শোকের মাসে এ কেমন অবহেলা!

Send
মাহবুব হাসান
প্রকাশিত : ২২:৪৭, আগস্ট ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৮, আগস্ট ২৯, ২০১৯

শোক দিবস উপলক্ষে করা যেসব পোস্টার সমালোচিত হচ্ছে

শোকের মাস আগস্ট। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে বেদনাবিধুর পরিবেশে পালিত হচ্ছে মাসটি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা স্মরণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মাসব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে শোক প্রকাশ করছে। তবে দলীয়ভাবে শোকের কর্মসূচি নেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে খোদ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও সমমনা সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর শোক প্রকাশের নামে উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ড নষ্ট করছে এর ভাব গাম্ভীর্য। 

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শোকের মাসের প্রথম দিকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে একটি পোস্টারের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের একটি উপ-কমিটির একজন সদস্য তার হাস্যোজ্জ্বল ছবি দিয়ে শোকের পোস্টার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই পোস্টার নিয়ে ব্যাপক বিদ্রুপ করা হলেও এটি সরিয়ে নেওয়ার কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। দল থেকেও বিষয়টি নিয়ে কিছুই বলা হয়নি।

আবু হানিফের পোস্টারে লেখা ‘শোক দিবস সফল হোক’।

আগস্টের শোকের মেজাজ নষ্ট করার অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের এমপি সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধেও। তার নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ১৫ আগস্ট গরিব ও দুস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। যে প্যাকেটে এই খাবার বিতরণ করা হয়, সেই প্যাকেটে ছিল বঙ্গবন্ধুর ছবি। খাবার শেষে ঐ প্যাকেট যত্রতত্র ফেলে দেওয়া, পথচারীদের পদদলিত হওয়াসহ বিভিন্নভাবে অপব্যবহার হয়। অনেক নেতা-কর্মী এটাকে বঙ্গবন্ধুর অসম্মান বলে মনে করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ এলাকায় বসবাসকারী ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা এ ঘটনার জন্য সাবের হোসেন চৌধুরীকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যের নামে এই খাবার বিলি হয়েছে, এর দায়ভার তাকেই নিতে হবে।’

এ বিষয়ে জানার জন্য সাবের হোসেন চৌধুরীকে ফোন করে এবং এসএমএস দিয়েও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

ছাত্রলীগের নামে করা এই পোস্টারটির দায় নিচ্ছে না কেন্দ্রীয় কমিটি

গত ২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে কুরআন খতম ও দোয়া মাহফিলের একটি পোস্টার করা হয়। ওই  পোস্টারটিতে কোথাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ব্যবহার করা হয়নি। পোস্টারটি করা হয় লাল-কালো রঙে, এতে শোকের আবহ ছিল অনুপস্থিত। উপরোন্তু, পোস্টারের শব্দচয়নেও সতর্কতা ছিল না। 

সংগঠনটির সাবেক এক নেত্রী পোস্টারটি ফেসবুকে তার পাতায় শেয়ার দিয়ে ব্যাঙ্গ করে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রলীগ’।

পোস্টারটির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, এটা তাদের পোস্টার ছিলো না। কেউ ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে এমন পোস্টার করেছিল।’

কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর দাবি পোস্টারটি ছাত্রলীগেরই। তারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা ছাত্রলীগেরই পোস্টার। কেননা মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ পোস্টার লাগানোর সাহস করবে না।’

শোক দিবসকে অনেকে আবার নেতা হওয়ার সুযোগ হিসেবেও গণ্য করে থাকেন। দিবসটি স্মরণে দলীয় পোস্টার, ব্যানারের বাইরে অনেক নেতার নামে এ উপলক্ষে পোস্টার ছাপিয়ে পাড়া-মহল্লা বা শহরজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠিত নেতাদের বাইরে উঠতি নেতারাও শোকের পোস্টার ছাপিয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দেন। গত ৪০ বছর ধরেই এই প্রবণতা রয়েছে। যে কারণে দু’বছর আগে দলীয় সভাপতির নির্দেশে এমন পোস্টার ব্যানার না করার কথাও জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক। তারপরেও এমন পোস্টার হয়, হচ্ছে। তবে অসতর্ক ও যেনতেনভাবে করা এমন অনেক পোস্টার শোক দিবসের আবহ তো নষ্ট করেই, উল্টো হাসির খোরাকও সৃষ্টি করে।

এবছর এ ধরনের একটি পোস্টার ছেপে ‘হাসির খোরাকে’ পরিণত হন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আবু হানিফ খান। তিনি পোস্টারে লেখেন,‘জাতীয় শোক দিবস সফল হোক’। এই পোস্টারটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে লাগানোও হয়। তার মূর্খতা নিয়ে সমালোচনাও হয় ঢের। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন-‘শোক দিবস আবার কিভাবে সফল হয়?’

এ বিষয়ে আবু হানিফের সঙ্গে কথা বলার জন্য একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এসএমএস দিয়েও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে ১৫ আগস্ট রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে বর্তমান কমিটির এক নেতার বিলিয়ার্ড খেলার ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এটি। শোক দিবসের রাতে ওই নেতা এই ছবিটি ফেসবুকে আপলোড করে দলের অনেককেই ট্যাগ করেন। দুজন দায়িত্বশীল নেতার এমন ছবি কী করে শোক দিবসের রাতে ব্যক্তিগত পাতায় হলেও ‘পাবলিক’ অপশন দিয়ে আপলোড করা যায় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দলটির অনেকেই। এই নেতাদের ‘কাণ্ডজ্ঞান’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সেই নেতা ছবিটি সরিয়ে নেন। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতা-কর্মী থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল সাধারণ মানুষ এমন ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দলের দায়িত্ব পাওয়া পরবর্তী প্রজন্ম তাহলে কি কিছুই শিখছে না?’

শোক দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে লাল রঙের পোশাক পরে যাওয়াকে শিষ্টাচার বহির্ভূত মনে করছেন ছাত্রলীগের অন্য নেতা-কর্মীরা (বামে)। শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের চেয়ে ক্যামেররা দিকে চোখ ছিল অনেক নেতার (উভয়দিকে)।

শোকের মাসে অলিখিত কিছু বিধানও সাধারণভাবে মেনে চলা হয়। দলমত নির্বিশেষে দেশজুড়ে  গণ্য করা হয় শোকের রঙ কালো, তাই দলীয়ভাবে শোক প্রকাশের অনুষ্ঠানে নেতা-কর্মীদের পরিধেয় পোশাক হয় সাধারণত সাদা অথবা কালো রঙের। অন্য রঙের হলেও তা যেন কটকটে বা আলাদাভাবে চোখে না পড়ে সেটা মেনে চলেন তারা। কিন্তু, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে এবছর ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে যে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয় তাতে কেন্দ্রীয় উপ-মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক সুলাইমান খান সুজনের পরনে ছিল টকটকে লাল রঙের শার্ট। শোকাবহ আগস্টের কর্মসূচিতে বেমানান পোশাক পরে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে গিয়ে তিনিও সমালোচিত হয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। 

শোক দিবসের অনুষ্ঠানে বসে নেতাদের অন্য বিষয়ের আলোচনা ও হাসি-ঠাট্টাকেও ভালোভাবে নেন না দলীয় কর্মীরা। সাভারে শোক দিবসের অনুষ্ঠানের এমন একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচিত হচ্ছে অনেক।

শোক দিবসের অনুষ্ঠানে মন্ত্রীসহ নেতাদের এমন হাসিমুখ ভীষণভাবে সমালোচিত হচ্ছে

সাভার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাৎ বার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আশুলিয়া থানা যুবলীগের উদ্যোগে মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে আলোচনা ও দোয়ার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হাসান তুহিন। এ অনুষ্ঠানের একটি ছবিতে দেখা যায় মঞ্চে উপবিষ্ট অন্য নেতা-কর্মীরা শোকদিবসের ভাব গাম্ভীর্য রক্ষা করলেও অতিথিরা নিজেদের মধ্যে কোনও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় বেশ হাসাহাসি করছেন।

এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলেন, বঙ্গবন্ধুর চেতনা হৃদয়ে ধারণ করি। কিন্তু, সপরিবারে তাকে হত্যার ঘটনা স্মরণ করে আয়োজিত শোকসভায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের এমন হাসি দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে এমন হাসি লজ্জাজনক।

বিতর্কিত এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, এরা অর্বাচীন। এরা বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগের আদর্শ বিশ্বাসী বলে মনে হয় না। এদের জন্য দলের ক্ষতি হয়। এরাই হাইব্রিড। তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, দলের বদনাম হয় এমন কোনও পদক্ষেপ আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী নেতাকর্মীরা করতে পারেন না। অনেকের ক্ষেত্রে অসাবধানতা বা অসচেতনতার কারণে ভুল হতে পারে। তবে শোক প্রকাশের রীতি না জানাটাও অন্যায়। কিন্তু, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কাজ করলে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে।

 

/টিএন/

লাইভ

টপ