মহিলা দল থাকা সত্ত্বেও বিএনপিতে নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম কার স্বার্থে?

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১১:৫৯, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৬, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯

বিএনপিনারীদের অধিকার ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে মহিলা দল থাকলেও নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম আরেকটি সংগঠন গঠন করেছে বিএনপি। নতুন এই সংগঠন গঠনের নেপথ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ভূমিকা থাকলেও মূল নেতৃত্ব রয়েছে দলটির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানের হাতে। তবে বিএনপি, মহিলা দল ও ফোরামের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে- ভবিষ্যতে যুব মহিলা দল গঠন করার উদ্দেশ্যেই এ ফোরাম গঠন।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রের দাবি, এই ফোরাম গঠনের আরেকটি গোপন উদ্দেশ্য হচ্ছে গয়েশ্বর রায়ের পুত্রবধূ ও বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নিতাই রায়ের মেয়ে নিপুন রায় চৌধুরীকে সামনে আনা। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন নিপুন।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৩ আগস্ট রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালনের লক্ষ্য নিয়ে ‘নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম’ গঠিত হয়। এতে সেলিমা রহমানকে আহ্বায়ক ও নিপুন রায় চৌধুরীকে সদস্য সচিব করা হয়। আর গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এ ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা।

মহিলা দলের একাংশের নেতাকর্মীরা বলছেন, মহিলা দলের কমিটির মেয়াদ শেষ। দলের সাধারণ সম্পাদকের পদটিকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। আর এই বিভাজন দৃশ্যপটে আসে ১৬ নভেম্বর বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংগঠনের সভাপতি আফরোজা আব্বাস ও সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময় আফরোজার সমর্থকদের সহযোগিতায় বহিরাগতদের দিয়ে সুলতানাকে লাঞ্ছিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী দুই সদস্যের ইশরায় মহিলা দলের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। সুলতানা আহমেদের কারণে নেতাকর্মীর মধ্যে বিভক্ত, তার জায়গায় অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে সংগঠনের কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে এমন বার্তা বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে দিতে চায় স্থায়ী কমিটির এই অংশ। আর সেই অংশের দাবি, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের এক নেত্রীর, তাতে মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসের সায় আছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমদকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা দেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেই হিসেবে তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ এ বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পূর্ণ হয়েছে। 

নারী শিশু অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে নারী অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ ও শিশু ধর্ষণ বেড়ে গেছে। তাদের জন্য কাজ করার জন্য এই সংগঠন করা হয়েছে। এটা বিএনপির কোনও সহযোগী সংগঠন নয়। আবার এই সংগঠন যুগ যুগ ধরে চলবে, তাও কিন্তু নয়। আমরা কাজ করছি বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে।

নারীদের নিয়ে কাজ করার জন্য বিএনপিতে মহিলা দল থাকতে আলাদা আরেকটি ফোরাম গঠন কতটা যুক্তিযুক্ত জানতে চাইলে সেলিমা রহমান বলেন, মহিলা দলও কাজ করছে। তবে এটি তো রাজনৈতিক সংগঠন। এই কারণে তারা সবখানে যেতে পারে না। রাজনৈতিক কথা শুনলে অনেক সময় মানুষ ভয় পায়। অনেক সময় দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্তরা রাজনৈতিক দলের কাছে যেতে চায় না এই ভয়ে যে আবার কোন বিপদে পড়ে। আমি নিজে রাজনীতিবিদ হলেও এটাকে অরাজনৈতিক সংগঠন করতে চাচ্ছি। এই কারণে আমরা মহিলা দলের কাউকে এর সঙ্গে সম্পর্কিত করছি না।

মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারাদেশে মহিলা দলের কমিটি আছে। সব কমিটিতে নারীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য একজন আইনজীবীকে আইন বিষয়ক সম্পাদকও করা হয়েছে। তারা তাদের কাজ করে যাচ্ছেন। এখন কেন আলাদা করে নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম করা হয়েছে তা দলের হাইকমান্ড বলতে পারবে।’

অনেকটা হঠাৎ করে নারী শিশু অধিকার ফোরাম করা হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অন্যতম শীর্ষ নেতা বলেন, এটি বিএনপির অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন না হলেও সংগঠনটির সব ধরনের কার্যক্রম বার্তা পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় বিএনপির দফতর ও মেইল থেকে। এর মাধ্যমে মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানাকে কোণঠাসা রেখে সংগঠনের আগামী কমিটিতে তার জায়গায় ‘নারী শিশু অধিকার ফোরাম’-এর দায়িত্বশীল এক নেত্রীকে আনতে চায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি অংশ। সে কারণে তাকে পরিচিত করাতেই নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা দলের এক নেতা বলেন, গত এক মাসে নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম নারী শিশু নির্যাতন, বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা করেছে। অথচ এই কাজগুলো করার কথা মহিলা দলের। কিন্তু, আমাদের সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। 

বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করে জানান, গত ১৬ নভেম্বর বহিরাগত লোকেরা মহিলা দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে। ওই দিনের ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতাদেরও চিঠিও দিয়েছেন মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ। এই ঘটনা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও জানানো হয়েছে। মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস মালয়েশিয়া থেকে ফিরলে তারেক রহমান সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক করতে পারেন। 

সুলতানা আহমেদ বলেন, গত ১৬ নভেম্বর মহিলার দলের মধ্যকার ঘটনা নিয়ে আমরা বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতাদের চিঠি দিয়েছি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও কথা বলেছি।     

বিএনপির একটি সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগে মহিলা লীগের পাশাপাশি যুব মহিলা লীগ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। বিএনপিতে মহিলা দল থাকলেও যুব মহিলা দল নামে কোনও সংগঠন নেই। ফলে অনেকদিন ধরে বিএনপিতে যুব মহিলা দল নামে একটি সংগঠন করার প্রক্রিয়া চলছে। এর কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিছুদিনের মধ্যে সংগঠনটির বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে উত্থাপন করা হবে। যুব মহিলা দল গঠনের পেছনেও নারী শিশু অধিকার ফোরামের সেই নেত্রীকে সামনে আনার প্রয়াস রয়েছে।

এ বিষয়ে নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নিপুন রায় চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘যুব মহিলা দল গঠনের বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ ফোরামে কোনও আলোচনা হয়নি। দলের শীর্ষ ফোরামে আলোচনা হলে আমি জানতাম। কিছু লোক আমাকে নিয়ে যুব মহিলা দল গঠন হচ্ছে এরকম প্রচার করছে। এর কোনও ভিত্তি নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, যুব মহিলা দল গঠনের প্রাক প্রস্তুতি হিসেবে নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এই ফোরামের ৩৩ টি জেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ অত্যন্ত কষ্টকর বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। সেই তুলনায় সামাজিক সংগঠন করা অনেকটা সহজ। ফলে যুব মহিলা দল গঠন হলে তখন সারাদেশে নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সাংগঠনিক সক্ষমতা কাজে লাগানো যাবে।

 

/এএইচআর/টিএন/

লাইভ

টপ