কাদের সিদ্দিকীর অভিমান, ঐক্যফ্রন্টের শরিকরা নির্বিকার

Send
সালমান তারেক শাকিল ও আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ২৩:৫৩, জুলাই ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৩৮, জুলাই ০৮, ২০১৯

 

e3516f7b31d8c9205080dd3dca1629d6-5cfbefff7738cএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বিভিন্ন ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান দল বিএনপির কাছ থেকে ‘প্রত্যাশামাফিক’ উত্তর না পাওয়ায় পাঁচদলীয় জোট ত্যাগ করতে পারেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। তার জোট ত্যাগের বিষয়টি নিয়ে অনেকটাই নির্বিকার বিএনপি। পাশাপাশি তিনি ফ্রন্টের একাধিক শরিক দলের নেতাকে নিজে থেকে পদত্যাগের বিষয়টি জানালেও তাদের মধ্যে কোনও ‘রা’ নেই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলছেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অগোছালো অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় কাদের সিদ্দিকী যেসব প্রশ্ন তুলেছেন, তা সিনিয়র পর্যায়ের নেতা হিসেবে বেমানান। এক্ষেত্রে তিনি নিজেও কোনও উদ্যোগ না নিয়ে প্রকাশ্যে চাপ সৃষ্টি করেছেন। এর ফলে শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘‘আমি শুনেছি তিনি পদত্যাগ করবেন। কাদের সিদ্দিকীর অভিযোগ ‘জোটের কোনও কর্মকাণ্ড নেই।’ কিন্তু তার নিজেরও তো কর্মকাণ্ড নেই। রবিবার বাম দলগুলোর যে হরতাল ছিল, সেখানে বিএনপির মতো কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সমর্থন জানিয়েছে। তার কথার গুরুত্ব থাকতো, যদি তিনি আজকে হরতালে নিজে এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে অংশ নিতেন। কই, সেটা তো করেননি। ’’ তবে শেষ পর্যন্ত কাদের সিদ্দিকী কী সিদ্ধান্ত নেন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন বলেও জানান জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তী কর্মসূচি নেওয়া, সংসদে যোগদান, মির্জা ফখরুলের শপথ থেকে বিরত থাকা, ফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের নির্বাচন না করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে শরিকদের মধ্যেই প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে। এই অসন্তোষ থেকে গত ৯ মে পাঁচদলীয় এ ফ্রন্ট ছেড়ে দেওয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন কাদের সিদ্দিকী। সংবাদ সম্মেলনের পর ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের কাছে একটি চিঠিও দিয়েছেন। এরপর ১০ জুন ফ্রন্টের বৈঠকে কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন, তিনি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবেন। এই অপেক্ষার পালা শেষ হচ্ছে সোমবার (৮ জুলাই)। আল্টিমেটামের দুই মাসের মাথায় তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন, এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা। দলটির পক্ষ থেকে আজ (সোমবার) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, ‘রবিবার রাত ১১টা পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার। সোমবার সকালে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে বৈঠক করবেন কাদের সিদ্দিকী। এরপরই জানা যাবে তিনি চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে যাচ্ছেন কিনা।’

কাদের সিদ্দিকীর ঘনিষ্ঠ এক নেতার ভাষ্য, সংবাদ সম্মেলনের ড্রাফট তৈরি হয়েছে। সেখানে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দোষারোপ করা হয়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বা বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের কেউ যোগাযোগ করলে হয়তো সিদ্ধান্ত জানাতে সময় নেবেন কাদের সিদ্দিকী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ ইকবাল সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তো ব্যাখ্যা চেয়েছিলাম ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের কাছে। ১০ জুন ফ্রন্টের বৈঠক হয়েছে। কথা ছিল সেই বৈঠকে ব্যাখ্যা দেবে। কাদের সিদ্দিকী চিঠি দিয়েছেন। সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কে দিয়েছে, সেটা তো আমরা জানি না। এই সিদ্ধান্ত কে নিলো, কেউ বলতে পারে না। আমি নিজেও স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য, আমি জানি না। আমাদের নেতাও জানেন না। আমরা সবাই জানি, ড. কামাল হোসেন শীর্ষনেতা, কিন্তু তার কাছে তো আমরা জানতে চেয়েছি, কিন্তু তিনিও বলতে পারেন না।’

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘কাদের সিদ্দিকী দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনীতিক। ঐক্যফ্রন্টেরও তিনিও অন্যতম শীর্ষনেতা। তারও তো সমাধান দেওয়া দরকার। আন্তরিকভাবে চেয়েছিলাম, যতটুকু গ্যাপ হয়েছে সেই গ্যাপ পূরণে কাদের সিদ্দিকী সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন।’

কাদের সিদ্দিকী (ছবি- সংগৃহীত)



ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, ‘ড. কামাল কথা বলেছেন। রব অসুস্থ। কামাল অসুস্থ। বিএনপি বিভিন্ন সংকটে আছে। সবাইকে তো স্পেস দিতে হবে। আমরা সবাই বলেছি যে আমাদের সময় দরকার। কিন্তু এরপরও কাদের সিদ্দিকী যদি মনে করেন, থাকবেন না, তাহলে কী করার আছে। শুধু তা-ই নয়, কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে তো কথাও হয়েছে। কিন্তু তিনি হয়তো নো রিটার্ন পয়েন্টে আছেন বলে মনে হচ্ছে। রাজনীতিতে তো এমন ঘটনা ঘটে।’

জেএসডির সহ-সভাপতি তানিয়া রব বলেন, ‘কাদের সিদ্দিকীর জোট ছাড়ার বিষয়টি শুনেছি। তবে এ বিষয়ে আমি সত্য-মিথ্যা কিছু জানি না। আর সবকিছুর একটা উপযুক্ত সময় আছে। সেটা চাইলেও সময়ের আগে করা সম্ভব নয়। দেখি তিনি শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন।’

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতারা জানান, গত ৬ জুলাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বর্ধিত সভা ছিল। সেখানে দলের সব স্তরের নেতাকর্মী ছিলেন। সবার একটাই অভিমত, জোটের ভেতরে অসঙ্গতি দূর করতে ড. কামাল হোসেনসহ জোটের শীর্ষ পাঁচ নেতাকে চিঠি দিয়েছিলেন কাদের সিদ্দিকী। এরপর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও চিঠির কোনও জবাব আসেনি। এর ফলে স্পষ্ট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

বিএনপির একটি দায়িত্বশীল পক্ষ দাবি করেছে, মূলত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রত্যেক শরিক দল নিজেদের কৌশলেই সমাধান দেখছেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলের পর নিজেদের হিসাব-নিকাশে মিল না থাকায় অনেকের মধ্যে দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের আগের ও পরের হিসাব মিলাতে না পেয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে ফ্রন্টের সিনিয়র নেতারা চাইছেন, আরও সময় নিয়ে ফ্রন্টকে নতুনভাবে সামনে আনতে। এ কারণে কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আগামী বৈঠকে ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করা হবে।

জানতে চাইলে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য দেশে ঐক্য লাগবে। আন্দোলনের জন্য ঐক্য লাগবে। কিন্তু কৌশল ঠিক করতে হবে বিএনপিকেই। সেক্ষেত্রে আমার অবস্থান এটাই যে, বিএনপিকেই সামনে থেকে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একজন শীর্ষ নেতা জানান, কয়েক দিন আগেই কাদের সিদ্দিকী ফোন করে ফ্রন্ট ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ বিষয়টি বিএনপিও জানে। এক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনও উদ্যোগ না থাকার কারণ হিসেবে এই নেতার ভাষ্য, ‘বিএনপি ফ্রন্টের প্রতিনিধি ঠিক করতে পারেনি। মহাসচিব মির্জা ফখরুল নিজে কোনও সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। আর কাদের সিদ্দিকীর প্রশ্নের উত্তর ফ্রন্টের বড় দল হিসেবে বিএনপিকে দিতে হবে জেনে তারা চুপ করে আছে। তারা নিজেরাই ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা এখনও ঠিক করতে পারেনি। সেক্ষেত্রে কাদের সিদ্দিকীর প্রশ্নের উত্তরে বলার মতো কিছু নেই বিএনপির। এ কারণে কাদের সিদ্দিকীর চিঠির উত্তর দিতে আগ্রহ দেখায়নি দলটির নেতারা।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে কাদের সিদ্দিকী সাহেব পদত্যাগ করুক, এরপর মন্তব্য করবো। তিনি কী বলেন, আগে শুনি।’ তারপর মন্তব্য করা যাবে বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ