মরুর বুকে সোনালি স্বপ্ন বুনতে গিয়েছিল যারা, তাদের আকাশ আজ ধূসর। সৌদি আরবের কংক্রিটের দেয়ালে দেয়ালে এখন আর রেমিট্যান্সের গল্প নয়, জমে আছে দীর্ঘশ্বাস। একদিকে কাজের দুয়ারে তালা, মাসের পর মাস বেতন আটকে থাকার যন্ত্রণা, অপরদিকে মাথার ওপর শোঁ শোঁ করে উড়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়া; সব মিলিয়ে ভালো নেই সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
যে মানুষটি ভোরের আজানের আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন, এক বুক আশা নিয়ে; আজ তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন শ্রমের বাজারে, ফাঁকা পকেট নিয়ে। বগুড়ার শাহেদ কিংবা কুমিল্লার নাসরুল্লাহর মতো দুজন তো ফিরলেনই না, কিং খালেদ বিমানবন্দরে বারুদের গন্ধে ভরা রক্তাক্ত টার্মিনালে নিভে গেলো তাদের জীবন-প্রদীপ। আরও ২৪ জন এখন রিয়াদের হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে গুনছেন বেঁচে থাকার প্রহর। তাদের মধ্যে ১১ জন শ্রমিক, ১৩ জন ওমরাহ যাত্রী। এ যেন এক দ্বিমুখী যুদ্ধ। এক যুদ্ধ পেটের, আরেক যুদ্ধ প্রাণের।
সৌদি আরবে ৩২ লাখের বেশি বাংলাদেশি থাকেন, কিন্তু এখন তাদের মুখে একটাই আহাজারি, ‘ভাই, ভালো নেই।’ ৮০ ভাগের বেশি মানুষ ক্লিনার, নির্মাণ শ্রমিক আর গৃহকর্মীর মতো স্বল্প-দক্ষ কাজে আটকে আছেন, বেতন মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইকামা জটিলতা, বেতন আটকে যাওয়া আর হুথি যুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র আতঙ্ক। আবার ফ্লাইট বাতিলে কাজ হারানোর আতঙ্কে এখন সবচেয়ে বড় সংকটে প্রবাসীরা।
বিপাকে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরা
রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে সোমবার (১২ অক্টোবর) পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী মোট ৩৯টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশের চারটি, ইউএস-বাংলার দুটি, সৌদিয়ার তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারের তিনটি ফ্লাইট রয়েছে। বিমান বাংলাদেশের সৌদিগামী ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সোমবার ঘোষণা দিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের সব ফ্লাইট আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল থাকবে।
এই বাতিলের ধাক্কাটা সবচেয়ে বেশি লাগছে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের ওপর। শাহজালাল বিমানবন্দরে আটকা পড়া এক প্রবাসী জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছুটি শেষ হচ্ছে ১৫ তারিখ। কোম্পানি বলেছে, সময়মতো না ঢুকলে অনুপস্থিত দেখিয়ে ইকামা ক্যানসেল করে দেবে। এখন ফ্লাইট নেই, চাকরিটাই হারানোর ভয়ে আছি।’ অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষের পথে। ফলে একদিকে টিকিটের টাকা লোকসান, অন্যদিকে সৌদিতে ফিরতে না পারলে পুরো সংসার অচল হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক প্রবাসীদের মধ্যে।
‘তিন মাস ধরে অর্ধেক বেতন: কাজ আছে, টাকা নেই’
রিয়াদের আল-খারজ এলাকায় একটি ক্লিনিং কোম্পানিতে কাজ করেন কুমিল্লার জামাল হোসেন। ফোনে কিছুটা হতাশাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘নতুন কোম্পানিতে আসছি সাত মাস। প্রথম তিন মাস ঠিক ছিল। এখন বলছে কাজ কম। ১৪০০ রিয়ালের জায়গায় ৭০০ রিয়াল দিচ্ছে। দেশে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে এসেছি। তাকামুল পরীক্ষার ফি ৫০ থেকে ৮৫ ডলার হয়ে গেছে, সেই টাকাও আমাদের ঘাড়ে।’
শুধু জামাল একা নন। তার মতো আরও অনেক প্রবাসী একই ধরনের সংকটে আছেন। গত নভেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানেরসহ অন্তত ৬০০ অভিবাসী শ্রমিক ৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতন পাননি। ভুক্তভোগী বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানিয়েছেন, কোম্পানি প্রথমে করোনা ও প্রজেক্ট সংকটের অজুহাত দেখালেও পরে কোনও সদুত্তর দিচ্ছে না। এমনকি ইকামা নবায়নও বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বেতনহীন অবস্থায় তারা না পারছেন দেশে ফিরতে, না পারছেন অন্য কোথাও কাজ নিতে। এখন ক্যাম্পে বন্দিজীবন কাটছে তাদের।
দাম্মামে কর্মরত আরেক শ্রমিক শরীয়তপুরের রফিকুল বলেন, ‘কোম্পানি আমাদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা বেতন বাড়ানোর দাবি করেছিলাম। ওরা বলছে চুক্তি শেষ। এখন ইকামার মেয়াদও শেষ, পুলিশ ধরলে জেলে যেতে হবে।’
‘ভিসা আছে, কাজ নেই’
সৌদি আরবে কাজের উদ্দেশে যাওয়া কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৬ মাসে যারা নতুন ভিসায় গেছেন, তাদের অবস্থা বেশি খারাপ। প্রবাসীরা নিজেরাই বলছেন, অনেকে নতুন ভিসা নিয়ে এসে কাজ পাচ্ছেন না, যারা আগে থেকে আছেন, তারাও চাকরি হারাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের সোহেল রানা দুই মাস আগে ‘ফ্রি ভিসা’ নামে পরিচিত সাপ্লাই কোম্পানির ভিসায় রিয়াদে গেছেন। তার ভাষ্য, দালাল বলেছিল কোম্পানিতে সরাসরি কাজ। এখানে এসে দেখি এক রুমে ১৪ জন। প্রতিদিন সকালে লেবার মার্কেটে দাঁড়াই। কাজ পেলে ৫০ রিয়াল, না পেলে খালি হাতে ফেরা। গত মাসে ৯ দিন কাজ পেয়েছি।
মাথার ওপর যুদ্ধ: বিমানবন্দরেই মৃত্যু
এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে এসেছে যুদ্ধ। গত ১২ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। এটি এক দশকের মধ্যে সৌদির মাটিতে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা।
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন আহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। নিহতরা হলেন, বগুড়ার শাহজাহানপুরের মো. শাহেদ আহম্মেদ এবং কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের নাসরুল্লাহ বদরপুরি।
আহতদের মধ্যে ১১ জন কর্মী এবং ১৩ জন ওমরাহ যাত্রী। তারা রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন জন কিং আবদুল্লাহ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন, যাদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
সৌদির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে চার জন সৌদি নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।
হামলার পরপরই বাংলাদেশ থেকে সৌদির সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। বিমানবন্দরে আটকা পড়েন শত শত কর্মী। এখন সৌদির সব বিমানবন্দরকে টার্গেট বলে ঘোষণা দিয়েছে হুথিরা।
জেদ্দায় ইলেকট্রনিক ব্যবসা করেন ফেনীর নুরুল আফসার। তিনি বলেন, ‘‘করোনার লস এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এখন কাস্টমার আসতে ভয় পায়। সন্ধ্যার পর দোকান খালি। আমরা ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তায় আছি।’’
প্রবাসী শ্রমিকরা বলছেন, কোম্পানিগুলো এখন যুদ্ধের অজুহাতে প্রজেক্ট বন্ধ রাখছে। ফলে দিন হাজিরার শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থাৎ সাপ্লাই কোম্পানিতে কাজ করা কর্মীরা কেউ ভালো নেই। একই সঙ্গে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ভিসা কিনে সৌদি যাওয়া প্রবাসীদের অনেকেরই কাজ নেই।
দেশে পরিবারের কান্না
সৌদি প্রবাসীর দুর্দশা মানে দেশে তার পরিবারের হাহাকার। রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে। সরকার বলছে, রেকর্ড সংখ্যক কর্মী সৌদি গেলেও রেমিট্যান্স বাড়ছে না, কারণ বেশিরভাগ স্বল্প বেতনের কাজে আছেন।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর সেপ্টেম্বরে বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পাওয়া কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২৯ শতাংশ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, মালয়েশিয়া-ওমান-বাহরাইনের মতো বড় শ্রমবাজারগুলো বন্ধ বা সীমিত থাকা, নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে ব্যর্থতাই এর মূল কারণ। প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও বাংলাদেশি কর্মীদের শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে সৌদি আরব।
ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, তারা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে; যাতে কর্মীরা নিরাপদে থাকতে পারেন।
এদিকে অনেক প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ নেই, কর্মস্থলে ফিরতে সমস্যা হচ্ছে, তাদের জন্য বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে সচিবালয় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। বিমানমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরবের যেসব বিমানবন্দরে চলাচল করা যাচ্ছে; সেসব এয়ারপোর্টে বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিরা চাকরি হারানো ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে কিছু প্রবাসী কর্মসংস্থান হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে, অনেকে কর্মহীন অবস্থায় ওই অঞ্চলে রয়েছেন।’
শুধু সৌদি আরবেই ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চলমান সংঘাত বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।’ প্রচলিত শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষ ও বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে বলেও জানান তিনি।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সংকট যে হঠাৎ আসেনি, তা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। গত দেড়-দুই দশক ধরে বারবার বলা হচ্ছিল, আমাদের শ্রমবাজারকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক করে রাখা উচিত নয়, বিকল্প বাজার খোঁজা দরকার। আমরা তার প্রতিফলন এখন দেখতে পাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘‘এ বছর মার্চে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কর্মী যাওয়া উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এবং এই পরিস্থিতি যে খুব সহসা স্বাভাবিক হবে, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ, এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও। কারণটা যদি দেখি, দুবাই বহু বছর ধরে একটা ‘সেফ জোন’ হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এসেছে, বিনিয়োগ করেছে। সৌদিসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি বিনিয়োগের জোয়ার এসেছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ প্রমাণ করে দিলো, আসলে তারা নিরাপদ না। ফলে অনেক বিনিয়োগ চলে যাবে। পর্যটন বলেন, রেস্টুরেন্ট বলেন, নির্মাণ খাত বলেন; সব খাতেই ধস নামবে। আর যেহেতু এই খাতগুলো কমে যাবে, আল্টিমেটলি এর ইমপ্যাক্টটা গিয়ে পড়বে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর। তাদের কাজ কমবে, বেতন কমবে, ছাঁটাই বাড়বে। তাই ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য যে আগের মতো বড় শ্রমবাজার হিসেবে থাকবে, সেই সম্ভাবনা খুবই কম।’’