দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দাবি আদায়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মাঝখানের সময়টিতে আন্দোলনের ফলাফল নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো। ইতোমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। গত কয়েক দিনে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।
কয়েক দিন ধরে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতাদের আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় যেকোনও মূল্যে ঈদুল ফিতরের পর ও ঈদুল আজহার মধ্যকার সময়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের একজন সিনিয়র নেতা মনে করেন, কোনোভাবেই জুলাই পেরিয়ে গেলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে চাপে ফেলা সম্ভব নয়। ফলে, আগামী মে ও জুন মাসকে ‘আন্দোলনের জরুরি সময়’ হিসেবে মনে করছেন কোনও কোনও নেতা।
বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর নেতারা বলছেন, দুই ঈদের মাঝখানের সময়টিতে নানা ধরনের কর্মসূচি আসতে পারে। ইতোমধ্যে আলোচনা অনেকটা চূড়ান্ত হলেও কর্মসূচির ধরন নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ নেতারা।
একটি দলের প্রধান নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, রমজানের ঈদের পর সমাবেশ, বিক্ষোভ সমাবেশসহ সক্রিয় কর্মসূচি দেওয়া হবে। বিএনপি শুরু করবে। অন্যান্য দল তাদের ফলো করবে। এছাড়া, ঢাকা অভিমুখে পদযাত্রা বা লংমার্চ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনকে চূড়ায় নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকারের উসকানি এড়িয়ে, সহিংসতা এড়িয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’
এ বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনগণ আন্দোলনে যদি না নামেন, তাহলে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার অর্জন করা যাবে না। এ কারণে ঈদের পর থেকে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সর্বাত্মক আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোকে যেতে হচ্ছে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ঈদের পর কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা চলছে। আমাদের সবার মধ্যে কমননেস আছে। তবে ধরন কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি চলমান রয়েছে। রোজার মধ্যেও আমরা কর্মসূচিতে ছিলাম। ঈদের পর কী কর্মসূচি দেওয়া হবে—তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। বিস্তারিত আলাপ আমাদের হয়নি। আমাদের আন্দোলন চলমান আছে, থাকবে।’
যৌথ রূপরেখা নিয়ে ঐকমত্য হয়নি
গত ১৩ এপ্রিল গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে যৌথ রূপরেখা নিয়ে নতুন প্রস্তাব দেয় বিএনপি। ওই প্রস্তাব ছিল—গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর হোটেল ওয়েস্টিনে ঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে ২৭ দফা’কে আরও বাড়িয়ে যৌথ রূপরেখা হিসেবে ঘোষণা করা। বিএনপির এই প্রস্তাবের পর গণতন্ত্র মঞ্চের শরিকদের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়।
বুধবার (১৯ এপ্রিল) বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম একজন নেতা বলেন, ‘বিএনপির লাস্ট প্রস্তাবটাতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। দুই পক্ষের লিয়াজোঁ কমিটির পক্ষ থেকে সাত দফা তৈরি করার পর নতুন প্রস্তাবের ফলে মঞ্চের শরিকদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব শুরু হয়েছে। বিএনপি চাইছে—তাদের ১০ দফাকে ঠিক রেখে ২৭ দফাকে সংস্কার করে আরও বাড়িয়ে দিতে। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত এখানেই।’
এই নেতা আরও বলেন, ‘বিএনপির ১০ দফা কেবল আন্দোলনের দফা, সংস্কার নেই। আবার ২৭ দফার মধ্যে কেবল সংস্কার। সে কারণেই আন্দোলন, সরকারের পতন ও পতনের পর নির্বাচনকালীন সরকারসহ সব বিষয়কে সমন্বয় করে দুই লিয়াজোঁ কমিটি ৭ দফা চূড়ান্ত করে। ফলে শরিকদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে।’
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক প্রভাবশালী দায়িত্বশীলও মনে করছেন, রূপরেখা সমন্বয় করা নিয়ে জটিলতা আসলে রয়ে গেছে। তাদের ভাষ্য—‘কর্মসূচি যুগপৎভাবে চলবে, কিন্তু যৌথ ঘোষণা না হলে গঠনমূলক উন্নতি হবে না। যৌথ ঘোষণার কারণে অনেক কিছু আটকে আছে। আস্থার জায়গা সৃষ্টি হচ্ছে না। যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সব বিরোধী দলকে এক ছাতার নিয়ে আসা সম্ভব হবে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের একজন নেতা জানান, ঈদের পর কয়েক দিনের মধ্যে গণতন্ত্র মঞ্চ বৈঠক করবে। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটি ও মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটি বসবে। বিএনপির ১০ দফা, মঞ্চের ১৪ দফা, সব মিলিয়ে একটি চূড়ান্ত রূপরেখা করার পরই যুগপৎ কর্মসূচিতে যাবে গণতন্ত্র মঞ্চ।
তবে গণতন্ত্র মঞ্চের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্মসূচি থাকবে, কর্মসূচির মতো। রাজপথে কর্মসূচি থাকবে। যৌথ ঘোষণা দেরি হলেও কর্মসূচি থাকবে। আমরা ঈদের পর দুই সপ্তাহের মধ্যে এই বিষয়টি সমাধান করবো।’
জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যৌথ ঘোষণার বিষয়টি টু লেট। আমাদের কর্মসূচিতে যেতে হবে।’
আরেক নেতার মন্তব্য, ‘বিএনপি ১০ দফা নিয়ে ইগো প্রবলেমে ভুগছে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক, ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘যৌথ রূপরেখা ঘোষণার পর আমরা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আন্দোলনকে কার্যকর জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।’
আরও পড়ুন:









