপাচার্য হয়েছি৷ বিষয়টি আমার অবগত না৷'

বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'বিষয়টি অবগত হওয়ার পর তদন্ত শাখায় খবর নিয়ে দেখেছি, এ ধরনের কোনও সুপারিশ সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি৷'

/আরআইজে/এমওএফ/

লাইভ

টপ