দেশের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে কথা না বলেই, তাদের নাম উল্লেখ করে গত ২১ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে খোলা চিঠি দিয়েছেন গণস্বাস্থ্যনগর হাসপাতালের জাফরুল্লাহ চৌধুরী। খোলা চিঠিতে যাদের নাম উল্লেখ করে তাদের ‘কো-আপ্ট’ করার প্রস্তাব করেছেন, তাদের সবার সঙ্গে তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনও কথা বলেননি বলে জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট কয়েকজন বুদ্ধিজীবী। আলাপকালে বাংলা ট্রিবিউনকে এমন তথ্য জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, গত ২১ আগস্ট বিএনপি প্রধানের উদ্দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শব্দের চিঠিতে জামায়াত বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, দলে গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র চর্চা করা, উপদেষ্টা পরিষদে বিশিষ্টজনদের কোআপ্ট করা, ড. কামাল হোসেনের দলসহ কয়েকটি দলকে নিয়ে একসঙ্গে জনসভার ঘোষণা দেওয়ার পরামর্শ দেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
আন্তর্জাতিক বিষয় বিশেষত ভারতীয় আগ্রাসন, অনুপ্রবেশ, একাধিক ট্রানজিট ও বাংলাদেশের সঙ্গে সিকিম ভুটানের মতো ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ বিষয়ে দলের (বিএনপি) সদস্য নন, অথচ বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী, যোগ্যতা সম্পন্ন ও সুদক্ষ—এমনব্যক্তিদের কোআপ্ট করার পক্ষে মত দেন বিএনপিপন্থী চিকিৎসক জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
বিশিষ্টজনদের মধ্যে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক আমলা আলী ইমাম মজুমদার, সাদত হোসেন, শওকত আলী, ড. আকবর আলি খান, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক ফেরদৌস আজিম, উপাচার্য পারভীন হাসান, নারী পক্ষের শিরীন হক, সুজনের বদিউল আলম মজুমদার, হাফিজ উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক আইনুন নিশাত, অধ্যাপক (ড.) এম আর খান, বারডেমের ডা. এ কে আজাদ খান, আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস এ খান, অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক, বিআই ডি এসের বিনায়ক সেনের নাম উল্লেখ করেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। চিঠিতে তার ভাষ্য ছিল, কমিটিগুলোয় কো-আপ্ট করলে কমিটির কাজের গুরুত্ব বাড়বে এবং বিএনপি জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে। ভবিষ্যতে দেশ শাসনে খালেদা জিয়ার সুবিধা হবে।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তার চিঠিতে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করার পরামর্শ দিলেও তার সঙ্গে এ নিয়ে কোনও আলোচনাই হয়নি তাদের দুজনের মধ্যে।
বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমার সঙ্গে কোনও আলোচনাই হয়নি। তিনি তো এমনিতেই করেছেন। তবে আগে জানলে আমার নামটা বসাতে বারণ করতাম।’
বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনি আমার সঙ্গে কোনও আলোচনা করেননি। আর কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতেও আমার আগ্রহ নেই।’
নিজের নাম উল্লেখ নিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে একটু রেগে গিয়েই কথা বলেন অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘জানি না, আমি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। ভবিষ্যতেও হব না। এটা জাফরুল্লাহকে জিজ্ঞেস করুন গিয়ে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডির ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা তিনি স্নেহপরবেশ হয়ে করে থাকতে পারেন। তবে এটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নয়। এ ব্যাপারে ডা. জাফরুল্লাহর সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি।’
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি পত্রিকা মারফতে দেখলাম এবং জানলাম। তিনি আমারসহ কয়েকজনের নাম দিয়েছেন কো-আপ্ট করতে। কিন্তু এটি তিনি হয়তো ধারণা থেকে করতে পারেন। তিনি মনে করেন, যে তারা-তারা এইসব কাজে পারদর্শী।’
অনাগ্রহের কথা জানালেন সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে তিনি কোনও আলাপ করেননি। আর আমাদের প্রতিষ্ঠান তো রাজনৈতিক দলের জন্যই কাজ করে। আমরা নিরপেক্ষভাবে সব দলের কাজের মত দেই। কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া আমাদের কাজ নয়।’
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘তার চিঠি প্রকাশের পর আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আমি, আলী ইমাম মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ স্যার, হাফিজ উদ্দিন আহমদসহ কয়েকজন আমরা কথা বলেছি। তিনি তো কথা বলেননি। আমরা জানিও না যে, তিনি আমাদের নাম দেবেন। আমাদের তো প্রতিষ্ঠান আছে। তার ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, নাম দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা রাজনৈতিক দলের জন্য মত ব্যক্ত করি। দলগুলো যেন জনকল্যাণমুখী হয়, সেদিকেও জোর দেই। এর বাইরে কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া আমাদের কাজ না।’
মোবাইলে না পাওয়া গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমেদ কামালের একজন সুহৃদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্পর্কের সুবাদেই হয়তো স্যারের নাম যুক্ত করেছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আদতে এসবে জড়ানোর কোনও চিন্তা বোঝা যায়নি।’
কোনও আলোচনা না হওয়ার বিষয়টি জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এ নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।
বৃহস্পতিবার বিকালে অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি লোকমুখে শুনেছি যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমিসহ ২০-২৫ জনের নাম উল্লেখ করে চিঠি দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার কোনও কথা হয়নি।’
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিগত দিনেও কাজ করেননি উল্লেখ করে শাহদীন মালিক বলেন, ‘ভবিষ্যতেও ইচ্ছে নেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার।’ খালেদা জিয়াকে লেখা খোলা চিঠির বিষয়ে এই আইনবিদ বলেন, ‘একজন মতামত দিতে পারেন। এটায় বাধা নেই। তবে এই সব ব্যাপারে আমার উৎসাহ নেই।’
আসিফ নজরুলকে কল করা হলেও তাদের নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।
বিনায়ক সেনের কার্যালয়ের টিঅ্যান্ডটি নাম্বারে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে কথা বলতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে মোবাইলে পাওয়া যায়নি। বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের একটি সূত্র জানায়, তিনি মোবাইল ব্যবহার করেন না। পরে তার অফিসে ফোন করা হলে টিঅ্যান্ডটি নাম্বারটিতে কল প্রবেশ করেনি। এরপর ধানমণ্ডিতে অবস্থিত গণস্বাস্থ্যনগর হাসপাতালেও গিয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: ভোটগ্রহণ শেষ, জামায়াতের আমির হচ্ছেন মকবুল
/এমএনএইচ/








