ক্যান্সার রোগীর সহায়তার টাকা আত্মসাৎ!

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৯:০০, অক্টোবর ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৮, অক্টোবর ৩১, ২০২০

ক্যান্সার সচেতনতায় বক্তব্য দিচ্ছেন রোকেয়া রুমিতিনি নিজেও এক সময় ছিলেন ক্যান্সারে আক্রান্ত। দুরারোগ্য ও ব্যয়বহুল এই ব্যাধির সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করে ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। এরপর থেকে ক্যান্সার প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন করতে  সরব রয়েছেন তিনি।  ক্যান্সার আক্রান্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে গড়ে তুলেছেন ‘ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টার’। বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে অনুদান নিয়ে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় কাজ করছেন তিনি। এভাবে এখনও পর্যন্ত ৪০০ ক্যান্সার রোগীকে সহযোগিতা দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এজন্য পেয়েছেন নানা স্মারক-সম্মাননাও। এই নারীর নাম রোকেয়া রুমি।

কিন্তু কে জানে এমন মানবিক কাজের আড়ালে প্রতারণা করাই তার কাজ। রোগীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করে সেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে রোকেয়া রুমির বিরুদ্ধে। পাশাপাশি রোগীর নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ব্ল্যাংক চেকে অগ্রিম সই নিয়ে রাখারও অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের মাইজদী বাজার সংলগ্ন কাদের হাজীর বাড়ির বৃদ্ধা জেওরা খাতুন।

তিনি জানান, গত বছরের শেষের দিকে তার শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য তিনি মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু চিকিৎসার জন্য তার অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। পরে কোনও এক ব্যক্তির মাধ্যমে জানতে পেরে রোকেয়া রুমির এনজিও ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টারে সহায়তার জন্য আবেদন করেন। তার সেই আবেদন মঞ্জুরও হয়। তার নামে বরাদ্দ করা হয়  ৫০ হাজার টাকা।

BT-Newহাসপাতালে অনেক দিন ভর্তি থাকার পর জেওরা খাতুন গ্রামের বাড়িতে চলে যান এবং বাড়িতে বসেই চিকিৎসা নিতে থাকেন। এরই মধ্যে তাকে ফোন করে জানানো হয়, চিকিৎসার জন্য ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টার থেকে তার নামে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এজন্য রোগীর নামে ড্যাচ-বাংলা ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। কিন্তু তার উপজেলাটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় সেখানে বেসরকারি কোনও ব্যাংকের কার্যক্রম বা শাখা নেই। আর অসুস্থ হওয়ার কারণে হাতিয়া  থেকে জেলা সদর মাইজদী বা ঢাকায় আসাও  তার জন্য কষ্টকর। এসময় তিনি তার ছেলের অ্যাকাউন্টে টাকা নিতে চাইলে তাকে জানানো হয়— রোগী ছাড়া অন্য কারও অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়া নিয়ম নেই।

রোগী জেওরা খাতুনের ছেলে আব্দুর রহিমের সঙ্গে  একাধিক ফোনালাপের রেকর্ডে দেখা গেছে, ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রুমি তাদেরকে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করার জন্য পরামর্শ দেন। এজন্য রোগী জেওরা খাতুনের স্বাক্ষরসহ কাগজপত্র তাদের কার্যালয়ে পাঠাতে বলেন। সে অনুযায়ী, গত ১৩ আগস্ট তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদন ফরমে রোগীর স্বাক্ষর নিয়ে ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়-ঢাকার ঠিকানায় ডাক যোগে পাঠান। অ্যাকাউন্ট অ্যাকটিভ হওয়ার পর ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টার থেকে রোগীর ঠিকানায় সই করার জন্য চেক বইয়ের দুটি পাতা পাঠানো হয়। বলা হয়, টাকা উত্তোলন করে বিকাশের মাধ্যমে তাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

জেওরা খাতুন ৩০ আগস্ট দুইটি চেকে সই করে এনজিওটির নির্বাহী পরিচালকের কাছে পাঠান। ৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার তার অ্যাকাউন্টে ৫০ হাজার টাকা জমা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার জেওরা খাতুনের সই করা একটি চেকের মাধ্যমে  পুরো টাকা তুলে  নেন রোকেয়া রুমি। এরপর সেই টাকা থেকে মাত্র ৪ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে জেওরা খাতুনকে পাঠান রোকেয়া রুমি। বাকি টাকা ও অপর একটি ব্ল্যাংক চেক আজও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ জেওরা খাতুনের। টাকা চাওয়ায় ব্ল্যাংক চেকে ইচ্ছে মতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় তাকে।

জেওরা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যারা আমাকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিচ্ছে, আবার তারাই এমন প্রতারণা করবে, তা কখনও বিশ্বাস করিনি। কারণ, তারাই ফোন করে আমাকে অনুদানের কথা জানিয়েছে। তারা আমার কাছ থেকে সই নিয়ে আমার নামে অ্যাকাউন্ট করলো, আমার আক্যাউন্টে টাকা জমা হলো, সেই টাকা আবার তারাই উঠিয়ে নিয়েছে। আমার কাছ থেকে দুটি ব্ল্যাংক চেকে সই নিয়েছে। একটি দিয়ে টাকা উঠেয়ে নিয়েছে। এখন টাকা চাইলে বাকিটা দিয়ে নাকি আমার নামে মামলা করবে। আমার কাছে তাদের সঙ্গে কথোপকথনের সব রেকর্ড রয়েছে।’

এদিকে ড্যাচ বাংলা ব্যাংকের হেল্প লাইনে ফোন করে নিজের নামে করা অ্যাকাউন্টের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চান জেওরা খাতুন। ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হয় যে,  ‘ঢাকার মোহাম্মদপুরের রিং রোড শাখায় তার নামে অ্যাকাউন্টি করা হয়েছে। রোকেয়া রুমী নামে এক নারী ওই টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন।’

জেওরা খাতুন  জানান, রোকেয়া রুমি তার অফিসের কর্মকর্তা সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহকে দিয়েও তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তার মাধ্যমেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সই করা চেক রোকেয়া রুমির কাছে পৌঁছানো হয়েছে।

জানতে চাইলে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টারের কেউ না। তবে আমি ম্যাডামের (রোকেয়া রুমি) সঙ্গে শ্যামলীর এডিনবার্গ ইন্টারন্যাশেনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করি। করোনার কারণে অফিসে কেউ না থাকায় তার নির্দেশে আমি উনাদের সঙ্গে ( রোগী জেওরা খাতুন) যোগাযোগ রাখতাম। জেওরা খাতুনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ঢাকায় করা হয়েছে। তার কাছ থেকে দুটি চেকেও সই নেওয়া হয়েছে। সেই টাকা উঠানোও হয়েছে। এটা নিয়ে তারা আমাকে অনেকবার ফোনও করেছেন। আমি বিষয়টি আমি ম্যাডামকেও জানিয়েছি। পরে তাদের সঙ্গে কী হয়েছে, তা আর আমি জানি না। এখন আমাকেও দোষারোপ করা হচ্ছে।’

জেওরা খাতুন আরও জানান, করোনা মহামারির কারণে আমরা ঢাকায় যাইনি। পরে চেক বই ও টাকার বিষয়ে জানার জন্য জহির উদ্দিন নামে আমাদের এক আত্মীয়কে তাদের অফিসে পাঠাই। কিন্তু তারা তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয়। আমি আমার  চেক বই এবং এই প্রতারণার বিচার চাই।’

জানতে চাইলে জহির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য আমি তাদের কার্যালয়ে গেলে তারা আমাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। পরে আমি র‌্যাব কর্যালয়ে একটি অভিযোগও দিয়েছি।’

জানা গেছে,রোকেয়া রুমির ক্যান্সার সাপোর্ট সেন্টারটি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত। জেওরা খাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রোকেয়া রুমি বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কোনও কথা বলতে রাজি হননি।

ক্যান্সার নিয়ে কাজ করেন রোকেয়া রুমির ঘনিষ্ঠ এমন একজন জানান, দীর্ঘদিন ধরে আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। কিন্তু এরই মধ্যে তার নামে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। পরে তাকে ধীরে ধীরে আমরা বয়কট করতে থাকি।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ