২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার প্রত্যক্ষদর্শী বাহাউদ্দিন নাছিম‘সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যার সব চেষ্টাই তারা করেছে’

Send
মাহবুব হাসান
প্রকাশিত : ১৫:০০, আগস্ট ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৪, আগস্ট ২১, ২০২০

বাহাউদ্দিন নাছিম (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)সন্ত্রাস ও দেশব্যাপী বোমা হামলার প্রতিবাদে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। লোকে লোকারণ্য সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর ওই স্থান সেদিন হয়ে উঠেছিলো আর্তনাদের কেন্দ্রস্থল। সেদিনের এ কর্মসূচির প্রধান অতিথি আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হলেও তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। প্রাণ হারান ২৪ জন মানুষ। আহত হন অসংখ্য। সেদিনের সে ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তিনি সেই বিভীষিকার কথা তুলে ধরেছেন।

নাছিম বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অরাজকতার বিরুদ্ধে ওই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। তখন দেশ যাচ্ছিল একটি অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে দিয়ে। সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলা হয়েছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ মদতে বাংলা ভাইয়ের উত্থান হয়েছে। প্রশাসনের পাহারায় রাজপথে প্রকাশ্য মিছিল করে, মানুষ হত্যা করে উল্টো করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার হয়েছিল। দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এসবের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়।বাহাউদ্দিন নাছিম (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জানান, যে ট্রাকের ওপর মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন তার পাশেই। দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সেদিনের গ্রেনেড হামলায় নিহত মহিলা লীগের তৎকালীন সভাপতি আইভী রহমানসহ অনেকেই ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন। বিকাল পাঁচটার দিকে সেখানে পৌঁছান দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মিলে তারা সমাবেশে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা মঞ্চের পাশেই গাড়ি থেকে নামেন। সবাই মিলে তাকে মঞ্চে নিয়ে যায়। এরপর তিনি বক্তব্য শুরু করেন। বক্তব্য শেষে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে নামতে যাবেন, ঠিক সেই সময় এক ফটোসাংবাদিক তাকে আরেকটু দাঁড়াতে অনুরোধ করেন, যাতে ভালো ছবি পান। তিনি ছবি তোলার সুযোগও দেন। এরমধ্যেই ভয়ঙ্কর বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল। প্রথমে সবাই ভেবেছিলেন বোমা। কিন্তু পরে দেখা গেলো শক্তিশালী আর্জেস গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে।

বাহাউদ্দিন নাছিম জানান, একটি গ্রেনেড ট্রাকের পাশে লেগে বিস্ফোরিত হয়। আরেকটি ট্রাকে এসে পড়লেও সেটি বিস্ফোরিত হয়নি। ঘটনার আকস্মিকতা সামলে উপস্থিত নেতারা দলের সভাপতিকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নাছিম জানান, দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, উপদেষ্টা পরিষদের বর্তমান সদস্য আমির হোসেন আমু, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ, সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার (অব) মামুন, মেজর (অব.) শোয়েব, ব্যক্তিগত স্টাফ নজীব আহমেদসহ অন্যান্যরা মানবঢাল তৈরি করে দলের সভাপতিকে আড়াল করে ফেলেন। একের পর এক  বিস্ফোরণের মধ্যেই তাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হয় বৃষ্টির মতো গুলি। এমনকি গাড়ি রওনা হওয়ার পর ভেতরে বসা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়।প্রতিবেদকের সঙ্গে বাহাউদ্দিন নাছিম (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

নাছিম বলেন, শুধু হামলাকারীরাই নয়, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লোকেরাও সেদিন গুলি করেছিল। কিন্তু দেশের মানুষের দোয়া, নেতাকর্মীদের ভালোবাসা এবং সর্বোপরি ওপরওয়ালার ইচ্ছায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা। গুলিতে গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে যাওয়ার পর কোনোরকমে তিনি তার বাসভবনে পৌঁছান। তিনি বলেন, সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যার সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রেনেড হামলার পর তাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি করা হয়েছে। গাড়িতে ওঠার পরও গুলি করা হয়েছে। কিন্তু ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’।

বিএনপি সরকারের আমলে নির্যাতনের শিকার এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, গ্রেনেড বিস্ফোরণের পর তিনি গ্রেনেডের আঘাতে আহত হন। একপর্যায়ে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যান। আবার পরবর্তী গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দে জেগে ওঠেন।  সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ ও কৃষক লীগের কয়েকজন নেতা। তারপর সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিকে নিয়ে যেতে থাকলে তার ইচ্ছায় তাকে বাংলাদেশ মেডিক্যালে নেয়া হয়। এরমধ্যে তার স্ত্রী খবর পেয়ে সুধা সদনে যান। সেখানে শেখ হাসিনাকে এ খবর জানান। আবার ওই হাসপাতালের মালিকপক্ষের একজনও সুধা সদনে এ খবর পৌঁছান। হাসপাতালে যাওয়ার ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যেই তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। পরে ওই হাসপাতালসহ ভারতে গিয়েও চিকিৎসা নেন।

তৎকালীন বিএনপি-জোট সরকারের প্রকাশ্য মদত এবং পৃষ্ঠপোষকতায় এই নারকীয় হামলা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। নাছিম বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে শেষ করতে চেয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর রক্তকে হত্যা করতে চেয়েছিল, তাদের এসব পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের কারণেই তারা আজ এ দেশের রাজনীতির আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। একদিন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েও নিক্ষিপ্ত হবে।

আরও পড়ুন- 

আমাকে ও আমার পরিবারকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে: শেখ হাসিনা

২১ আগস্টের ঘটনা রাজনীতিতে বাড়িয়েছে অবিশ্বাস

/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ