ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সংরক্ষিত ৩৬ আসনের প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। এবার অতীতের অভিজ্ঞ নেত্রীরা যেমন আছেন, তেমনই বড় একটি অংশ নতুন মুখ। দলের বাইরেও পেশাজীবী অঙ্গনের অনেকে মনোনয়ন পেয়েছেন।
কে কোন অবদানের জন্য মূল্যায়ন পেলেন, কার আত্মীয় কে? দলীয় অবস্থান কী, হেভিওয়েটরা বাদ পড়লেন কেন—প্রত্যেক প্রার্থীর আদ্যোপান্ত নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। আবার অতীতে ভিন্ন দল করা দুই-একজনের প্রার্থিতার ব্যাপারেও সমালোচনা হচ্ছে। এর আগে গত সোমবার (২১ এপ্রিল) নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী বাছাই কেমন হলো—জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও একেবারেই খারাপ হয়নি। মনোনয়নপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই মাঠের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। আবার অতীত অভিজ্ঞদেরও রাখা হয়েছে। এটা ইতিবাচক। তবে সংসদে তারা কতটুকু অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারেন, সেটিই দেখার বিষয়।’’
অতীতেও এমপি ছিলেন যারা
বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত ৩৬ জনের ১০ জনই অতীতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা, স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি, সহশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, নির্বাহী কমিটির সদস্য শাম্মি আক্তার, রেহানা আক্তার রানু, বিলকিস ইসলাম, নেওয়াজ হালিমা আরলী ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমাদ।
তারা দীর্ঘদিন সরাসরি রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অতীতে সংসদেও রেখেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা।
কে কার আত্মীয়?
বিগত দিনে দলের প্রতি অবদান আছে এমন কয়েকজন নেতার স্বজনরা মনোনয়ন পেয়েছেন। অবশ্য তাদের কেউ কেউ পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে নিজেও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছেন।
এর মধ্যে রয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে ও সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ নিপুণ রায় চৌধুরী, চট্টগ্রামের সাবেক এমপি ও হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী শিরীন সুলতানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন, লালবাগের সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন পিন্টুর বোন ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি), শেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. হযরত আলীর মেয়ে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী (মৌলভী বাজারের সাবেক এমপি) প্রয়াত এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে জহরত আদিব চৌধুরী। তিনি মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের সাবেক ডেপুটি সিইও।
তবে পারিবারিক পরিচয়ের বাইরেও তারা আলোচিত মুখ। এর মধ্যে নিপুণ রায় ঢাকা জেলা উত্তর বিএনপির সভাপতি, ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা বিগত দিনে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। আর শিরীন সুলতানা ও বীথিকা বিনতে হুসাইনও রাজপথে অবদান রেখেছেন।
আছে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রতিনিধিত্ব
দলে সব ধর্মের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের। তাদেরও রয়েছে সামাজিক প্রতিনিধিত্ব। এর মধ্যে আছেন আন্না মিনজ, মাধবী মারমা, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর)।
এর মধ্যে আন্না মিনজ উন্নয়নকর্মী এবং আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। পেশাগতভাবে ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম)। তিনি নাটোরের বাসিন্দা। তার স্বামী জন গোমেজ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ধর্ম বিষয়ক সহ-সম্পাদক।
সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর) গোপালগঞ্জ ও মাধবী মারমা বান্দরবানের বাসিন্দা। পেশায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সুবর্ণা সিকদার মথুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের প্রধান উপদেষ্টা। অপরদিকে মাধবী মারমা বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ও জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক।
তিন প্রার্থীকে ঘিরে আলোচনা
বিএনপির সংরক্ষিত আসনে স্থান পাওয়া কমপক্ষে তিন জনকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনা হচ্ছে। এরা হলেন সুবর্ণা ঠাকুর, ফাহমিদা হক ও নাদিয়া পাঠান পাপন।
এর মধ্যে সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর) পেশায় শিক্ষক। মথুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের প্রধান উপদেষ্টা। অনেকে তাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রচার করছেন। অতীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনলেও প্রার্থী হতে পারেননি বলে কয়েকটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। তাছাড়াও আওয়ামী লীগের পক্ষে দেওয়া তার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সুবর্ণা সিকদার কয়েকটি গণমাধ্যমে জানান, তিনি বিএনপির একজন সমর্থক। আওয়ামী লীগের কোনও কমিটিতে ছিলেন না। তার স্বামী পদ্মনাভ ঠাকুর একসময় যুবদলের রাজনীতি করতেন।
অপরদিকে জনপ্রিয় টকশো তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক ও পরিচালক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হকের মনোনয়ন ঘিরেও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তারা বলেন, ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকের’ স্ত্রী বিএনপির মনোনয়ন পেলেন কীভাবে?
তবে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জিল্লুর রহমান এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি লিখেছেন, তার স্ত্রী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপির সঙ্গে তার সুসম্পর্কের কারণে হয়তো ফাহমিদা হক মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে নিজের পেশাগত অবস্থান আগের মতোই থাকবে বলে জানান জিল্লুর রহমান।
অপরদিকে নাদিয়া পাঠান পাপন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সৈয়দা নাখলু আক্তারের মেয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। নাদিয়া পাঠান পাপন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার মায়ের দাবি, তাদের রাজনীতি ভিন্ন হলেও কেউ কারও প্রভাবক নন।
মূল্যায়ন পেলেন ছাত্রদলের সাবেক-বর্তমান নেত্রীরা
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে মূল্যায়ন পেয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান নেত্রীরা। বিশেষ করে বিগত দিনে যারা রাজপথে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের বাছাই করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত মুখ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক মানসুরা আক্তার। তার মনোনয়ন প্রাপ্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে চমক বলে মন্তব্য করেছেন।
এছাড়া সাবেকদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা (রুমা), সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানজিদা ইসলাম (তুলি), মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য নাদিয়া পাঠান (পাপন), ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকত আরা আক্তার (উর্মি), সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিনা সুলতানা (নিশিতা)
জাতীয় নির্বাচনে পরাজিতদেরও রাখা হলো
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়া কয়েকজনকেও সংরক্ষিত আসনে স্থান দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে শেরপুর-১ (সদর) আসনে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, ঢাকা-১৪ আসনে বিগত দিনে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি) ও যশোর-২ আসনের সাবিরা সুলতানা (মুন্নী)।
এ বিষয়ে মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি) বলেন, নানা কারণে আমাদের কয়েকজনের বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
তবে দুর্দিনে অবদানের কথা বিবেচনা করে হয়তো দল আমাদের মূল্যায়ন করেছে। আশা করি এর মাধ্যমে সংসদ আরও প্রাণবন্ত হবে।
উল্লেখযোগ্য আরও যারা মনোনয়ন পেলেন
অতীতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা ১০ জনের বাইরে বাকি ২৬ জনই প্রথমবারের মতো সংসদে পাঠাচ্ছে বিএনপি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরও স্থান পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মহিলা দলের সহ-সভাপতি জীবা আমিনা খান, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, কক্সবাজার জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আরা বেগম (স্বপ্না), বগুড়া জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক সুরাইয়া জেরিন, আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন, মহিলা দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মমতাজ আলো, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি রেজেকা সুলতানা।
এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও যোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। আশা করি তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে বঞ্চিত নারী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করবেন।’’