৮ বছরেও পূর্ণতা পায়নি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর

Send
রনজিৎ চন্দ্র কুরী, নোয়াখালী
প্রকাশিত : ১৪:১৪, মার্চ ২৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫০, মার্চ ২৬, ২০১৬

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও যাদুঘর-১

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার রুহুল আমিন নগরে প্রতিষ্ঠিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আট বছরেও পূর্ণতা পায়নি। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও রুহুল আমিনের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

২০০৮ সালে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিনের বাড়ির পাশে পরিবারের দান করা ২০ শতক জমিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অর্থায়নে নোয়াখালী জেলা পরিষদ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে তার পরিবারকে দেওয়া সরকারি-বেসরকারি পদকের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ের বই, আছে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নানা পোস্টার, সাময়িকী আর পত্রপত্রিকা। তবে, প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম বলে মনে করেন দর্শনার্থীরা।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও যাদুঘর-৩

 দর্শনার্থী মো. জসিম বলেন, ‘একজন বীরশ্রেষ্ঠের নামে স্মৃতি জাদুঘর এতো কম পরিসরে হতে পারে না। সরকারের কাছে দাবি জানাই জাদুঘরটিকে আরও সম্প্রসারিত করা হোক। তাহলে আমরা মুত্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আরও জানতে পারবো’।

স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. হানিফ বলেন, ‘জাদুঘরটিতে অনেক কিছুর অভাব রয়েছে। এই বীরকে আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলে জাদুঘরটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে।’

প্রদর্শনের জন্য যাদুঘরে রাখা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিনের ছবি

আর বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবারের দাবি এ প্রতিষ্ঠানটিকে আরও আধুনিকায়নের পাশাপাশি সরকারিভাবে এখানে বীরশ্রেষ্ঠের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীসহ জাতীয় দিবসগুলো পালনের ব্যবস্থা করার। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নাতি সোহেল চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি করার পর অত্র এলাকায় শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসার ঘটেছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরও বিভিন্ন রকম কার্যক্রম পরিচালনা করলে এলাকার ছাত্রছাত্রী এবং পরবর্তী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আরও বেশি করে জানতে পারবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে।’ স্মৃতি কমপ্লেক্সে যাতায়াতের সড়কটি মেরামতের দাবিও জানান তিনি।

যাদুঘরের ভেতরে

এদিকে, সামান্য বাজেট দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঠিকভাবে চালানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কমপ্লেক্স তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। জেলা পরিষদের প্রশাসক ডা. এবিএম জাফর উল্লাহ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জেলা পরিষদে অল্প পরিমাণ যে বাজেট দেওয়া হয়, এসবে আসলে সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে রক্ষণাবেক্ষণে অর্থায়ন করার জন্য আলাদা একটা ফান্ড থাকা দরকার।’

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা স্মারক

সংক্ষিপ্ত জীবনী

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন ১৯৩৫ সালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার বাঘপাচড়া গ্রামে (বর্তমানে শহীদ রুহুল আমিন নগর) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আজহার পাটোয়ারী, মা জুলেখা খাতুন। রুহুল আমিন বাঘপাচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আমিষাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫৩ সালে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নৌ-বাহিনীতে যোগদান করে আরব সাগরে অবস্থিত নানোরা দ্বীপে পিএনএস বাহাদুর-এ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি পিএনএস কারসাজে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করেন এবং ১৯৬৫ সালে মেকানিশিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। পিএনএস কারসাজে কোর্স সমাপ্ত করার পর রুহুল আমিন আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি চট্টগ্রাম পিএনএস বখতিয়ার নৌ-ঘাঁটিতে বদলি হয়ে যান। ১৯৭১ এর এপ্রিলে তিনি ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যান। রুহুল আমিন ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে বিভিন্ন স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী গঠিত হলে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে দু’টি গানবোট উপহার দেয়। গানবোটের নামকরণ করা হয় পদ্মা  ও পলাশ। রুহুল আমিন পলাশের প্রধান ইঞ্জিন রুমে আর্টিফিসার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

যাদুঘরের ভেতরে-২

 

যেভাবে শহীদ হলেন

৬ ডিসেম্বর মুক্তি বাহিনী যশোর সেনানিবাস দখলের পর পদ্মা, পলাশ এবং ভারতীয় মিত্র বাহিনীর একটি গানবোট ‘পানভেল’ খুলনার মংলা বন্দরে পাকিস্তানি নৌ-ঘাঁটি পিএনএস তিতুমীর দখলের জন্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে এলে অনেক উঁচুতে তিনটি জঙ্গি বিমান উড়তে দেখা যায়। শত্রুর বিমান বুঝতে পেরে পদ্মা ও পলাশ থেকে গুলি করার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্র নাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলিবর্ষণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পর বিমানগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে নিচে নেমে আসে এবং আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। গোলা সরাসরি ‘পদ্মা‘র ইঞ্জিন রুমে আঘাত হানে। হতাহত হন অনেক নাবিক। পদ্মা’র পরিনতিতে পলাশের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন এই আদেশে ক্ষিপ্ত হন। তিনি উপস্থিত সবাইকে যুদ্ধ বন্ধ না করার আহ্বান করেন। কামানের ক্রুদের বিমানের দিকে গুলি ছুঁড়তে বলে তিনি ইঞ্জিন রুমে ফিরে আসেন। কিন্তু বিমানগুলো উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয়। শহীদ হন রুহুল আমিন। রূপসা নদীর পাড়ে তাকে সমাহিত করা হয়।

/বিটি/টিএন/

লাইভ

টপ
X