২০০০ সালের ১০ নভেম্বর টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সৌরভ গাঙ্গুলীর ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রথম বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট খেলতে নেমেছিল। সময়ের স্রোতে পেরিয়ে গেছে দুই দশক। এই সময়ে বাংলাদেশ খেলেছে ১১৯ ম্যাচ। ১৪ জয় ও ১৬ ড্রয়ের বিপরীতে হার ৮৯ ম্যাচে। সাফল্যের বিচারে খুব বেশি প্রাপ্তি নেই। বিশেষ করে, দেশের বাইরে ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা যায়নি। বিদেশের মাটিতে সেরা সাফল্য শ্রীলঙ্কায় নিজেদের শততম টেস্ট জয়।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ২০ বছর পূর্তির দিনে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে নিজেদের প্রত্যাশার কথা বলেছেন সাবেক ক্রিকেটাররা। তাদের বিশ্বাস অদূর ভবিষ্যতে এই ফরম্যাটেও বাংলাদেশ ভালো ক্রিকেট খেলে র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করবে। পাশাপাশি ক্রিকেটের লম্বা সংস্করণে উন্নতির পথও বাতলে দিয়েছেন তারা।
অভিষেক টেস্টের অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয় টেস্টের পারফরম্যান্সে হতাশ হলেও আশার কথা শুনিয়েছেন, ‘টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির আগে-পরে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নতি তেমন ছিল না। তারপরও আমরা ভালো খেলেছি এই ফরম্যাটে। আরও ভালো করা উচিত ছিল, এটা আমরা সবাই জানি। শুরুর কয়েক বছর এই ফরম্যাট রপ্ত করতে করতেই আমাদের সময় গেছে। এরপর বর্তমান ব্যাচের সিনিয়র ক্রিকেটাররা আসার পর এই ফরম্যাটে আমরা কিন্তু বেশ ভালো কিছু জয় পেয়েছি।’
তাই আগামী দিনগুলোতে আরও বড় প্রাপ্তির প্রত্যাশা সাবেক এই অধিনায়কের, ‘গত ২০ বছরের মধ্যে শেষের পাঁচ বছরে আমাদের টেস্টের সংখ্যা বেড়েছে। বাকি ১৫ বছর আমরা বছরে কয়টি টেস্টই আর খেলতাম! তারপরও র্যাঙ্কিংয়ে আরও একধাপ এগিয়ে থাকতে পারলে ভালো লাগতো। আশা করি, আগামী পাঁচ বছরে আমাদের দল এই ফরম্যাটে ভালো দল হয়ে উঠবে। স্বপ্ন দেখি পাঁচ বছরের পর র্যাংঙ্কিংয়ে আমাদের অবস্থান পাঁচে থাকবে। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।’
বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে আলো ছড়িয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। ঝলমলে সেঞ্চুরিতে দিয়েছিলেন আগমনী বার্তা। তিনি অবশ্য খুশি হতে পারছেন না টেস্টের পারফরম্যান্সে, ‘২০ বছর পরে আমাকে বলতে হচ্ছে আমাদের কোনও লক্ষ্য ছিল না। আমরা ২০ বছর পরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে চাই, সেই লক্ষ্য আমাদের ছিল না। সেটার ফলশ্রুতিতে আমরা এখনও কোথাও দাঁড়াতে পারিনি। ভালো কোনও পরিকল্পনা ছাড়া আসলে টেস্টে ধারাবাহিকতা অর্জন করা কঠিন।’
বুলবুলের সঙ্গে অভিষেক টেস্টে ব্যাট হাতে আলো ছড়িয়েছেন হাবিবুল বাশার। প্রথম ইনিংসে ৭১ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেন ৩০। ৫০ টেস্ট খেলা সাবেক এই অধিনায়ক টেস্টে আরও উন্নতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন, ‘২০ বছর পরও আমরা টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক হতে পারছি না। আমাদের দলে কিন্তু এই মুহূর্তে পারফর্মার অনেক। দলীয় সাফল্য হয়তো কম, কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্য কম নয়। ওই হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের আরও একটু ধারাবাহিক হওয়া উচিত ছিল। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে ধারাবাহিক দল হিসেবে আমরা আত্মপ্রকাশ করবো।’
দুর্জয়ের মতো হাবিবুলও স্বপ্ন দেখেন পাঁচ বছর পর বাংলাদেশকে র্যাঙ্কিংয়ের পাঁচে দেখার, ‘আমরা পাঁচজনের (মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ) ব্যাকআপ এখনও পুরোপুরি পাইনি। আশা করি, দ্রুতই তাদের ব্যাকআপ আমরা পেয়ে যাব। আমাদের জন্য ভালো দিক হচ্ছে আমরা খুব ভালো মানের কিছু ক্রিকেটার পেতে যাচ্ছি। আশা করছি, আগামী পাঁচ বছর আমরা এই ফরম্যাটে অনেক দূর এগিয়ে যাব। আশা করি, টেস্ট ক্রিকেটে র্যাঙ্কিংয়ের ৫-৬-এ থাকতে পারবো। এটা খুব কঠিন কিছু নয়, চেষ্টা করলেই আমরা অর্জন করতে পারবো।’
অভিষেক টেস্টের উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান খালেদ মাসুদ ব্যর্থতার পেছনে অবকাঠামোগত ত্রুটিকেই সামনে আনলেন, ‘অবকাঠামোগত কারণে আমরা টেস্ট ক্রিকেটে এগিয়ে যেতে পারছি না। আমার মনে হয়, বিসিবি এই ফরম্যাটে সবসময়ই গুরুত্ব কম দেয়। অথচ এই ফরম্যাটই হচ্ছে আসল ক্রিকেট। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট যারা মনোযোগ দিয়ে খেলবে, তারা যেন আর্থিকভাবে কষ্টে না থাকে সেই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। ধরেন মুমিনুল, সাদমান ওরা টেস্ট খেলে। বছরে অল্প কিছু টেস্ট খেলে ওরা কি আর্থিকভাবে খুব বেশি লাভবান হতে পারবে? ফলে এই ফরম্যাটে ওদের মনোযোগী করে তুলতে অবশ্যই আর্থিক কাঠামোটা ভালোভাবে করতে হবে।’
অভিষেক টেস্টের ওপেনার মেহরাব হোসেন অপি মনে করেন, স্কুল পর্যায় থেকে লম্বা সংস্করণের ক্রিকেট শুরু করলেই কেবল এই ফরম্যাটে ভালো করা সম্ভব, ‘আমার কাছে মনে হয়, আমাদের লংগার ভার্সন ক্রিকেট যদি আরও বাড়ানো যায় তাহলে এই ফরম্যাটে আমাদের উন্নতির গ্রাফটা বাড়বে। যত ম্যাচ হচ্ছে আমার কাছে মনে হয় সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। লংগার ভার্সন ক্রিকেটের পরিকল্পনা করা উচিত একদম স্কুল পর্যায় থেকে। আমাদের পাশের দুই দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় স্কুল লেভেলেই তিন দিনের ম্যাচ হয়। আমি মনে করি, স্কুল পর্যায় থেকেই যদি আমরা লংগার ভার্সন ম্যাচ খেলার অভ্যাস করাই, তাহলে ছোটবেলা থেকে ক্রিকেটাররা এই ফরম্যাটের জন্য তৈরি হওয়ার সুযোগ পাবে।’
তার মতো অভিষেক টেস্টের পেসার হাসিবুল হোসেন শান্তও মনে করেন, লংগার ভার্সন ক্রিকেট কম খেলার কারণেই টেস্টের সাফল্য কম, ‘ঘাটতি একটাই মনে করি। আমাদের লংগার ভার্সন ক্রিকেট খুব কম হয়। আমাদের ছেলেরা প্রস্ততি নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ম্যাচ পান না। অনুশীলন করে আসলে যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া যায় না। ম্যাচ খেলার কোনও বিকল্প নেই। ছেলেদের প্রচুর ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলেই আমরা এই ফরম্যাটে ভালো করতে পারবো।’








