‘কোভিড-১৯ মে মাসে শেষ হবে’: বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় অন্য কিছুর ইঙ্গিত

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১০:০০, মে ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৪, মে ০৩, ২০২০

চলতি মাসেই বাংলাদেশ থেকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দূর হয়ে যাবে বলে গত ২৭ এপ্রিল একটি গবেষণায় দেখিয়েছে সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড ডিজাইন (এসইউটিডি) এর ডাটা ড্রিভেন ইনোভেশন ল্যাব। বিশ্বব্যাপী ভয়াল থাবা বিস্তারকারী এই ভাইরাস নিয়ে এ গবেষণাটি কতটা কার্যকরী হতে পারে তা বিশ্লেষণ করেছেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ও এমআইটিতে অধ্যয়নরত চার বাংলাদেশি গবেষক। পড়ুন তার বিস্তারিত:


করোনা পরীক্ষাগত ২৭ এপ্রিল দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রসহ বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে করোনাভাইরাসের অবসান সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশিত হয়। সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড ডিজাইন (এসইউটিডি) এর ডাটা ড্রিভেন ইনোভেশন ল্যাবের একটি গবেষণাকে উদ্ধৃত করে ওইসব খবরে বলা হয় বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ১৯ মে মধ্যে ৯৭ শতাংশ কমে যাবে আর ৩০ মে’র মধ্যে কমবে ৯৯ শতাংশ। ভাইরাসের মতো করেই এই খবরটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে যারা এপিডেমিওলজি এবং ডাটা সায়েন্স সম্পর্কে ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞান রাখেন তারা বুঝতে পারবেন এই গবেষণা থেকে বৈজ্ঞানিক সত্যতার অবস্থান অনেক দূরে। কোভিড-১৯ বিস্তারের মডেল তৈরির চেষ্টায় নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ দলের অংশ হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে চাই:

১. সিঙ্গাপুর যে মডেলটি ব্যবহার করেছে তা একটি টয় মডেল: আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি কোনোভাবে এ থেকে ধারণা নেন, তাহলে তার ফলাফল বিপর্যয়কর হতে পারে।

২. এই মহামারির সময়ে প্রত্যেকেই আগ্রহ নিয়ে একটি ভালো খবরের অপেক্ষায় আছে। সে কারণে এই ধরনের ভালো খবর ভাইরাল হয়ে যাবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তাহলো এই ধরনের প্রাথমিক পর্যায়ের (প্রি-পাবলিকেশন), পর্যালোচনাবিহীন, গবেষণার ফল প্রকাশ করার নৈতিকতা কতটুকু।

৩. বাংলাদেশে লকডাউনের কারণে কোভিড-১৯ বিস্তারের হার কমেছে, কিন্তু এটা নির্মূল থেকে এখনও আমাদের অবস্থান অনেক দূরে।

এই ধরনের মডেল কেন কেবল টয় মডেল?

মানুষের পারস্পারিক মিথষ্ক্রিয়া কোভিড-১৯ বিস্তারের মূল চালিকাশক্তি। ফলে প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আমরা দুটি পর্যায় দেখতে পেরেছি। এক. লকডাউনের আগে: সবাই যখন উন্মুক্তভাবে ঘুরে বেড়িয়েছে তখন ভাইরাসটি আশঙ্কাজনক হারে বিস্তার লাভ করেছে। দুই. লকডাউনের মধ্যে: মানুষ যখন খুব বেশি ঘুরে বেড়ায়নি তখন ভাইরাসটির বিস্তারের হার কমেছে।

সিঙ্গাপুরের মডেলটিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এখানে এসব পরিবর্তন ও পার্থক্যকে বিবেচনায় নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কারণ, এই পদ্ধতিতে মহামারির উভয় পর্যায়ের ক্ষেত্রেই একই মডেল ফিট করা হয়। যেহেতু উভয় পর্যায়কে এক সমীকরণে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই ভাইরাসটির বিস্তার কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখানো হয়েছে। কিন্তু, বাস্তবতা হলো আমরা কেবলই প্রথম পর্যায় থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করেছি। এখন যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে আমরা যদি দেশের সবকিছু খুলে দেই তাহলে আমরা পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে যাবো। আর এই মডেল এই বিষয়টি বিবেচনায় নেয় না।

পৃথকভাবে, দীর্ঘ মেয়াদে কোনও দেশের কোভিড-১৯ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়ার একমাত্র রাস্তা হলো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করা। এটি দুই ভাবে অর্জন করা যায়। যখন বেশিরভাগ মানুষ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে যায় (যেমন চিকেন পক্স), কিংবা সবাইকে টিকা দেওয়া হয় (যেমন পোলিও) । মূল উদ্বেগ হলো আমরা যদি খুব শিগগিরই লকডাউন প্রত্যাহার করে নেই তাহলে দ্বিতীয় ধাপে বিপর্যয়কর সংক্রমণ হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে এই গ্রাফে আমরা দেখতে পাচ্ছি ১৯১৮ সালের মহামারির সময়ে দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণেই বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। প্রকৃতপক্ষে প্রথম ধাপের সংক্রমণের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি মানুষের মৃত্যু হয় দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণে। সিঙ্গাপুরের টয় মডেল ব্যবহার করে দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণের চিত্র ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ফলে এই ধরনের গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে আমরা কেবল কিছু অবৈজ্ঞানিক ফল পেলে সেটি অবাক করার মতো কিছু হবে না।

এই ধরনের গবেষণা কি অনৈতিক?

সিঙ্গাপুরের গবেষণাটি প্রকাশকারী ওয়েবসাইটটিতে (https://ddi.sutd.edu.sg/when-will-covid-19-end) পরিষ্কারভাবে বলে উল্লেখ করা আছে যে এই মডেলটি কেবলমাত্র শিক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশে তৈরি এবং এটি প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে আগাম অনুমান করতে সফল নয়। তারা পাঠকদের এই গবেষণার ফলাফল বিচার করে দেখতে বলেছে এবং সতর্কতার সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা আরও উল্লেখ করেছে এসব ফলাফলের ভিত্তিতে অতি-আশাবাদী হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

 এসব কিছু উল্লেখ করা সত্ত্বেও এমন একটি সময়ে, যখন সবাই দ্বিধাগ্রস্থ এবং বেশিরভাগ খবর পাঠকেরই এমন গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনার মতো বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নেই, তখন এই ধরণের ফলাফল প্রকাশ করা সরাসরি অনৈতিক।

এছাড়া আরেকটু গভীরে খতিয়ে দেখা যাক। এটা পরিষ্কার যে এই গবেষণায় এসআইআর মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এই মডেলটি মহামারি অনুমানের ক্ষেত্রে খুবই প্রাথমিক একটি মডেল যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৭ সালে । এই মডেলটি বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যার পার্থক্য এবং তাদের আচরণগত পার্থক্য বিবেচনায় নেয় না। কেবল তাই নয়- তাদের প্রকাশ করা গ্রাফগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে ফলাফলে পৌঁছাতে তারা কেবল একটি গতিপথকেই বিবেচনায় নিয়েছে। ইতিপূর্বে উল্লেখিত জনতাত্ত্বিক বিষয়গুলোর কোনও কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই মুহূর্তে এই ধরণের গবেষণা কেবল বিপদজনক নয় বরং তা অনৈতিকও।

 বাংলাদেশের বাস্তবতা: টেস্টের অভাব

প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে টেস্ট করার হার বাংলাদেশে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম। এখন পর্যন্ত আমরা প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ৩৮.৪ জনের পরীক্ষা করতে পেরেছি। উন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা দুই থেকে তিন হাজার। উন্নত দেশগুলোর কথা বাদ দিলেও আমাদের পরীক্ষার হার ভারত (প্রতি লাখে ৬১) এবং পাকিস্তানের (প্রতি লাখে ৭৯.৫) চেয়েও কম।

 কোনও সংক্রামক রোগের মাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে মূল সূচক হচ্ছে আর নট (R0)। এই সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয় কোনও একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে মোট কত জন সংক্রামিত হতে পারে। অর্থাৎ  কোনও রোগের R0 হলো তার ছড়িয়ে পড়ার হার। গবেষণার মাধ্যমে আমরা দেখতে পেয়েছি যে বাংলাদেশে শুরুর দিকে  কোভিড-১৯ এর R0 ছিল তিন এর উপরে। তবে মার্চের শেষ দিকে সরকারের তরফ থেকে নেওয়া নানান পদক্ষেপের কারণে তা ১.১-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। তবে এই সংখ্যা এক এর নিচে নামিয়ে এনে তা ধরে রাখতে না পারলে আমরা কোভিড-১৯ সংকটের শেষ দেখতে পারবো না। বিশেষ করে আমরা যদি সামাজিক দূরত্বের বিষয়গুলো নিশ্চিত না করেই পুরো দেশ উন্মুক্ত করে দেই তাহলে আমরা সম্ভবত দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণ দেখতে পারবো। আমরা আশা করবো আমাদের নীতিনির্ধারকরা আত্ম-তুষ্টিতে ভুগবেন না বিশেষ করে যখন একটি বৈশ্বিক মহামারি চলছে।

সবশেষে বলা যায়, আমরা যদি দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের পথ অনুসরণ না করি, আর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের টেস্ট করাতে না পারি, তাহলে দেশে যে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে না তা আমরা প্রমাণ করতে পারবো না। এসব পদক্ষেপ নিতে যদি আমরা ব্যর্থ হই তাহলে আমরা হয়তো মে মাসের পর আরও বিপর্যয়কর দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণ দেখতে পাবো।  

গবেষকদল: তারিক আদনান মুন (হার্ভার্ড ১৫), নুর মোহাম্মদ শফিউল্লাহ (এমআইটি ১৯), আদিব হাসান (এমআইটি ২১), সানজিদ আনোয়ার (এমআইটি ২০)।

/জেজে/টিএন/
টপ
X