ছাত্রদলের নতুন কমিটিতেও থাকতে চান ‘বয়স্করা’

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২৩:৫৭, মে ৩১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৯, জুন ০১, ২০১৯

ছাত্রদলবিএনপির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বে কেবল ‘নিয়মিত’ ছাত্ররা থাকলে তা দলের জন্য আত্মঘাতী হবে বলে মনে করছেন সংগঠনটির ‘বয়স্ক’ নেতারা। তাদের মতে, বয়সের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা না রেখে সংগঠনের কমিটি গঠনের চিরাচরিত ঐতিহ্যকে (বয়স্কদের দিয়ে) অনুসরণ করাই দলের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এ বিষয়ে তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অনুরোধও করেছেন। শুক্রবার (৩১ মে) সন্ধ্যায় বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির নেতাদের সঙ্গে স্কাইপে তারেক রহমানের বৈঠক চলার সময় তারা এই অনুরোধ জানান।

এরআগে, গত ২৯ মে একই দাবিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও চিঠি দেন সংগঠনটির নেতারা।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগে মির্জা ফখরুলকে কেন চিঠি দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ  কেন্দ্রীয় কমিটির দফতর সম্পাদক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব। তাই তার মাধ্যমে তারেক রহমানের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।’

এদিকেম, শুক্রবারের বৈঠকে তারেক রহমানের উদ্দেশে একটি লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির এক নম্বর সহ-সভাপতি এজমল হোসেন পাইলট। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘পরোক্ষভাবে জানতে পেরেছি, দলীয় হাইকমান্ড নিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে ছাত্রদলের শীষ নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চায়। আমরা বিনয়ের সঙ্গে জানাতে চাই, আপনার যেকোনও সিদ্ধান্তই আমাদের শিরোধার্য। কিন্তু চলমান বাস্তবতায় এই মুহূর্তে এই ধরনের সিদ্ধান্ত দলের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণও হতে পারে।’

লিখিত বক্তব্যে পাইলট তিনটি দাবিও তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো—প্রথমত, বয়সের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা না রেখে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের চিরাচরিত ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে একটি ধারাবাহিক কমিটি আগামী বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত গঠন করতে হবে।  দ্বিতীয়ত, পরবর্তী সময়ে স্বল্পমেয়াদি একটি ধারাবাহিক কমিটি গঠন করতে হবে। তাহলে সংগঠন গতিশীল হবে বলেও তিনি দাবি করেন। তৃতীয়ত, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান কেন্দ্রীয় সংসদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর ও কলেজ কমিটির সমন্বয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হলে সংগঠন আরও গতিশীল হবে।

কেন অনিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে ছাত্রদলের কমিটি চান তারা—জানতে চাইলে এজমল হোসেন পাইলট বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমান কমিটির মেয়াদ বয়স ৫ বছর হয়েছে। নিয়মিতভাবে কমিটি হলে এই সময়ের আমরা আরও ২টি কমিটি পেতাম। কিন্তু বাস্তবতার কারণে সেটা হয়নি। এখন যদি শুধু ‘নিয়মিত’ ছাত্রদের দিয়ে কমিটি হয়, তাহলে বর্তমান কমিটির নেতারা কোথায় যাবেন? তারা কোথায় রাজনীতি করবেন? তাই আমরা আগামী কমিটিতেও বয়সের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা না রাখতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অনুরোধ করেছি।’’

এক প্রশ্নের জবাবে পাইলট বলেন, ‘তিনি (তারেক রহমান) আমাদের বক্তব্য শুনেছেন। আমাদের দাবিগুলোর পক্ষে যুক্তিও শুনেছেন। তবে কোনও সিদ্ধান্ত দেননিন। পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত দেবেন বলে জানিয়েছেন।’

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের অক্টোবর রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসেই। ফলে গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে সংগঠনটির কার্যক্রম।

নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে গত মার্চ মাসে ছাত্রদলের কমিটি করতে সাবেক ছাত্র নেতাদের দিয়ে একটি সার্চ কমিটি করে দেন তারেক রহমান। সার্চ কমিটির নেতারা হলেন—বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রু কবির খোকন, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বিএনপির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, সহ-প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব, বর্তমান ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান।

গত কয়েক মাসে সার্চ কমিটি নেতারা নিজেদের মধ্যে ছাড়াও তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।

তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সার্চ কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান দুদু ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী।

জানতে চাইলে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘আমরা সার্চ কমিটির নেতারা কয়েকটি বৈঠক করে আলোচনা করেছি। আমরা তারেক রহমানের সঙ্গে সংগঠনের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে আলোচনাও করেছি।কিন্তু তিনি কোনও সিদ্ধান্ত দেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদল ছাত্রদের সমস্যা নিয়ে কাজ করবে, তা স্বাভাবিক। ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছাত্ররাই থাকবেন, এটাও স্বাভাবিক। এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত দেবেন।’

‘অনিয়মিত’ ছাত্রদের দিয়ে ছাত্রদলের কমিটি গঠন করা দাবি বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘তারা তাদের দাবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি আজকের বৈঠকে। সবকিছু বিবেচনা করে এখন সিদ্ধান্ত দেবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।’

এই প্রসঙ্গে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ‘আসলে সার্চ কমিটি বলতে কিছু নেই। আমরা সাবেক ছাত্রনেতারা কয়েকটি বৈঠক কেরছি। সেখানে কী করলে ছাত্রদলের জন্য ভালো হবে তা নিয়ে আলোচনা করেছি। সিদ্ধান্ত দেওয়া মালিক তো আমরা নই। সিদ্ধান্ত দেবেন তারেক রহমান।’

এক প্রশ্নের জবাবে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ‘বলেন, ‘‘ছাত্রদলের বর্তমান নেতারা ‘নিয়মিত’ ছাত্র বলতে ২৪-২৫ বছর বয়সীদের বুঝিয়েছেন। তারা চান, ‘নিয়মতি’ ও মেয়াদ-উত্তীর্ণ কমিটির নেতাদের সমন্বয়ে কমিটি করতে। সেখানে যেমন নিয়মিত ছাত্ররাও থাকবেন, তেমনি মেয়াদ-উত্তীর্ণ কমিটির নেতারাও থাকবেন।’’

কবে নাগাদ ছাত্রদলের কমিটি হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে এ্যানী বলেন, ‘ঈদের আগে তো কমিটি করা সম্ভব নয়। ঈদের পরেই দ্রুত  ছাত্রদলের কমিটি হবে।’  

বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি হয়। সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বয়স না থাকায় কেউ নির্বাচনে অংশ নিতেও পারেননি। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতেও ছাত্রদল পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারেনি। এই কারণে বিএনপির হাইকমান্ড ‘নিয়মিত’ ছাত্রদের দিয়েই  ছাত্রদলের নতুন কমিটি করার পক্ষে।

এই প্রসঙ্গে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে কী হয়েছে, সারাবিশ্ব তা দেখেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা কীভাবে জাতীয় নির্বাচনের মতো আগের রাতে ব্যালট পেপার চুরি করে জাল ভোট দিয়েছে, তাও সবাই দেখেছে।’ নির্বাচনের দিন বিভিন্ন হলে সিলমারা ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

/এসটিএস/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ
X