ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের জয় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিশ্লেষণ চলছে। ঢাবিতে প্রথমবারের মতো সংগঠনটির এমন উত্থানকে অনেকে বিস্ময়কর হিসেবে দেখছেন। মূল্যায়ন করছেন নানাভাবে। অনেকে মনে করেন, ডাকসুতে শিবিরের বিজয় জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি পাল্টে যেতে পারে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সমীকরণ।
তবে বিষয়টিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন ডাকসুর সাবেক দুই ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও মাহমুদুর রহমান মান্না। দুইজনই ছিলেন ডাকসাইটে ছাত্রনেতা। পরবর্তী সময়ে তারা নিজ নিজ দলের হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখছেন।
ডাকসুতে শিবিরের বিজয়কে লজ্জাজনক হিসেবে দেখছেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। কারণ, তিনি মনে করেন, ছাত্রশিবির মূলত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতের আদর্শে বিশ্বাসী। আর মান্না বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ায় আমি খুশি।
তবে মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, ছাত্র সংসদ আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক জিনিস নয়। কারণ, ছাত্র রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে হয়তো শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত থাকে। তাই অনেক সময় ভোট দিতে গেলে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কথা বিবেচনা করা হয় না। আর জাতীয় রাজনীতিতে দলীয় ভিত্তি একটি বড় ফ্যাক্টর।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও স্বাধীনতার পর ডাকসুর প্রথম ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান লজ্জার। কারণ, এই ক্যাম্পাস হচ্ছে মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র। সেখানে এ ধরনের শক্তিকে শিক্ষার্থীরা কীভাবে বেছে নিলো, তা বোধগম্য নয়। তাদের নিয়ে আমার আপত্তি আছে। কারণ, তারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তাদের মূল দল জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের সময় নারী নিপীড়নের সঙ্গেও জড়িত ছিল।’’
যদিও অনেক দিন পর নির্বাচন দেওয়ায় তিনি ঢাবি প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান। সেলিম বলেন, ‘‘আমি মনে করি, নেতৃত্ব তৈরি করতে হলে এ ধরনের নির্বাচন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে নিয়মিত করা উচিত। আর ডাকসু নির্বাচন প্রতিবছর হোক, এটা চাই।’’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘এবারের ডাকসু নির্বাচন বিতর্কমুক্ত হয়েছে কিনা, এ নিয়েও কথা হচ্ছে। কারণ, দুই-একটি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সেগুলোর যুক্তিপূর্ণ সমাধান দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ভোট গণনা করা হয়েছে স্ক্যানিং করে। অথচ সেটি হওয়ার কথা ছিল ভিজ্যুয়াল। তাই এ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। বিতর্ক এড়াতে প্রয়োজনে ভোট পুনঃগণনা করা যেতে পারে।’’
ডাকসুর সাবেক ভিপি সেলিম আরও বলেন, ‘‘আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রতারণা ও প্রহসনমূলক হবে না, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোকে অবশ্যই স্বচ্ছ করতে হবে। অন্যথায়, জাতীয় নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘জাতীয় ও ছাত্র রাজনীতি দুটো ভিন্ন জিনিস। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভালো করলে জাতীয় নির্বাচনে বড় কোনও প্রভাব পড়বে, তা ভাবার কোনও অবকাশ নেই।’’
ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের প্যানেল নির্বাচিত হওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন ডাকসুর দুইবারের (৭৯-৮০ ও ৮০-৮১ সেশন) সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বর্তমানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘এবারের ডাকসু নির্বাচন সুন্দর হয়েছে। এ জন্য উপাচার্যকে ধন্যবাদ দিতে হ।৷ অনেক দিন পর ভোট হওয়ায় আমি খুশি। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীরা যাকে যোগ্য মনে করেছে, তাদেরকেই নির্বাচিত করেছে।’’
মান্না বলেন, ‘‘ডাকসু নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পুরোপুরি পড়বে বলে মনে হচ্ছে না। কিছুটা পরতে পারে বলে ধারণা করছি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কিছু সমীকরণ কাজ করে। তাই অনেক সময় ভিন্নমতের প্রার্থীকেও ভোট দিয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা।’’









