যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ফুটবলকে ‘সকার’ বলা হয় কেন 

স্পোর্টস ডেস্ক 
১৪ জুন ২০২৬, ০৭:৫৩আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:৫৩

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের কাছে ফুটবল মানেই উন্মাদনা, ফুটবল মানেই জীবন। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম দুই স্বাগতিক দেশে এই চেনা খেলাটিকে ডাকা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নামে। 

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় খেলাটি ‘সকার’ (Soccer) নামে পরিচিত। কেন এই ভিন্ন নাম? আর এই ‘সকার’ শব্দটি কি অন্য ফুটবলপ্রেমী দেশগুলোর মানুষকে বিভ্রান্ত করে?  

বিবিসির এক প্রতিবেদনে মিশিগান ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক স্টিফান সিমানস্কি বলেন, “আমি যখন ইংল্যান্ডে ছোট ছিলাম, তখন ‘সকার’ শব্দটি ব্যবহার করা পুরোপুরি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য ছিল।”  

গত ষাট ও সত্তরের দশকে বড় হওয়া সিমানস্কি জানান, ‘ফুটবল’ বনাম ‘সকার’ নিয়ে বর্তমানের এই বিতর্ক তার কাছে বেশ অদ্ভুত ঠেকে। তিনি বলেন, “আমি আমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম— ‘তোমাদের কি মনে আছে? সকার বলা নিয়ে কি কখনও কোনও সমস্যা ছিল?’ আমরা যখন আলোচনা করলাম, তখন সবাই একমত হলাম যে ১৯৭০-এর দশকেও এই শব্দটা নিয়ে কোনও বিতর্ক বা আপত্তি ছিল না।” 

বন্ধুদের সঙ্গে এই আলোচনা থেকেই সিমানস্কি বিষয়টি নিয়ে গভীর গবেষণা শুরু করেন। তার গবেষণা থেকে জানা যায়, শুরুর দিনগুলোতে ফুটবল ছিল মূলত সমাজের উচ্চবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণির (পশ) খেলা।  

১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে যারা ‘ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা সবাই ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং প্রখ্যাত সব পাবলিক স্কুলের অভিজাত শিক্ষার্থী। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় জন এম কানিংহাম লিখেছেন, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের নিয়মের অধীনে খেলা এই গেমটিই পরবর্তীতে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল’ নামে পরিচিতি পায়। 

এই নামটির আরেকটি বিশেষ কারণ ছিল। তৎকালীন সময়ে আরেকটি জনপ্রিয় খেলা ‘রাগবি’ থেকে এটিকে আলাদা করার জন্য এই দীর্ঘ নাম ব্যবহার করা হতো। সিমানস্কির ভাষায়, “তখন মূলত দুটি খেলা ছিল— একটি ‘রাগবি ফুটবল’ এবং অপরটি ‘অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল’।” 

ব্রেকার, রাগার এবং সকার

১৮৮০ এবং ১৮৯০-এর দশকে অক্সফোর্ডের ধনী ও অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে একটি অদ্ভুত অভ্যাস বা ফ্যাশন ছিল। তারা যেকোনও বড় শব্দকে সংক্ষিপ্ত করে শেষে একটি ‘-er’ (আর) যুক্ত করে এক ধরণের স্ল্যাং বা উপভাষা তৈরি করতো। 

যেমন— তারা ‘ব্রেকফাস্ট’-কে সংক্ষেপে বলতো ‘ব্রেকার’ (Brekker)। একইভাবে ‘রাগবি’ খেলাকে তারা নাম দিয়েছিল ‘রাগার’ (Rugger)। 

তাহলে ‘সকার’ শব্দটি কীভাবে এলো?  

সিমানস্কি জানান, এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট তত্ত্ব রয়েছে, যদিও শতভাগ নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। ধারণা করা হয়, অক্সফোর্ডের সেই অতি-উৎসাহী ছাত্ররা ‘অ্যাসোসিয়েশন’ (Association) শব্দটির মাঝখান থেকে ‘soc’ অংশটুকু কেটে নেয় এবং নিজেদের ফ্যাশন অনুযায়ী শেষে ‘-er’ যুক্ত করে দেয়। ব্যস তৈরি হয়ে গেলো ‘soccer’ বা সকার! তবে ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত যে, শব্দটির উৎপত্তি এই অক্সফোর্ড থেকেই হয়েছিল।  

কানাডা, আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে ‘সকার’ শব্দের বিস্তার 

ক্রীড়া ইতিহাসবিদ অ্যান্ডি মিচেল তার ‘স্কটিশ স্পোর্ট হিস্ট্রি’ ব্লগে লিখেছেন, ১৮৮৫ সালের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্কুলের ম্যাগাজিনে ‘soccer’ বা ‘socker’ শব্দটির লিখিত ব্যবহার দেখা যায়। 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘socker’ বানানটি হারিয়ে গেলেও ‘soccer’ টিকে যায়। ব্রিটিশরা যখন বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তার শুরু করে, তখন এই খেলার পাশাপাশি শব্দটিও ছড়িয়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং কানাডায়।  

তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই শব্দটির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে অন্য কারণ। সেখানে ‘ফুটবল’ বলতে মূলত ‘আমেরিকান ফুটবল’ (রাগবি’র আদলে তৈরি তাদের নিজস্ব খেলা)-কে বোঝানো হয়। সিমানস্কি ব্যাখ্যা করেন, “সবকিছুই আসলে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আমেরিকান ফুটবল মূলত রাগবি থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছে, তবে এতে ফুটবলেরও কিছু উপাদান আছে। এগুলো যেন আপন ভাই-বোন। আর ঠিক এই কারণেই ১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকে যখন ইংল্যান্ডে ‘সকার’ শব্দটির জন্ম হচ্ছে, ঠিক একই সময়ে আমেরিকায় ‘আমেরিকান ফুটবল’ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।”  

ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলো ফুটবল শব্দটিকে বেশি পছন্দ করলেও ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত তারা অহরহ ‘সকার’ শব্দটিও ব্যবহার করতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা ‘সকার’ বাদ দিয়ে পুরোপুরি ‘ফুটবল’ শব্দে থিতু হয়। 

অধ্যাপক সিমানস্কি যখন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন, তখন প্রায়ই এই নাম নিয়ে মজার অভিজ্ঞতা হয় তার। তিনি বলেন, “আমেরিকানরা ক্লাসে ‘সকার’ শব্দটি ব্যবহার করার পরপরই কেমন যেন অপরাধবোধে ভোগে এবং ক্ষমা চেয়ে বলে— ‘দুঃখিত, আমি আসলে ফুটবল বোঝাতে চেয়েছি।’ কারণ তারা মনে করে ব্রিটিশরা এই শব্দটা শুনলে রেগে যাবে বা কষ্ট পাবে। কিছু ক্ষেত্রে তাদের ধারণা ঠিকও।”  

তবে নিজের আমেরিকান শিক্ষার্থীদের অভয় দিয়ে এই ব্রিটিশ অধ্যাপক বলেন, “আমি তাদের বলি— ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই, এটি খাঁটি ব্রিটিশ ইংরেজি শব্দ। তোমরা নিশ্চিন্তে এটি ব্যবহার করতে পারো!” 

সূত্র: বিবিসি 

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হাইতিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু স্কটল্যান্ডের
হাইতিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু স্কটল্যান্ডের
চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার আগের ৭ দিনের প্রস্তুতি কৌশল
চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার আগের ৭ দিনের প্রস্তুতি কৌশল
অভিযানে পুলিশের সঙ্গে ‘ফাইটার মনিরের’ সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ৮
অভিযানে পুলিশের সঙ্গে ‘ফাইটার মনিরের’ সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ৮
ট্রাম্পের দাবি আজই চুক্তি সই, ইরানের ভিন্ন সুর
ট্রাম্পের দাবি আজই চুক্তি সই, ইরানের ভিন্ন সুর
সর্বাধিক পঠিত
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
ওসি বললেন চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল, একটা কল আসার পর, ‘ভাইয়া বসেন’
ওসি বললেন চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল, একটা কল আসার পর, ‘ভাইয়া বসেন’
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের সুরাহা চান জামায়াত আমির 
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের সুরাহা চান জামায়াত আমির 
দীর্ঘবছর পর শাকিবের দেখা পেয়ে পূর্ণিমা, ‘ও এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে’
দীর্ঘবছর পর শাকিবের দেখা পেয়ে পূর্ণিমা, ‘ও এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে’
ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা
ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা