আইচের ভীষণ মন কাঁদে, কিছুই দেখে যেতে পারলেন না বাবা

রবিউল ইসলাম
০৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৭:০৫আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৭:৪৯

মোহাম্মদ নুরু মোল্লা স্বপ্ন দেখতেন, তার ছেলে একদিন বড় ক্রিকেটার হবে। লাল-সবুজ জার্সিতে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে। কিন্তু কিছুই দেখে যেতে পারলেন না তিনি। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বুকে পাথর চেপে ছেলে আইচ মোল্লা ভবিষ্যতের সিঁড়ি বানিয়ে চলেছেন। বাবার স্বপ্ন পূরণ করার পথে তিনি বড় ধাপ ফেলতে যাচ্ছেন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের মঞ্চে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তান বিপক্ষে হোম সিরিজের আগে বিকেএসপিতে নিজেদের মধ্যে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলছিল বাংলাদেশ যুব দল। ম্যাচটিতে ৪৬ রান নিয়ে ব্যাটিং করছিলেন তখন আইচ। হুট করেই খবর পেলেন তার বাবা আর নেই। বিকেএসপি থেকে সোজা মানিকগঞ্জে চলে যান বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে। যার চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার এভাবে চলে যাওয়ায় শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন আইচ। কিন্তু শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঝাঁপিয়ে পড়েন মাঠে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে পেয়ে যান ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি।

খেটে খাওয়া নুরু মোল্লা শুরুতে অবশ্য চাননি ছেলে ক্রিকেট খেলুক। অভাব-অনটনের সংসারে খাওয়ার জন্যই যেখানে তীব্র সংগ্রামের মুখে পড়তে হয়, সেই বাবা কী করে ছেলের ক্রিকেট স্বপ্ন পূরণ করবেন! তবু একসময় ছেলের কাছে হার মানেন নুরু মোল্লা। একেক সময় একেক কাজ করে ধার-দেনা করে ছেলেকে ক্রিকেট সরঞ্জাম কিনে দিতেন নুরু মোল্লা।

যদিও আইচের ক্রিকেট শুরুর গল্পের নায়ক মাকিনগঞ্জের ইশান মাহমুদ। ভাষা শহীদ রফিক ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে কোচের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরে তার সার্টিফিকেটেই সুযোগ মেলে ঢাকার গোল্ডেন বয়েজ  ক্রিকেট ক্লাবে। আইচের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের যাত্রায় সঙ্গী কেবল নুরু মোল্লা কিংবা ইশান মাহমুদই নন। সিংগাইরের বিত্তবান অনেকেই চেয়েছেন তাদের এলাকার নাম উজ্জ্বল করুক আইচ। ফলে মন থেকেই তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। উঠতি এই তারকার ‍হৃদয়ে তারা প্রত্যেকেই আছেন গভীরভাবে।

আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৭ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ (সোমবার) থাকছে মিডল অর্ডার ব্যাটার আইচ মোল্লার একান্ত সাক্ষাৎকার-

আইচের ভীষণ মন কাঁদে, কিছুই দেখে যেতে পারলেন না বাবা বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ক্রিকেট শুরু কীভাবে?

আইচ: ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলি। টেপ টেনিসে খেলতাম। ২০১৩ সালে ভাষা শহীদ রফিক ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হই। আমাদের অ্যাকডেমি তেমন জনপ্রিয় কোনও অ্যাকাডেমি না। ওখানকার কোচ আমাকে আপন ভাইয়ের মতো যত্ন নিয়েছেন। আমার কাছ থেকে কোন বেতনও নেননি। উনি সব খেলোয়াড়ের জন্যই কষ্ট করেছেন। আমাকে অনেক বেশি সাহায্য করেছেন। উনার নাম ইশান মাহমুদ। উনার মাধ্যমেই আমি গোল্ডেন বয়েজ ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তির সুযোগ পাই। ওখান থেকে আমার ঢাকায় অনুশীলন শুরু। তারপর জেলা পর্যায়, বিভাগ পর্যায়ে ভালো করে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পাওয়া।

বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকায় ভর্তি হওয়ার পর শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। এই সময়টার গল্প জানতে চাই...

আইচ: আমাকে আমার বাবা যেভাবেই হোক সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। উনি অনেক কষ্ট করেছেন আমার জন্য। নানাভাবে টাকা জোগার করে আমার চাহিদা পূরণ করেছেন। ঢাকায় যখন আসি, আমাকে টুকু আঙ্কেল বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সাইদুল আঙ্কেল ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ভাষা শহীদ রফিক ক্রিকেট অ্যাকাডেমির সভাপতি ও মেয়র আবু নাঈম মোঃ বাশার স্যারও আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। শুধু তা-ই নয়, এলাকার অনেকেই আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। কেউ ব্যাট কেনার টাকা দিয়েছিলেন, কেউবা জুতা কেনার টাকা দিয়েছিলেন। সবার সহযোগিতাতেই আমি এই অবস্থায় পৌঁছাতে পেরেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: বিকেএসপিতে প্রস্তুতি ম্যাচ চলাকালীন বাবার মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছিলেন। আপনার এই ক্রিকেট জার্নিতে যার অবদান সবচেয়ে বেশি।

আইচ: আফগানিস্তান সিরিজের কিছুদিন আগে বিকেএসপিতে আমাদের প্রস্তুতি ম্যাচ হচ্ছিল। আমি ওই ম্যাচে ৪৬ রান নিয়ে ব্যাটিং করছিলাম। আমাদের ম্যানেজার আমাকে মাঠ থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসেন। এরপর আমাকে বলেন, ‘তুমি বাড়ি যাও, তোমার বাবা মারা গেছে।’ আমি ওখান থেকে সোজা মানিকগঞ্জ চলে যাই। বাবার মৃত্যু এখনও আমাকে যন্ত্রণা দেয়। একটাই কষ্ট, আমি বিশ্বকাপ খেলবো, কিন্তু আমার বাবা দেখে যেতে পারলেন না।

বাবাকে দাফন করে ক্যাম্পে ফিরে আসি। কিছুদিন পরই শুরু হয় আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ। সিরিজটা আমার খুব ভালো হয়। আমি ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি (১০৮) পাই। এই যে ক্রিকেট খেলছি, এই স্বপ্নটা বাবার চোখ দিয়েই তো দেখেছিলাম। উনি সবসময় বলতেন, কবে বিশ্বকাপ খেলতে যাবি। কিন্তু উনি দেখে যেতে পারলেন না। যদি বিশ্বকাপ জিততে পারি উনাকেই উৎসর্গ করবো। আমি এখন সব ম্যাচেই বাবার সঙ্গে কথা বলে মাঠে নামি। হয়তো বাবা আমার কথা শুনতে পারছেন। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল, আমি বড় ক্রিকেটার হবো। তিনি এখন নেই, আমি তার স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিশ্রম করে যাবো।

আইচের ভীষণ মন কাঁদে, কিছুই দেখে যেতে পারলেন না বাবা বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, এই তকমা কি চাপ সৃষ্টি করছে?

আইচ: চাপ কেন কাজ করবে! আমাদের চ্যাম্পিয়ন হতেই হবে এমন কিছু চিন্তা করছি না। আমরা বিশ্বাস করি, আমরা চ্যাম্পিয়ন দল। আমরা ম্যাচ বাই ম্যাচ টার্গেট করেই বিশ্বকাপ খেলবো। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ব্যাপার তো অনেক পরে। গ্রুপ পর্বে খেলা শেষ করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা ভাববো।

বাংলা ট্রিবিউন: দল হিসেবে আপনারা কতখানি প্রস্তুত?

আইচ: করোনার কারণে আমাদের কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তারপরও যতখানি পেরেছি প্রস্তুতি নিয়েছি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে আমরা কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো। আমাদের কোচরা, ম্যানেজাররা আমাদের জন্য অনেক কাজ করছেন। মাঠের বাইরে থেকেও যারা সাপোর্ট করছেন, এগুলো অনেকভাবে কাজে আসে। সব মিলিয়ে আমি প্রস্তুতির ঘাটতি দেখছি না।

বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপ ঘিরে আপনি কী স্বপ্ন দেখেন?

আইচ: প্রতিপক্ষের বোলারদের ডমিনেট করতে চাই। টপ স্কোরার তো সবাই হতে চায়। অবশ্যই আশা করি, ওমন কিছু হতে পারবো। তবে আমার মূল লক্ষ্য দলকে জেতানো। বিশ্বকাপে গোটা কয়েক ম্যাচ আমি নিজেই জেতাতে চাই। সবচেয়ে বড় কথা পরিস্থিতি বিবেচনা করে খেলবো। আমার কাছে টিম ম্যানেজমেন্ট কী চাচ্ছে, এসব বিবেচনা করেই আমি ব্যাটিং করবো। 

আইচের ভীষণ মন কাঁদে, কিছুই দেখে যেতে পারলেন না বাবা প্রোফাইল

পুরো নাম: আইচ মোল্লা

ডাক নাম: আইচ

জন্ম: ৮ মে ২০০৩

জন্মস্থান: সিংগাইর, মানিকগঞ্জ

উচ্চতা: ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি

প্রথম ক্লাব: ভাষা শহীদ রফিক ক্রিকেট অ্যাকাডেমি

বর্তমান ক্লাব: গোল্ডেন বয়েজ ক্রিকেট অ্যাকাডেমি

ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি (মিডল অর্ডার)

স্কোরিং শটস: মাঠের চারদিক খেলার সামর্থ্য

প্রিয় মানুষ: মা-বাবা

প্রিয় ক্রিকেটার: বিরাট কোহলি

পড়াশোনা: ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষ

ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: আফগানিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে ১০৮ রানের ইনিংস

/কেআর/
সম্পর্কিত
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
এলিসের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে সিরিজে সমতা অস্ট্রেলিয়ার
সর্বশেষ খবর
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম