এক মাসের ছুটি কাটিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে সৌদি আরবে কাজে ফিরেছিলেন বগুড়ার শাহেদ আহম্মেদ। কিন্তু কর্মস্থলে পৌঁছানোর পর রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রানজিটের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান ৩৬ বছর বয়সী এই প্রবাসী কর্মী। তার মৃত্যুর খবরে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা পশ্চিমপাড়ার বাড়িতে এখন শোকের মাতম।
শাহেদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলী, বাবাকে হারিয়ে ১১ বছর বয়সী কাওসার ও ৬ বছর বয়সী আবদুল্লাহ এবং স্বজনরা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরাও বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন।
গত ১০ অক্টোবর বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং অন্তত ২৭ জন আহত হন। নিহত ও আহতদের প্রায় সবাই বিমানবন্দরে ট্রানজিটের অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের কেউ দেশে ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরছিলেন, কেউ যাচ্ছিলেন পবিত্র ওমরাহ পালনে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলায় বিভিন্ন দেশের মোট ১৩ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন।
ফিরেছিলেন কর্মস্থলে
শাহেদ বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা পশ্চিমপাড়ার সৌদি প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও সাহেরা বেগমের সন্তান। তার বাবা প্রায় ২৭ বছর ধরে সৌদি আরবে চাকরি করেন। মা সাহেরা বেগমও কিছু দিন আগে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে গেছেন।
শাহেদ প্রায় দুই বছর আগে সৌদি আরবে যান। সেখানে সা'দ আল ঈসা কন্ট্রাক্টিং কোম্পানির জেদ্দা প্রকল্পে কাজ করতেন তিনি। প্রায় এক মাস আগে দুই মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ছুটি শেষ হওয়ার আগেই কাজের প্রয়োজনে গত শুক্রবার সৌদি আরবে ফিরে যান।
দেশ ছাড়ার আগে স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন শাহেদ। কিন্তু সেই বিদায়ই যে শেষ বিদায় হবে, তা ভাবতে পারেননি পরিবারের কেউ। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর শনিবার বিকালে স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন শাহেদ। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ হয়নি। বারবার ফোন করেও তাকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্বজনরা। রবিবার সন্ধ্যার দিকে সাংবাদিকদের মাধ্যমে শাহেদের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা।
মরদেহ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
শাহেদের চাচাতো ভাই মাসুদ রানা ও শোকাহত আত্মীয়স্বজন জানান, এক মাস ছুটি কাটিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শাহেদ। বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
বগুড়া পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রুহুল কুদ্দুস ডিলু বলেন, সৌদি আরবে রেমিট্যান্সযোদ্ধা শাহেদের মৃত্যুর খবর পেয়ে পরিবারের খোঁজ নিতে এসেছেন তিনি। শুক্রবার সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর শনিবার বিকাল থেকে শাহেদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাইফুর রহমান জানান, সৌদি আরবে নিহত শাহেদের বাড়ি উপজেলার মাদলা পশ্চিমপাড়া গ্রামে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। স্থানীয় চেয়ারম্যানও তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তাইফুর রহমান আরও বলেন, নিহতের মরদেহ সরকারি খরচে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একটি মিশন কাজ করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, হামলায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনা হবে।
এদিকে হামলায় আহত ২৭ বাংলাদেশির মধ্যে ১১ জন সৌদি প্রবাসী কর্মী এবং ১৬ জন ওমরাহ যাত্রী। রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়, সামান্য আহত ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৫ জন রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে পাঁচ জনের অবস্থা গুরুতর। চার জন বর্তমানে শঙ্কামুক্ত হলেও নওগাঁর রানীনগরের এক ওমরাহ যাত্রীর অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে দূতাবাস।
হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি সেখানে আটকা পড়েন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বিভিন্ন হোটেল ও প্রিন্সেস নূরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। বাতিল হওয়া সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ঢাকা-রিয়াদগামী ফ্লাইটের প্রায় ৪০০ যাত্রীকে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দূতাবাস।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বাংলা ট্রিবিউনের বগুড়া প্রতিনিধি মো. নাজমুল হুদা নাসিম)